কাদা ছোড়াছুড়িতে দৃশ্যমান দুই গ্রুপ

প্রকাশিত: ২৪ জুলাই, ২০২৬ ০০:২৪

বৃহস্পতিবার বিকেলে দিরাই বাগানবাড়ি কমিউনিটি সেন্টারে অনুষ্ঠিত ‘সরকারের উন্নয়ন অগ্রযাত্রা সভা’ -ছবি. সুখবর

দিরাই—শাল্লায় এমপির আশীর্বাদ বা এমপির নানা বরাদ্দ কারা নিয়ন্ত্রণ করবে এই নিয়ে দলে বিরোধ তৈরি হয়েছে। দলের দুইপক্ষ প্রকাশ্যে একে অপরের বিরুদ্ধে বিষোদগার করছে। এ কারণে প্রকাশ্য দুই গ্রুপ তৈরি হয়েছে। বৃহস্পতিবার দুপুরে একাংশকে বাদ দিয়ে অন্য অংশ ‘সরকারের উন্নয়ন অগ্রযাত্রা’ ব্যানারে সভা করেছে।

 


দিরাই শাল্লায় বিএনপির রাজনীতি আবর্তিত হয় নাছির উদ্দিন চৌধুরীকে কেন্দ্র করেই। নাছির উদ্দিন চৌধুরী বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য। ভাটি অঞ্চলের ডাকসাইটে এই রাজনীতিক গেল জাতীয় নির্বাচনের আগে অসুস্থ হয়ে পড়েন। এরপরও নির্বাচনী এলাকায় ব্যাপকভাবে জনপ্রিয় ওই নেতাকেই দল মনোনয়ন দেয়। বয়োজ্যেষ্ঠ নাছির উদ্দিন চৌধুরী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিপুল ভোটে জয়ী হয়ে এমপি হবার পর এমপি’র ছায়া কে পাবেন— এই নিয়ে স্থানীয়ভাবে দ্বন্দ্ব শুরু হয়। দ্বন্দ্বে যুক্ত দুইপক্ষের একপক্ষে আছেন নাছির উদ্দিন চৌধুরীর ভাই মঈন উদ্দিন চৌধুরী মাসুক। তিনি উপজেলা বিএনপির প্রথম যুগ্ম আহ্বায়ক (স্বাক্ষর ক্ষমতাপ্রাপ্ত)। এমপি অসুস্থ থাকায় স্থানীয়ভাবে প্রচার আছে আরেকপক্ষের আশীর্বাদ পায়— নাছির উদ্দিন চৌধুরীর স্ত্রী পারভিন আক্তারের। 
গত কয়েকদিন হয় দুইপক্ষের পাল্টাপাল্টি সংবাদ সম্মেলন, যৌথসভা, অব্যাহতির সুপারিশ এবং পৃথক কর্মসূচির মধ্য দিয়ে দুইপক্ষের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব প্রকাশ্য রূপ পায়।

 

 
দলীয় একাধিক কর্মী জানান, নাছির উদ্দিন চৌধুরী এমপি হবার পর বিএনপির উপজেলা আহ্বায়ক আমির হোসেনের নেতৃত্বাধীন একটি বলয় এবং সদস্য সচিব মঈন উদ্দিন চৌধুরী মাসুকের নেতৃত্বাধীন আরেক বলয় তৈরি হয়। এমপি’র প্রভাব ও আশীর্বাদ পাবার চেষ্টায় মরিয়া হয়ে ওঠে দুইগ্রুপই। 
গেল ছয় জুলাই উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক আমির হোসেন, জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য আব্দুর রশিদ চৌধুরী এবং উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক হুমায়ুন কবির তালুকদার তাদের অনুসারীদের নিয়ে উপজেলা ও পৌর বিএনপির দায়িত্বশীলদের না জানিয়েই স্থানীয় সংসদ সদস্য নাছির উদ্দিন চৌধুরীকে নিয়ে অপপ্রচার হচ্ছে দাবি করে এর প্রতিবাদ জানিয়ে সংবাদ সম্মেলন করেন। ওই সংবাদ সম্মেলনে সদস্য সচিব মঈন উদ্দিন চৌধুরী মাসুকসহ তার সমর্থকদের ডাকা হয় নি। 

 


উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহবায়ক হুমায়ুন কবির তালুকদারও একই ধরনের মন্তব্য করেন। 
এরপর ১৬ জুলাই উপজেলা বিএনপির সদস্য সচিব মঈন উদ্দিন চৌধুরী মাসুক, পৌর বিএনপির আহ্বায়ক মিজানুর রহমান এবং সদস্য সচিব অ্যাডভোকেট ইকবাল হোসেন চৌধুরীর নেতৃত্বে দলীয় কার্যালয়ে যৌথসভা হয়। ওই সভায় দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গ, গঠনতন্ত্র পরিপন্থী কর্মকান্ডসহ নানা অভিযোগ এনে উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক আমির হোসেন ও যুগ্ম আহ্বায়ক হুমায়ুন কবির তালুকদারকে দল থেকে অব্যাহতির সুপারিশ করে জেলা বিএনপির কাছে চিঠি পাঠানো হয়। একইসঙ্গে বিষয়টি কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দকেও অবহিত করা হয়েছে বলে দাবি করা হয়।

 


এই ধারাবাহিকতায় বৃহস্পতিবার (২৩ জুলাই) পৌর শহরের বাগানবাড়ি কমিউনিটি সেন্টারে উপজেলা বিএনপির ব্যানারে ‘সরকারের উন্নয়ন অগ্রযাত্রা’ শীর্ষক সভা আহ্বান করে। এই সভা নিয়েও নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়।

 


উপজেলা ও পৌর বিএনপির একাংশের নেতারা জানান, সভা আয়োজনের বিষয়ে তাদের কেউই আনুষ্ঠানিকভাবে অবহিত ছিলেন না। 
সভায় উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক আমির হোসেনের সভাপতিত্বে জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য আব্দুর রশিদ চৌধুরী, যুগ্ম আহ্বায়ক হুমায়ুন কবির তালুকদার, সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান কবির মিয়াসহ কয়েকজন দায়িত্বশীল নেতা বক্তব্য দেন।

 


তবে সভায় উপজেলা বিএনপির সদস্য সচিব মঈন উদ্দিন চৌধুরী মাসুক, যুগ্ম আহ্বায়ক আব্দুল করিম, পৌর বিএনপির আহ্বায়ক মিজানুর রহমান, সদস্য সচিব অ্যাডভোকেট ইকবাল হোসেন চৌধুরীসহ উপজেলা ও পৌর বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির অধিকাংশ সদস্য এবং ছাত্রদল ও যুবদলের অনেক পদধারী নেতা অনুপস্থিত ছিলেন।

 


এ বিষয়ে উপজেলা বিএনপির সদস্য সচিব মঈন উদ্দিন চৌধুরী মাসুক বলেন, উপজেলা ও পৌর বিএনপির দায়িত্বশীলদের না জানিয়ে সভা করা দলীয় শৃঙ্খলা ও গঠনতন্ত্রবিরোধী। আমরা দীর্ঘ ১৬ বছর রাজপথে আন্দোলন করেছি, জেল—জুলুম সহ্য করেছি। যারা এতদিন আওয়ামী লীগের দালালি করেছেন, তারা এখন বিএনপির জন্য মায়াকান্না দেখাচ্ছেন এবং আমাদের নেতা নাছির উদ্দিন চৌধুরীর ঘনিষ্ঠ সেজেছেন। আওয়ামী লীগের দালাল ও সুবিধাবাদীদের দিরাই বিএনপিতে কোনো স্থান হবে না। শৃঙ্খলাবিরোধী কর্মকান্ডে জড়িত কয়েকজনের বিরুদ্ধে অব্যাহতির সুপারিশ জেলা বিএনপির কাছে পাঠানো হয়েছে এবং কেন্দ্রীয় নেতাদেরও বিষয়টি জানানো হয়েছে।

