বৈঠা হাতে সুমিত্রার সংগ্রাম

প্রকাশিত: ১৫ জুলাই, ২০২৬ ২৩:৪৯

বৈঠা হাতে সুমিত্রা --ছবি. সুখবর

ভোর ছয়টায় যখন চারপাশ সুনশান আর শান্ত জলে ঢাকা থাকে তখনই শুরু হয় তার দিন। হাতে একটি কাঠের বৈঠা, আর সঙ্গী বলতে কেবল একটি ছোট্ট ডিঙ্গি নৌকা। এরপর সারা দিন উত্তাল জলরাশি পেরিয়ে যাত্রী পারাপার। কখনও রাত ১০টা, কখনও বা ১১টা পর্যন্ত চলে এই অবিরাম পথচলা। দিন শেষে আয় বলতে মাত্র ৪০০ থেকে ৪৫০ টাকা। এই সামান্য আয়েই চলে তিন মেয়েকে নিয়ে চার সদস্যের এক সংগ্রামী সংসার। শাল্লা উপজেলার রঘুনাথপুর গ্রামের বিধবা সুমিত্রা রাণী দাস যেন দেশের হাওরাঞ্চলের লড়াকু নারীদের এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি।

 


ছয় বছর আগে স্বামী সুকেন চন্দ্র দাস মারা যাওয়ার পর সংসারের পুরো দায়িত্ব এসে পড়ে সুমিত্রার কাঁধে। তবে স্বামী বেঁচে থাকাকালেও তিনি বসে ছিলেন না, সংসারের হাল ধরতে ফেরি নৌকা চালাতেন। বর্তমানে সুমিত্রার বড় মেয়ে জলি রাণী দাসের বিয়ে হয়েছে। মেজো মেয়ে কপি রাণী দাস সিলেট পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে এবং ছোট মেয়ে স্থানীয় সাহিদ আলী মডেল উচ্চ বিদ্যালয়ের ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়াশোনা করছে। মেয়েদের পড়ালেখা ও বেঁচে থাকার লড়াই নিয়ে সুমিত্রা রাণী বলেন, দিন—রাত বৈঠা চালিয়ে কাজ করি। বর্ষা শেষে আবার বালু—পাথর বহনের শ্রমিকের কাজ করতে হয়। শরীরে অনেক রোগ বাসা বেঁধেছে। মেয়েদের পড়াশোনার খরচ চালাতে ঋণ করতে হয়। পরিশ্রমের আয় দিয়ে সংসারই চলে না, তার ওপর ঋণের কিস্তি আর অভাব যেন পিছু ছাড়ে না। সরকারি কোনো আর্থিক সহায়তা পেলে চিকিৎসা করাতে পারতাম, ঋণটাও কিছুটা শোধ হতো।

 

 

 

 

 


তিনি জানান, গত জ্যৈষ্ঠ মাসে ২৫ হাজার টাকা কিস্তিতে নৌকাটি কিনেছেন। বর্ষার ৫—৬ মাস নৌকা চালিয়ে যা আয় হয়, তা দিয়ে কিস্তি শোধ আর সংসার চালানো এখন প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
এদিকে হাওরাঞ্চলে জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব দিন দিন আরও স্পষ্ট হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, আকস্মিক পাহাড়ি ঢল, দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা এবং ঘন ঘন প্রাকৃতিক দুর্যোগ সুমিত্রার মতো প্রান্তিক মানুষের জীবনকে চরম অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিচ্ছে। অতিবৃষ্টি ও ঝড়ো হাওয়ার সময় ডিঙ্গি নৌকা চালানো অত্যন্ত বিপজ্জনক হয়ে উঠে। বর্ষাকাল দীর্ঘায়িত হলে দিনমজুরির সুযোগ কমে যায়। আর শুকনো মৌসুমে কৃষি ও শ্রমবাজার সংকুচিত হয়ে পড়ায় আয় কমে যায় এবং ঋণের বোঝা আরও ভারী হয়।

 


স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, কয়েক বছর আগেও বর্ষার সময়কাল ও পানির প্রবাহ অনুমান করা যেত। কিন্তু বর্তমানের অস্বাভাবিক আবহাওয়া দরিদ্র পরিবারগুলোর অর্থনৈতিক সংকটকে কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
জানা যায়, সুমিত্রা রাণী বর্তমানে সমাজসেবা অধিদপ্তর থেকে বিধবা ভাতা পাচ্ছেন এবং একটি সরকারি ঘরও পেয়েছেন। তবে তা প্রয়োজনের তুলনায় অত্যন্ত অপ্রতুল। এলাকার সচেতন মহলের মতে, সুমিত্রাকে স্বাবলম্বী করতে ভিজিএফ ও জরুরি খাদ্য সহায়তা কর্মসূচি, সমাজসেবা অধিদপ্তরের ক্ষুদ্রঋণ ও পুনর্বাসন কর্মসূচি, মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তার কার্যালয়ের প্রশিক্ষণ ও আত্মকর্মসংস্থানপ্রকল্প থেকে সহায়তা দেওয়া প্রয়োজন। 

 


পাশের গুইঙ্গারগাঁও গ্রামের বাসিন্দা নির্মল সুমিত্রার অসহায়ত্বের কথা তুলে ধরে বলেন, এই মহিলা দিন—রাত, রোদ—বৃষ্টি উপেক্ষা করে আমাদের পারাপার করেন, অত্যন্ত অসহায় তিনি। এই সামান্য রোজগারে উনার সংসার চলে না। তিনি শারীরিকভাবেও অসুস্থ, উনার চিকিৎসা দরকার। দেশের বিত্তবান বা সরকার যদি উনাকে একটা স্থায়ী সহায়তার ব্যবস্থা করে দিত, তবে পরিবারটি বেঁচে যেত।

 


শাল্লা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা পিয়াস চন্দ্র দাস বলেন, আমাদের পক্ষ থেকে যথাসাধ্য সহায়তা করে আসছি। ভবিষ্যতে সরকারি কোনো সুযোগ—সুবিধা বা প্রকল্প এলে তাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। উনার শারীরিক অসুস্থতার চিকিৎসার জন্য জরুরি সহায়তা এবং মেয়ের পড়াশোনার জন্য শিক্ষা সহায়তার বিষয়টি আমরা অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে বিবেচনায় নেব।

 


প্রসঙ্গত, প্রতিদিন শত শত মানুষের গন্তব্যে পৌঁছানোর সারথি সুমিত্রা রাণী দাসের নিজের জীবনটাই যেন এক অন্তহীন ও অনিশ্চিত যাত্রা। বৈঠার প্রতিটি টানে তিনি শুধু নৌকা নয়, টেনে নিয়ে চলেছেন তার পরিবারের স্বপ্নগুলোকে। দারিদ্র্য, অসুস্থতা আর জলবায়ু পরিবর্তনের একের পর এক ধাক্কা সত্ত্বেও হাওরের বুকে বুক চিতিয়ে লড়ে যাচ্ছেন এই মহিয়সী নারী। তিনি এখনও আশা হারাননি—হয়তো কোনো সহৃদয় হাত বা সরকারি সঠিক উদ্যোগ একদিন তাঁর এই কঠিন জীবনযুদ্ধকে কিছুটা হলেও সহজ করে তুলবে।

উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন


সম্পাদক মণ্ডলীর উপদেষ্টা : স্বপন কুমার দেব, কুমার সৌরভ

সম্পাদক ও প্রকাশক : পঙ্কজ কান্তি দে

অনলাইন সম্পাদক : মাহবুবুল হাছান শাহীন

সম্পাদক কর্তৃক অক্ষর মুদ্রণ অফসেট প্রেস, জোয়াহের রাজা ট্রেড সেন্টার, পুরাতন বাসস্টেশন, সুনামগঞ্জ।

মোবাইল : ০১৭১৮৩৪৫৯৭৫

বিজ্ঞাপন : ০১৩২৫৪৬২৪৯৫

ই-মেইল : [email protected]

সুনামগঞ্জের খবর পরিবার