প্রকাশিত: ১২ জুলাই, ২০২৬ ২০:০৯
শান্তিগঞ্জে জীবিকার লড়াইয়ে নিম্ন আয়ের মানুষ
সু.খবর ছবি
টানা কয়েক দিনের বৃষ্টিতে শান্তিগঞ্জ উপজেলার জনজীবন অনেকটাই স্থবির হয়ে পড়েছে। সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন দিন এনে দিন খাওয়া নিম্ন আয়ের মানুষরা। রিকশা—ভ্যানচালক, দিনমজুর, ফেরিওয়ালা, খোলা আকাশের নিচে ছোট ব্যবসা করা মানুষ, যাদের সংসারের চুলা প্রতিদিনের আয়ের ওপর নির্ভরশীল— তাদের অনেকের ঘরেই এখন অনিশ্চয়তার ছায়া। বৃষ্টির কারণে কাজ নেই, আয় নেই, অথচ থেমে নেই সংসারের খরচ, কিস্তির চাপ কিংবা সন্তানের মুখে খাবার তুলে দেওয়ার দায়িত্ব।
শান্তিগঞ্জ উপজেলার পাগলা বাজার এলাকার পূবালী ব্যাংকের আশপাশে প্রতিদিন ভ্যান নিয়ে বসে থাকেন আশকর আলী। এই ভ্যান চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করেন তিনি। বয়স ষাটের কাছাকাছি। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম সদস্যও তিনি। প্রতিদিন ভ্যানের চাকা ঘুরলেই সংসারের চাকা ঘোরে। কিন্তু গত এক সপ্তাহের টানা বৃষ্টিতে তার ভ্যান যেন একপ্রকার থেমেই গেছে।
আশকর আলী বলেন, রোদ থাকলে দিনে ২৫০ থেকে ৩৫০ টাকা আয় হতো। এখন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত বসে থাকলেও ট্রিপ মেলে না। কোনো দিন ৫০—১০০ টাকা পাই, কোনো দিন সেটাও না। সংসার চালাতে খুব কষ্ট হচ্ছে।
একই চিত্র রিকশাচালক আক্কুল আলীর জীবনেও। স্বাভাবিক সময়ে প্রতিদিন ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা আয় করলেও বৃষ্টির কারণে তাঁর আয় অর্ধেকেরও নিচে নেমে এসেছে। তিনি বলেন, রিকশা নিয়ে বের হই, কিন্তু মানুষই বের হয় না। যা আয় হয়, তা দিয়ে কিস্তির টাকা, বাজার খরচ আর ছেলে—মেয়ের প্রয়োজন মেটানো সম্ভব হয় না। প্রতিদিনই দুশ্চিন্তা বাড়ছে।
রিকশাচালক জয়নাল আবেদীন, ছন্টাই মিয়াসহ উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের অসংখ্য শ্রমজীবী মানুষের অবস্থাও একই রকম। কেউ রিকশা চালাতে পারছেন না, কেউ দিনমজুরের কাজ পাচ্ছেন না, আবার কেউ খোলা জায়গায় ছোট ব্যবসা করতে না পেরে ঘরে বসে আছেন। টানা বৃষ্টিতে তাদের জীবনের স্বাভাবিক ছন্দ ভেঙে পড়েছে।
উপজেলার একাধিক শ্রমজীবী মানুষের সাথে কথা বলে জানা যায়, ভারী বৃষ্টির কারণে মানুষ প্রয়োজন ছাড়া ঘর থেকে বের হচ্ছেন না। সেজন্য যাত্রী নেই, ক্রেতা নেই, কাজও নেই। প্রতিদিনের আয়ের ওপর নির্ভরশীল পরিবারগুলোতে দেখা দিয়েছে চরম আর্থিক সংকট। অনেকেই ধার—দেনা করে সংসার চালাচ্ছেন, আবার কেউ কেউ প্রয়োজনীয় খরচ কমিয়ে কোনোমতে দিন পার করছেন।
দৈনিক মজুরিতে কাজ করা সাহেব আলী বলেন, বৃষ্টিতে ভিজে কাজ করলে অসুস্থ হয়ে পড়ার ভয় থাকে। বয়সও হয়েছে। তাই বৃষ্টি থাকলে কাজে যাই না। কিন্তু কাজ না করলে আয়ও থাকে না। তখন সংসার চালানো খুব কঠিন হয়ে যায়। তবুও উপায় নেই, আল্লাহর ভরসায় আছি।
স্থানীয়দের মতে, কয়েক দিনের টানা বৃষ্টি শুধু কৃষিকাজ বা চলাচলেই বিঘ্ন ঘটায়নি, সবচেয়ে বেশি আঘাত করেছে নিম্ন আয়ের মানুষের জীবন—জীবিকায়। তার উপর আছে বন্যার শঙ্কা। যাদের সঞ্চয় নেই, প্রতিদিনের উপার্জনই যাদের একমাত্র ভরসা, তাদের জন্য একটি কর্মহীন দিনও বড় সংকটের। সেখানে টানা কয়েক দিনের কর্মবিরতি তাদের জীবনে নীরব দুর্ভোগ ডেকে এনেছে।
পাগলা বাজারের কান্দিগাঁও কেন্দ্রিয় জামে মসজিদের সামনের রিকশা স্ট্যান্ডের ম্যানাজার আলা উদ্দিন বলেন, রিকশা চালকরা বেশ কষ্টে আছেন। যাদের রেনকোট আছে তারা বৃষ্টি উপেক্ষা করে কিছু ট্রিপ দিচ্ছেন। দু’চার পাঁচশ আয় করছেন। তাদের রিকশা চার্জের টাকা, রিকশা ভাড়া সহ অন্যান্য খরচও আছে। এমন দিনে কোনোভাবে যদি একটু সহায়তা পাওয়া যেতো তাহলে সাঁতারে জিরিয়ে নেওয়ার মতো অবস্থা হতো।
এ বিষয়ে শান্তিগঞ্জ উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) জাহাঙ্গীর আলম বলেন, আপাতত আমাদের কাছে কিছু শুকনো খাবার মজুত রয়েছে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা স্যারের সাথে আলোচনা করে কর্মহীন নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য জরুরি সহায়তার বিষয়ে দ্রুত উদ্যোগ নেওয়ার চেষ্টা করব।
উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন