মায়ের মুখে আহার তুলে দেওয়ার কেউ থাকল না

প্রকাশিত: ১৫ জুলাই, ২০২৬ ২৩:৪২

গোষ্ঠীগত দ্বন্দ্বে বলির পাঠা হয়েছেন দিনমজুর ও পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি রুস্তম আলী (৩৮)। প্রতিপক্ষের হামলায় বুকে ছুরির আঘাতে নিহত হয়েছেন তিনি। শান্তিগঞ্জ উপজেলার জয়কলস ইউনিয়নের আস্তমা গ্রামের এই ঘটনায় এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। রুস্তম আলীর বয়স সাঁইত্রিশ হলেও সংসারের ঘানি টানতে টানতে বিয়ে করার সময়ই পাননি তিনি। বাবা আলমাছ আলীকে হারানোর পর থেকে বৃদ্ধ মা আর ছোট ভাইদের নিয়ে কোনো রকমে দিনাতিপাত করছিলেন নিহত এই ব্যক্তি।


স্থানীয়রা জানিয়েছেন, কখনো মাছ ধরা, কখনো দিন মজুরি করে সংসার চালাচ্ছিলেন রুস্তম। তিনি যেদিন কাজে যেতেন সেদিস সংসারের চুলায় আগুন জ্বলতো না হলে উপোষ থাকতে হতো তাদের। ষাটোর্ধ্ব মায়ের মুখে তুলে ভাত খাওয়াতেন নিহত রুস্তম। তাঁর নিহত হওয়ার ঘটনায় মাকে মুখে তুলে ভাত খাওয়ানোর আর কেউ থাকলো না। 

 


রুস্তম আলীর স্বজনরা জানিয়েছেন, একজন নির্বিবাদী মানুষ ছিলেন তিনি। কারো সাতেপাঁচে থাকতেন না কখনো। গ্রামে অনেক বিষয় নিয়ে শালিশ বৈঠক বা কথাবার্তা হলেও রুস্তম এসব বিষয়ে কখনোই নাক গলাননি। তাঁর একটাই চিন্তা, কাজ আর সংসার। এমন একজন নিরীহ মানুষকে আস্তমা গ্রামের মাঝপাড়ায় টাওয়ারের সামনে সংঘবদ্ধ হামলায় নিহত করার অভিযোগ উঠেছে একই গ্রামের মৃত কালাই মিয়ার ছেলে মতিন মিয়া, ছইদুর রহমানের ছেলে জিল্লুর রহমান, মোস্তাক মিয়া, মৃত মনফর আলীর ছেলে নজিব আলী ও নজিব আলীর ছেলে ছাইম আলী ও তাদের গোষ্ঠীর লোকদের বিরুদ্ধে। তারা বলছেন, পূর্ব বিরোধের জেরে একই দিন সন্ধ্যায় গ্রামের জিল্লুর রহমানের গোষ্ঠীর লোকজন ও মোল্লাবাড়ির গোষ্ঠীর লোকজনের মধ্যে ঝগড়া হয়। ঝগড়ার জেরে রাত ৯টার দিকে সংবদ্ধভাবে হামলা চালিয়ে নিরিহ রুস্তকে একা পেয়ে তাঁকে হত্যা করা হয় বলে অভিযোগ করেছেন নিহতের স্বজনরা। এই ঘটনার সুষ্ঠু বিচারও দাবি করেছেন তারা। 

 


বুধবার দুপুরে সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, আস্তমা পয়েন্টে এসআই আকবরের নেতৃত্বে ৭/৮ জন পুলিশ সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন। পয়েন্ট ও রুস্তম আলীর ভাঙাচোরা টিনের ঘরে—বাইরে চলছে পিনপতন নীরবতা। তার লাশ তখনো সিলেটের ওসমানি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। বৃদ্ধ মা ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছেন আর প্রিয় ছেলেকে খুঁজছেন। আত্মীয় স্বজনে বাড়ি ভরে গিয়েছে। সকলের দাবি, রুস্তম নির্দোষ মানুষ। সে কারো কিছুইতে যায় না। তাকে কেনো অন্যায়ভাবে হত্যা করা হলো? এর সুষ্ঠু বিচার চান তারা। 

 


প্রতিবেদনের তথ্য সংগ্রহ করতে করতেই এ্যাম্বুলেন্সের সাইরেনে ভারী হয়ে উঠে আস্তমা গ্রামের পরিবেশ। এ্যাম্বুলেন্সের আওয়াজকে ছাপিয়ে মাঝপাড়ার পরিবেশ আরও ভারী হয়ে উঠে রুস্তমের আত্মীয় স্বজনের কান্নায়।
রুস্তমের মা গগণ বিদারী কন্ঠে বলেন, আমার আদরের ধন আর থাকলো না। জিলু, মতিন এরা মিলে আমার ছেলেকে মেরে ফেলেছে। এখন আমার সংসার চালাবে কে? আমি তাদের ফাঁসি চাই।
চাচা জাহির আলী বলেন, আমার আর কোনো দাবি নাই, আমার ভাতিজাকে যারা খুন করেছে আমি তাদের ফাঁসি চাই। আত্মীয় সাজ্জাদ মিয়া, হাফিজ হোসাইন আহমদ ও আরিছ আলী বলেন, আমাদের দাবি একটাই, রুস্তম হত্যার বিচার চাই। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে আমরা এর সুষ্ঠু বিচার চাই। খুনিদের সর্বোচ্চ শাস্তি ফাঁসি চাই।