 


পৌর বিএনপির সদস্য সচিব ইকবাল চৌধুরী বলেন, ‘আমরা কেউ এমপির বিরুদ্ধে নয়। আমাদের অভিভাবক তিনি। পৌরসভা বিএনপিকে না জানিয়ে সুযোগ সন্ধানীরা ইতোপূর্বে কৃষি সহায়তা কার্ডসহ নানা সরকারি সহায়তা বিতরণ করেছে। এনিয়ে দলের দুর্নাম হয়েছে। গণমাধ্যমে অনিয়মের খবর এসেছে। দলের উপজেলা আহ্বায়ক ছয়মাসের বেশি সময় হয় দলের সভা ডাকেন না। সংবাদ সম্মেলন করেন তিনি অথচ যুগ্ম আহ্বায়ক মঈন উদ্দিন চৌধুরী মাসুকসহ আমাদের ডাকেন না, তাঁর জন্যই দ্বন্দ্ব তৈরি হয়েছে।

 


এই অংশের একজন নেতা বললেন, আমরা মনে করি আমাদের নেতা নাছির উদ্দিন চৌধুরী এসব বিষয়ে অবগত নন। তবে তার স্ত্রী’র পৃষ্ঠপোষকতার কথা কেউ কেউ বলেন। 

 


অন্যদিকে উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক আমির হোসেন অভিযোগ করে বলেন, উপজেলা বিএনপির সদস্য সচিব মঈন উদ্দিন চৌধুরী মাসুক, পৌর বিএনপির আহ্বায়ক মিজানুর রহমান ও সদস্য সচিব অ্যাডভোকেট ইকবাল হোসেন চৌধুরী দলে গ্রুপ সৃষ্টি করছেন। এজন্য তাদের সভায় আমন্ত্রণ জানানো হয় নি। তিনি দাবি করেন, আমরা এমপি সাহেবের সকল বরাদ্দ স্বচ্ছভাবে বণ্টন করার চেষ্টা করছি। কাজ ছাড়া কাবিখা’র বরাদ্দ কাউকে দেওয়া যায় নি। আমাদের দলের কেউ কেউ কাজ ছাড়াই বরাদ্দ নিতে চান। এটা আমরা সমর্থন করি না। এমপি সাহেবও এসব আমলে নেন না। এমপি সাহেবের নির্দেশেই সবকিছু করছি আমরা। দিরাই—শাল্লার বিএনপির সকল কর্মী নাছির উদ্দিন চৌধুরীর প্রতি আস্থাশীল। এমপি সাহেবের স্ত্রী কোন কিছুতেই হস্তক্ষেপ করেন না।

 


এমপি নাছির উদ্দিন চৌধুরী ও স্ত্রী পারভিন আক্তার ফোন রিসিভ না করায় এসব বিষয়ে তাদের বক্তব্য জানা যায় নি।
সুনামগঞ্জ জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কলিম উদ্দিন আহমদ মিলন বলেন, দিরাই উপজেলার কোন দায়িত্বশীল নেতাকে অব্যাহতির সুপারিশ করে পাঠানো কোন চিঠি আমরা পাই নি।

উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন


সম্পাদক মণ্ডলীর উপদেষ্টা : স্বপন কুমার দেব, কুমার সৌরভ

সম্পাদক ও প্রকাশক : পঙ্কজ কান্তি দে

অনলাইন সম্পাদক : মাহবুবুল হাছান শাহীন

সম্পাদক কর্তৃক অক্ষর মুদ্রণ অফসেট প্রেস, জোয়াহের রাজা ট্রেড সেন্টার, পুরাতন বাসস্টেশন, সুনামগঞ্জ।

মোবাইল : ০১৭১৮৩৪৫৯৭৫

বিজ্ঞাপন : ০১৩২৫৪৬২৪৯৫

ই-মেইল : [email protected]

সুনামগঞ্জের খবর পরিবার