প্রকাশিত: ১২ জুলাই, ২০২৬ ০১:২০
কয়েকদিনের টানা বৃষ্টি আর ভারতীয় পাহাড়ি ঢলে পানি বৃদ্ধি পেয়ে টুইটুম্বুর নদী ও হাওর। এর মধ্যে শনিবারও নতুন করে আবহাওয়ার পূর্বাভাস দিয়েছে সরকারি সংস্থা বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র। পূর্বাভাসে বলা হয়েছে আগামী ৪৮ ঘন্টা অর্থাৎ দুইদিন সুরমা, কুশিয়ারা নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকতে পারে।
এতে নিম্নাঞ্চলের বন্যা পরিস্থিতি কিছুটা অবনতি এবং সুরমা নদী সংলগ্ন নিম্নাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। এই পূর্বাভাসের পূর্বেই জেলা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির ২৭ এপ্রিলের সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে দুর্যোগ মোকাবেলায় ও দুর্যোগ বিষয়ে তথ্য ও যোগাযোগের জন্য কন্ট্রোলরুম খোলা হয়েছে। কন্ট্রোলরুমের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে সহকারী কমিশনার ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মেহেদী হাসান হৃদয়কে। যোগাযোগ মাধ্যম ০১৮৪৭৯৭৮৯৫৬। এছাড়াও যেকোন বিষয়ে সার্বক্ষণিক যোগাযোগের জন্য ০১৭৩০৩৩১০৯৮ নাম্বারে দায়িত্বশীল সহকারী কমিশনার ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সাকিবুর রহমান। এই দুইজনের পাশাপাশি অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) ০১৭৩০৩৩১১০২ এর সাথেও যোগাযোগ করা যাবে।
জেলা প্রশাসনের নির্দেশনা মোতাবেক প্রতিটি উপজেলা ও পৌরসভায় নিয়ন্ত্রণ কক্ষ খোলার পাশাপাশি আশ্রয়কেন্দ্র, স্বেচ্ছাসেবক টিম গঠন, মেডিকেল টিম গঠন, পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট সংরক্ষণ, নৌযান প্রস্তুত রাখাসহ সকল দপ্তরকে সতর্ক অবস্থায় রাখা হয়েছে এবং যে কোন স্থান দুর্যোগে আক্রান্ত হওয়ামাত্র প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে জানানো হয় বিজ্ঞপ্তিতে। তবে আক্রান্তরা কিভাবে জরুরী মূহুর্তে এসব সেবা নিবেন কিংবা সাড়া দিবেন তা স্পষ্ট নেই কোথাও। বন্যার শঙ্কায় প্রশাসনের ব্যাপক প্রস্তুতি গ্রহণ করার চেষ্টা দেখা গেলেও প্রকৃত তথ্য না জানার কারণে আল্লাহ ভরসা বলছেন ঝুঁকিতে থাকা লোকজন।
জেলায় ঢল বা বন্যা এলে সবার আগে আক্রান্তের ঝুঁকিতে থাকে দোয়ারাবাজার উপজেলা। ঝুঁকিতে থাকা এই উপজেলার মাইজদী গ্রামের বাশারের ঘর নদী থেকে আসা খালের পাড়ে। ঢল এলেই জল গড়ায় ঘরে। তিনি বলেন, আমরা নিম্নাঞ্চলের মানুষ। ঢল এলেই পানিবন্দী হয়ে পড়ি। বন্যা আক্রান্তদের জন্য প্রশাসন বিভিন্ন প্রস্তুতি নিয়েছে এটা আমরাও জানি। কিন্তু কোথায় গেলে কোন সেবা পাবো এটা কেউই জানে না। এটা আগে থেকে জানালে মানুষ উপকৃত হবে। না হলে আমরা নিজেরা নিজেদের চেষ্টায় যতটুকু বাঁচতে পারি।
শহরে বন্যা আক্রান্ত হয় সবার আগে উত্তর আরপিননগর, বড়পাড়া, পশ্চিম হাজীপাড়া সহ অন্যান্য নিম্নাঞ্চল। বড়পাড়া এলাকার কাঁচা ঘরের বাসিন্দা ইজিবাইক চালক আনোয়ার হোসেন বলেন, বৃষ্টি আর বন্যা যাই হোক সবার আগে আমার ঘরে পানি উঠে। প্রশাসনের কোন সুযোগ সুবিধা আমরা কোনোদিন পাই না। এবারও একরাতের বৃষ্টিতে ঘরের বারান্দায় পানি এসেছিল। সামনে বন্যা হবে শুনছি কিন্তু কিছু করার নেই আমাদের, সব আল্লাহ ভরসা।
এসব কিছু করার নেই মানুষদেরকে যদি জানানো যায় বন্যাক্রান্ত হলে কিভাবে কি করতে হবে তাহলে কমে যাবে সাধারণ মানুষের জান—মালের ক্ষয়ক্ষতি।
যেভাবে পাওয়া যাবে জরুরী মূহুর্তে সরকারি সেবা
আশ্রয়কেন্দ্র— বন্যা মোকাবিলায় জেলায় ১৩১১টি স্থায়ী ও অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে। যে কোন বিপর্যয় এড়াতে দ্রুত নিকটস্থ আশ্রয় কেন্দ্রে অবস্থান করতে হবে। সরকারিভাবে প্রস্তুত আশ্রয় কেন্দ্রর তথ্য বন্যার পূর্বে ইউনিয়ন পরিষদ থেকে জেনে রাখতে হবে।
পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর, রেড ক্রিসেন্ট এবং কিছু এনজিও এগুলো সরবরাহ করে। উপজেলা পর্যায়ে সংরক্ষণ করে রাখা হয়েছে। যখন প্রয়োজনীয়তা দেখা দিবে প্রয়োজন অনুসারে বিতরণ করা হবে।
নৌযান— বন্যার্তদের উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনা করার জন্য মাঝি সহ ৪৮৪ নৌকা। ৮ টা স্পীড বোট প্রস্তুত আছে। প্রতিটি উপজেলায় মোবাইল নাম্বারসহ নৌকার তালিকা আছে। আকস্মিক বন্যার ঝুঁকি মোকাবিলায় উপজেলা থেকে নৌকার তালিকা সংগ্রহ করে রাখতে হবে।
স্বেচ্ছাসেবক— উপরের সব উদ্যোগ সহজে মানুষের কাছে পৌছানোর জন্য বেসরকারি ভাবে ১২শ স্বেচ্ছাসেবক প্রস্তুত রাখা হয়েছে। এছাড়া রেড ক্রিসেন্ট ও ইরার স্বেচ্ছাসেবকরা আছেন দুর্যোগে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর জন্য। প্রতিটি ইউনিয়মে ওয়ার্ড ভিত্তিক স্বেচ্ছাসেবক টিম গঠন করা হয়েছে। ইউনিয়ন থেকে স্বেচ্ছাসেবক টিমের তথ্য সংগ্রহ করতে হবে।
উপরের তথ্যগুলো জানিয়েছেন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মতিউর রহমান খান। তিনি বলেন, বন্যা মোকাবিলায় আমাদের পূর্ব প্রস্তুতি হিসেবে যা যা দরকার সবকিছু নিয়ে রেখেছি। যখনি প্রয়োজন হবে অবস্থা অনুযায়ী তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেয়া হবে। মানুষ সহজে সেবা পাওয়ার লক্ষে উপজেলা, পৌরসভা ও জেলা পর্যায়ে কন্ট্রোল রুম খোলা হয়েছে। যে কোন সময় কন্ট্রোল রুমে যোগাযোগ করে প্রয়োজনীয় সহায়তা ও দিক নির্দেশনা পাবেন আক্রান্তরা। যদি কন্ট্রোল রুমে যোগাযোগ না করা যায় তাহলে স্থানীয় উপজেলা বা ইউনিয়ন পরিষদের মেম্বারের কাছে সাথে যোগাযোগ করলেও সহায়তা মিলবে। এদের কাউকে না পাওয়া গেলে গ্রাম পুলিশের মাধ্যমে সহায়তা নেয়া যাবে। গ্রাম পুলিশকে সেভাবে দিক নির্দেশনা দিয়ে প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
মেডিকেল টিম প্রস্তুতের বিষয়ে সিভিল সার্জন ডা. জসিম উদ্দিন বলেন, আমরা বন্যার অবস্থা বুঝে টিম গঠনের ব্যবস্থা করি। প্রত্যেক বাড়ি বাড়ি মেডিকেল টিম যাওয়া সম্ভব না। তাই প্রত্যেক আশ্রয় কেন্দ্রে মেডিকেল টিম গিয়ে চিকিৎসা সেবা দিয়ে থাকে। এছাড়াও প্রতিটি ইউনিয়ন স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা সেবা চালু রাখা হয়। এর বাইরেও প্রয়োজন অনুসারে অস্থায়ী মেডিকেল ক্যাম্প স্থাপন করলে স্থানীয় মসজিদে মাইকিং সহ বিভিন্ন মাধ্যমে আমরা মানুষকে জানিয়ে দেবো।
বিভিন্ন গবেষণা ও জরিপে দেখা গেছে বন্যা বা দুর্যোগে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকে নারী, শিশু, বৃদ্ধ ও বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন ব্যাক্তিরা। তাদের নিরাপত্তার জন্য বিশেষ কোন উদ্যোগ নেয়া হয় না। সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজের শিক্ষার্থী ধর্মপাশার উপজেলার সুখাইড় গ্রামের তরুণী হেপী চৌধুরী বলেন, বন্যা বা দুর্যোগে সবচেয়ে ঝুঁকিতে বা অসহায় থাকে নারী—শিশুরা। আমাদের এলাকা বন্যাপ্রবণ এলাকা। কিন্তু আজ পর্যন্ত দেখলাম না দুর্যোগকালীন মুহুর্তে নারীদের জন্য কোন বিশেষ উদ্যোগ নিতে। তবে গ্রামের বা অন্যান্য মানুষরা সব ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার দেন। সরকারি ভাবেও নারী শিশুদের জন্য দুর্যোগে বিশেষ নজর দেয়া উচিত। সম্ভব হলে কন্ট্রোল রুমের মতো মহিলা বিষয়ক অফিস থেকে বিশেষ কর্মকর্তা নিয়োগ করা।
মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তর সুনামগঞ্জের উপপরিচালক এ জে এম রেজাউল আলম বিন আনছার বলেন, বন্যা হলে আলাদা করে মহিলাদের জন্য কোন কর্মসূচি নেয়া হয় না। জেলা প্রশাসনের নির্দেশনা মোতাবেক আমরা কাজ করি। যখন কোন এনজিও বা অন্যান্য সংস্থা মহিলাদের জন্য কাজ করে তখন আমরা সমন্বয় করি।
উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন