বাঁশ-বেতের কারুশিল্পেই ভরসা আব্দুল বাতিনের

প্রকাশিত: ২০ জুলাই, ২০২৬ ২৩:৩৮

একসময় গ্রামের প্রতিটি বাড়িতে ছিল বাঁশ—বেতের তৈরি বেড়া, চালনি, খাঁচা, খোলা ও নানা গৃহস্থালি সামগ্রী। সময়ের সঙ্গে প্লাস্টিক ও স্টিলসহ নানা পণ্যের ব্যবহার বাড়ায় হারিয়ে যেতে বসেছে সেই ঐতিহ্যবাহী হস্ত ও কারুশিল্প। তবুও পৈতৃক এই পেশা আঁকড়ে ধরে জীবিকা নির্বাহ করছেন সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার রাধানগর গ্রামের ৭০ বছর বয়সী কারুশিল্পী মোহাম্মদ আব্দুল বাতিন ও তাঁর পরিবার।

 


সোমবার বিকেলে সরেজমিনে সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার রাধানগর এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, সড়কের পাশেই খোলা জায়গায় স্তূপ করে রাখা হয়েছে কাঁচা বাঁশ। সেখানেই বসে নিপুণ হাতে বাঁশ চিরে একের পর এক গাছের পিঞ্জিরা তৈরি করছেন কারুশিল্পী মোহাম্মদ আব্দুল বাতিন। বয়সের ভারে শরীর নুয়ে এলেও থেমে নেই তাঁর হাত। পাশে বসে একই কাজে সহযোগিতা করছেন ছেলে রফিকুল ইসলাম। দুজনের হাতের ছোঁয়ায় ধীরে ধীরে বাঁশের কঞ্চিগুলো রূপ নিচ্ছে পরিবেশবান্ধব গাছের সুরক্ষাবেষ্টনীতে। আশপাশে পড়ে আছে তৈরি হওয়া পিঞ্জিরা, বাঁশের ফালি, কাঁচি, দা ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম। কাজ করতে করতেই বাবা—ছেলের মুখে ফুটে ওঠে পৈতৃক এই শিল্প হারিয়ে যাওয়ার শঙ্কা।


দীর্ঘদিনের এই পারিবারিক কারুশিল্প শুধু একটি পেশা নয়, এটি একটি ঐতিহ্য। কিন্তু আধুনিকতার ছোঁয়ায় সেই ঐতিহ্য আজ অস্তিত্ব সংকটে। আব্দুল বাতিন জানালেন, বাবা মসদ আলীর কাছ থেকে শেখা এই কাজ ছেলেসহ তাঁর পরিবারের অন্য সদস্যরাও করছেন।

 


তিনি বাঁশ দিয়ে বিভিন্ন ধরনের পরিবেশবান্ধব সামগ্রী তৈরি করছেন। বর্তমানে সড়কের পাশে ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে গাছ সুরক্ষায় ব্যবহৃত ‘গাছের পিঞ্জিরা’ তৈরি করছেন। পাশাপাশি বাড়ির বেড়া, খোলা, চালনি, দোসন, মুরগির খাঁচাসহ নানা ধরনের বাঁশের সামগ্রীও তৈরি করেন।

 


আব্দুল বাতিন বলেন, আমি এই কাজ আমার বাবার কাছ থেকে শিখেছি। এখন আমার ছেলেরাও আমার কাছ থেকেই শিখছে। আমরা বাপ—ছেলে তিন প্রজন্ম ধরে কাজের সঙ্গে জড়িত। কিন্তু এখন প্লাস্টিক আর স্টিলের কারণে মানুষের চাহিদা অনেক কমে গেছে।

 


তিনি বলেন, আমরা যে গাছের পিঞ্জিরা বানাই, এতে পরিবেশের কোনো ক্ষতি হয় না। বরং গাছকে গরু—ছাগলের ক্ষতি থেকে রক্ষা করে। প্লাস্টিকের বদলে মানুষ যদি বাঁশের তৈরি জিনিস বেশি ব্যবহার করে, তাহলে পরিবেশও ভালো থাকবে, আমাদের মতো কারিগরদের জীবনও বাঁচবে।

 


তিনি আরও বলেন, দিনে ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা আয় হয়। কোনো দিন আবার সেটাও হয় না। কাজ কমে যাওয়ায় সংসার চালাতে কষ্ট হচ্ছে। তারপরও পৈতৃক পেশা ছাড়তে চাই না। তাছাড়া অন্য বয়সের কারনে কাজও করতে পারি না। বাবার পথ অনুসরণ করে এই পেশায় যুক্ত হয়েছেন তাঁর ছেলে রফিকুল ইসলাম। চার বছর ধরে বাবার সঙ্গে কাজ করছেন তিনি।

 


রফিকুল ইসলাম বলেন, ছোটবেলা থেকেই বাবার কাছে কাজ শিখেছি। আগে এই কাজের অনেক চাহিদা ছিল। এখন প্লাস্টিকের জিনিস সহজে পাওয়া যায় বলে মানুষ বাঁশের জিনিস কম কিনে। যদি মানুষ আবার পরিবেশবান্ধব পণ্যের দিকে ঝুঁকে এবং আমাদের তৈরি জিনিসের ন্যায্য মূল্য দেয়, তাহলে আমরা ভালোভাবে বাঁচতে পারব।

 


স্থানীয় বাসীন্দা রিপন মিয়া বলেন, পরিবেশ রক্ষায় প্লাস্টিকের বিকল্প হিসেবে বাঁশ—বেতের পণ্য ব্যবহারে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগ বাড়ানো প্রয়োজন। এতে যেমন পরিবেশ দূষণ কমবে, তেমনি বিলুপ্তপ্রায় এই ঐতিহ্যবাহী হস্ত ও কারুশিল্পও টিকে থাকবে।

 


স্থানীয় বাসীন্দা শিক্ষক অনুপম বড়ুয়া বলেন, আগে প্রায় প্রতিটি বাড়িতেই বাঁশের তৈরি চালনি, খাঁচা, বেড়া ও বিভিন্ন গৃহস্থালি সামগ্রী ব্যবহার হতো। এখন প্লাস্টিকের কারণে এসবের ব্যবহার অনেক কমে গেছে। অথচ বাঁশের তৈরি জিনিস অনেক বেশি টেকসই ও পরিবেশবান্ধব। আমরা সবাই মিলে এই কারুশিল্পকে বাঁচিয়ে রাখার সহযোগিতা করতে হবে। তবে সরকার থেকে বিভিন্ন উদ্যোগ নিতে হবে।

 


পাশে থাকা মুদি দোকনদার নাদিহ আলম বলেন, এই পরিবারটি দীর্ঘদিন ধরে ঐতিহ্যবাহী বাঁশের কাজ করে আসছে। তাদের তৈরি জিনিসের মান ভালো। বাজার ও প্রচারের অভাবে তারা ন্যায্য দাম পাচ্ছেন না। প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিক্রি ও প্রচারের ব্যবস্থা করা হলে তারা আরও উৎসাহ পাবেন।

 


বাঁশের তৈরি পিঞ্জিরা কিনতে আসা মুর্শেদ আলম বলেন, গাছের পিঞ্জিরা হিসেবে বাঁশের তৈরি সামগ্রী খুবই কার্যকর। এতে গাছ সুরক্ষিত থাকে এবং পরিবেশেরও কোনো ক্ষতি হয় না। সরকারি বিভিন্ন বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিতে এসব পণ্যের ব্যবহার বাড়ানো উচিত।

 


তিনি আরও বলেন,  বাড়ির কাজে কয়েকবার তাদের তৈরি বাঁশের সামগ্রী কিনেছি। প্লাস্টিকের তুলনায় এগুলো পরিবেশের জন্য ভালো। দাম কিছুটা বেশি হলেও মানের দিক থেকে সন্তোষজনক।

উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন


সম্পাদক মণ্ডলীর উপদেষ্টা : স্বপন কুমার দেব, কুমার সৌরভ

সম্পাদক ও প্রকাশক : পঙ্কজ কান্তি দে

অনলাইন সম্পাদক : মাহবুবুল হাছান শাহীন

সম্পাদক কর্তৃক অক্ষর মুদ্রণ অফসেট প্রেস, জোয়াহের রাজা ট্রেড সেন্টার, পুরাতন বাসস্টেশন, সুনামগঞ্জ।

মোবাইল : ০১৭১৮৩৪৫৯৭৫

বিজ্ঞাপন : ০১৩২৫৪৬২৪৯৫

ই-মেইল : [email protected]

সুনামগঞ্জের খবর পরিবার