প্রকাশিত: ২৬ জুলাই, ২০২৬ ২২:৪৬
সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলার পিটাইটিকর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা বিউটি রানী পাল। তিনি প্রায়ই নিজের ফেসবুক একাউন্টে তার বিদ্যালয়ে ক্লাস নেওয়া, বাচ্চাদের শরীর চর্চা করানো, শিশুদের নাচ গানের মাধ্যমে গণিতের বিভিন্ন চিহ্নসহ পাঠ্য বইয়ের বিভিন্ন পড়া শেখানো, শিক্ষাদের নিয়ে বৃক্ষরোপণ ও গাছের চারা বিতরণ করার ভিডিও আপ দিতেন। সুন্দর শাড়ি পড়ে পরিপাটি অবস্থায় ভিডিও পোস্ট নিয়ে সমালোচনা ও ট্রল শুরু করে একটি উগ্রবাদী গোষ্ঠী।
বৃহস্পতিবার (২৩ জুলাই) দুপুরের দিকে তিনি নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্ট ডিফারেন্ট টাচ ব্যান্ডের মেজবার গাওয়া ‘আজ কেন মন, উদাসী হয়ে’ গানের সঙ্গে একটি রিল ভিডিও পোস্ট করেন। ভিডিওতে তিনি স্কুল প্রাঙ্গণে হাঁটাহাঁটি করছিলেন। সুন্দর শাড়ি পড়ে পরিপাটি অবস্থায় ভিডিও পোস্ট নিয়ে সমালোচনা ও ট্রল শুরু করে একটি উগ্রবাদী গোষ্ঠী।
শিক্ষিকা বিউটি রানী পালের ভিডিওটি নেতিবাচকভাবে ভাইরাল করা হলে তিনি উগ্রবাদী গোষ্ঠির তোপের মুখে পড়েন। ভিডিও করার কারণে জেলা পর্যায়ের শ্রেষ্ঠ এই স্কুল শিক্ষিকার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ারও দাবি তুলে। তাই তিনি তার ফেসবুক থেকে ভিডিওটি সরিয়ে নেন। এমন পরিস্থিতিতে বিউটি পালের পাশে দাঁড়িয়েছেন তার সহকর্মী, লেখক, সাংবাদিকসহ নানা পেশার মানুষজন। অভিনব ভাবে বিউটি পালকে নিয়ে সমালোচনা ও ট্রলের প্রতিবাদ জানাচ্ছে সারা দেশের মানুষজন।
বিউটি পালের সঙ্গে সংহতি জানিয়ে অনেক শিক্ষক শিক্ষিকা নিজেদের বিদ্যালয়ের সামনে তার মতো হেঁটে হেঁটে ‘শ্রাবণের মেঘগুলো জড়ো হলো আকাশে’ গানের সঙ্গে ফেসবুকে নিজের ভিডিও আপ করছেন। অনেকেই তার ছবি ভিডিও দিয়ে পোস্ট করে প্রতিবাদ জানাচ্ছেন। তাই বিউটিপাল আপ্লুত হয়ে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরের কাছে।
ফেসবুকে প্রতিবাদ জানিয়ে গল্পকার রুমা মোদক লিখেন, ‘আপনারা যেসব দেশকে উন্নত দেশ বলেন, সেসব দেশের শিশু শিক্ষার ভিডিও গুলো দেখেন। ইউটিউবে পাবেন।
এই যে একটা নির্দোষ মেয়েকে ভাইরাল করে দিলেন, কতোটা মুর্খতা প্রকাশ পেলো যদি জানতেন! ভাবছি এই সোশ্যাল মিডিয়ার মুর্খ প্রতিক্রিয়ায় মেয়েটির পেশার উপর কী খড়্গ নেমে আসে। কারণ কেউ সুস্থ বিবেচনা বোধ দিয়ে বিবেচনা করবে এমন সুবিচার বর্তমান বাংলাদেশে আশা করি না। জগ এন্ড মগ থিউরি, শিক্ষক গম্ভীর মুখে ক্লাসে খালি জগের মতো ‘লেখাপড়া’ ঢালবেন আর শিক্ষার্থী মগের মতো তা গ্রহণ করবে এই পদ্ধতি বহু আগে বাতিল হয়েছে। শিক্ষক—শিক্ষার্থীর সম্পর্ক এখন পারস্পরিক, দেওয়া নেওয়ার। বন্ধুত্বের। শিক্ষক, প্রধানত প্রাথমিক স্তরের শিক্ষকরা এমনই হবেন, এমন হাসিখুশি প্রাণবন্ত। শিশুরা তাকে দেখে ভয় পাবেনা। নিরাপদ ও আনন্দময় পরিবেশে শিক্ষণ—শিখন কার্যক্রম সবচেয়ে বেশি ফলপ্রসূ হয়।’
চট্টগ্রামের শিক্ষিকা শুক্লা মজুমদার আরও কয়েকজন শিক্ষক মিলে তাদের বিদ্যালয়ের সামনে ঝাড়ু হাতে নিয়ে ভিডিও তৈরি করে তার ফেসবুক আইডিতে পোস্ট দেন। ভিডিওর সাথে ‘আজ কেন মন, উদাসী হয়ে’ গানটি যুক্ত করে ভিডিওর ক্যাপশনে শুক্লা মজুমদার লিখেন, ‘সিলেটের শ্রেষ্ঠ প্রধান শিক্ষিকা বিউটি পালের সুন্দর ভিডিও যাদের ভালো লাগেনি তাদের জন্য নতুন সংশোধিত সংস্করণ।’
যমুনা টিভির সাংবাদিক শাকিল হাসান বিউটি পালের পাঠদানের আরেকটি ভিডিও ফেসবুকে শেয়ার করে লিখেন, ‘শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণের স্বতঃ:স্ফুর্ততাই বলে দিচ্ছে পড়ালেখা কি আনন্দের তাদের কাছে। বাচ্চাদের কাছে পড়ালেখা আনন্দময় করে তোলার কৃতিত্ব শিক্ষক বিউটি পালের। তিনি সেরা শিক্ষক। আশা করবো সরকার তাকে উদাহরন হিসেবে সারা দেশে তুলে ধরবে। পাশাপাশি সেরা শিক্ষক হিসেবে পুরস্কৃত করবে।’
শিশু সাহিত্যিক হুমায়ুন কবীর ঢালী লেখেন, ‘একজন শিক্ষকও রক্ত—মাংসের মানুষ। তারও আনন্দ উদযাপন করার অধিকার আছে, তেমনি কষ্টে মন খারাপ হওয়ার অধিকারও তার রয়েছে। শিক্ষক মানেই কোনো নিরাসক্ত যন্ত্র নন, সমাজ ও পরিস্থিতির প্রভাবে তার মনেও নানা অনুভূতির জন্ম হয়। যা অশ্লীল, তা শুধু শিক্ষকের ক্ষেত্রে নয়; সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রেও অশ্লীল। একইভাবে, যা শ্লীল, মার্জিত ও সুন্দর তা নির্দিষ্ট কোনো পেশার গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নয়, বরং তা সবার জন্য প্রযোজ্য। শিক্ষক সমাজের পথপ্রদর্শক হলেও দিনশেষে তিনিও সমাজেরই একজন মানুষ।’
সেই শিক্ষিকার সমর্থনে একই গানে ভিডিও বানিয়ে সহকর্মীদের প্রতিবাদ
এ ব্যাপারে প্রধান শিক্ষিকা বিউটি রানী পাল দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে আপ্লুত হয়ে বলেন, সবাই আমার পাশে দাঁড়িয়েছেন এই জন্য আমি কৃতজ্ঞ। তবে এ ব্যাপারটা নিয়ে এখন কিছুই বলতে পারব না। আমার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে আমাকে বক্তব্য দিতে হবে।
উল্লেখ্য, বিউটি রানী পাল সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলার পিটাইটিকর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা। তিনি ২০২৬ সালে জেলা পর্যায়ের শ্রেষ্ঠ শিক্ষক নির্বাচিত হন। শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি ইংলিশ লিটারেচার এন্ড ল্যাংগুয়েজ (ঊখখ) এ অনার্স ও মাস্টার্স করেছেন। তিনি ছোটবেলা থেকেই গান, নাচ, বক্তৃতা, চিত্রাঙ্কন, খেলাধুলা, আবৃত্তিসহ কো—কারিকুলার অ্যাকটিভিটিসে পারদর্শী ছিলেন।
সিলেট থেকে আরো পড়ুন