 


এ ঘটনায় নজিব আলী ও আশ্রব আলীর ছেলে জুয়েল মিয়াকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। পরিস্থিতি শান্ত রাখতে আস্তমা গ্রামে বেশ কয়েকজন পুলিশও মোতায়েন করা হয়েছে। 
ঘটনার বিষয়ে জানতে বিভিন্নভাবে চেষ্টা করে অভিযুক্ত মতিন মিয়া, জিল্লুর রহমান ও নজিব আলীর বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি। তারা আত্মগোপনে রয়েছেন। নজিব আলী আছেন পুলিশের হেফাজতে। মতিন মিয়ার বাড়িতে গিয়ে তার স্ত্রীকে পাওয়া গেলেও এ বিষয়ে তিনি কিছু বলতে চাননি। নজিব আলীর স্ত্রী ছালেখা বেগম বলেন, আমার ছেলে ও স্বামী নির্দোষ, ছেলে অসুস্থ। ঘরে বিছানায় পড়ে ছিলো। একটা হট্টগোল লাগার পরে অন্ধকারের মাঝে তাদের মানুষই রুস্তমকে হত্যা করেছে। এখন আমাদের উপর দোষ চাপাচ্ছে। আমরা বাড়ি ঘরে নিরাপদ না। জিল্লুর রহমানের মা জানিয়েছেন, আমার ছেলেরা মারামারিতে ছিলো না। নজিব আলীর সাথে তাদের ঝামেলা বেশ কয়েকদিন ধরে চলছিলো। আমার কোনো ছেলেই মারামারিতে জড়িতে ছিলো না। তারা আমার ছেলেদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত করেই এমনটি করছে। 

 


কেন ঘটলো এমন ঘটনা?
আস্তমা গ্রামে কী এমন ঘটেছিলো যে হত্যাকাণ্ডের মতো ঘটনা ঘটে গেলো? এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজতে এই প্রতিবেদক গ্রামের বেশ কয়েকজন প্রবীণ ও যুবকদের সাথে কথা বলেন। তারা কেউ কথা বলতে রাজি হননি। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তারা জানিয়েছেন, মোল্লাবাড়ির গোষ্ঠী ও জিল্লু মিয়ার গোষ্ঠীর দ্বন্দ্ব চলছে প্রায় চার মাস ধরে। চার মাস আগে আরিছ আলীর ভাতিজাকে মারধরের ঘটনাকে কেন্দ্র করে মূল ঘটনার সূত্রপাত। ওই দিনের পরের দিন দু’পক্ষের মধ্যে মারামারি ঘটেছিলো। বিষয়টি বাইরে বাহিরে শেষ হলেও ভিতরে থেকে যায় দুপক্ষেরই। এর জেরে গত ২৪ জুন পুনরায় দুপক্ষের মধ্যে মারামারি হয়। আহত হন আরিছ আলী। কয়েকদিন চিকিৎসাধীন ছিলেন সিলেটের প্রাইভেট ও এমএজি ওসমানি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। চিকিৎসা শেষে ১৫ দিন আগে বাড়িতে আসেন আরিছ। ঘটনাটিকে মিটমাট করতে একাধিক শালিস ব্যক্তি মধ্যস্থতার চেষ্টা করা হলেও একপক্ষ মানলে আরেক পক্ষ মানেন না বলে সূত্র জানিয়েছে। পঞ্চায়েত থেকে বিতারিত অভিযোগে একজনকে বৈঠকে রাখা যাবে না শর্ত দেন মোল্লাবাড়ির পক্ষ। কিন্তু তা মানতে রাজি নন জিল্লু মিয়া পক্ষ। তাকে নিয়েই বসতে আগ্রহ তাদের। এই দ্বন্দ্বে বিষয়টি আর মিমাংসা হয়নি। দীর্ঘ দিনের এমন মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্বের ফলেই হতাহতের মতো ঘটনা ঘটেছে বলে জানিয়েছে স্থানীয় একাধিক সূত্র।

 


শান্তিগঞ্জ থানার ওসি অলি উল্লাহ ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে বলেছেন, আমরা এখনো পর্যন্ত এই ঘটনায় দুইজনকে গ্রেপ্তার করেছি। পুলিশ ঘটনাস্থলে মোতায়েন করা আছে। আর কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। বাকী আসামীদের ধরতে অভিযান অব্যাহত রেখেছি আমরা। পরিস্থিত নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।

উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন


সম্পাদক মণ্ডলীর উপদেষ্টা : স্বপন কুমার দেব, কুমার সৌরভ

সম্পাদক ও প্রকাশক : পঙ্কজ কান্তি দে

অনলাইন সম্পাদক : মাহবুবুল হাছান শাহীন

সম্পাদক কর্তৃক অক্ষর মুদ্রণ অফসেট প্রেস, জোয়াহের রাজা ট্রেড সেন্টার, পুরাতন বাসস্টেশন, সুনামগঞ্জ।

মোবাইল : ০১৭১৮৩৪৫৯৭৫

বিজ্ঞাপন : ০১৩২৫৪৬২৪৯৫

ই-মেইল : [email protected]

সুনামগঞ্জের খবর পরিবার