‘হায় হায়’ দশায় ফারইস্ট

প্রকাশিত: ২৬ জুলাই, ২০২৬ ২২:৫৯

সুনামগঞ্জের ৬০০ গ্রাহকের ইন্সুরেন্সের মেয়াদ পূর্ণ হবার পরেও প্রায় আড়াই কোটি টাকা প্রদান নিয়ে টালবাহনা শুরু করেছে ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্সুরেন্স নামের একটি বেরসকারি কোম্পানী। রবিবার এই প্রতিষ্ঠানের অফিসে গিয়ে বুঝা গেছে, ‘এটি হায় হায় কোম্পানীর’ অবস্থা ধারণ করেছে। এখানে এসে প্রতিদিন অসংখ্য গ্রাহক কান্নাকাটি করে শূন্য হাতে বাড়ি ফিরছেন।’ অফিসের সহকারী আঞ্চলিক ব্যবস্থাপক মেহেদী হাসান বললেন, ‘মানুষের চাপ সামালাতে না পেরে তিনিও কম আসেন অফিসে।’ ফ্যাসিস্ট সরকারের সময়কালের লুটপাটের চাপ পড়েছে এই অফিসেও বলেও মন্তব্য করলেন মেহেদী হাসান।

 

 

 


রবিবার বেলা ১১টায় জেলার বিশ^ম্ভরপুর উপজেলার বিশ^ম্ভরপুর গ্রামের জয়মতি বিশ্বাস এই প্রতিবেদকের অফিসে এসে বললেন, ‘স্বামী জগৎ বিশ্বাস এবং আমি দুজনেই দিনমজুর। অভাব—অনটনের সংসার আমাদের। একদিন ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্সুরেন্সের একজন অফিসার এসে বললো, গ্রামের ৪০ জনকে মিলিয়ে একসঙ্গে সকলের ইন্সুরেন্স করে টাকা তুলে দিন, আপনাকে বোনাস দেওয়া হবে। এরপর গ্রামের খুসবুল বেগম ৩৫ জনের এবং আমি পাঁচ জনের টাকা তুলে দিতে শুরু করি। আমাকে দুয়েকবার বোনাসও দেওয়া হয়েছিল। এরপর আর দেওয়া হয় নি। আমরা যাদেরকে ইন্সুরেন্স করিয়েছি সকলেরই দশ বছর পূর্ণ হয়েছে। মাসে ২০০ থেকে তিন হাজার টাকা পর্যন্ত দিয়েছে কেউ কেউ। আমি অসুস্থ হওয়ায় আমার নিজের ১১ হাজার টাকা জমা হবার পর আর দেওয়া হয় নি। দশ বছর পূর্ণ হবার পর আমরা বছর খানেক আগে টাকা নেবার জন্য এসেছি। আমাদের সঙ্গে টালবাহনা শুরু করে তারা। একপর্যায়ে ইসলামী ব্যাংকে অ্যাকাউন্ট খোলার কথা জানায়। আমরা সেভাবেই করেছি। এক হাজার টাকা জমা দিয়ে অ্যাকাইন্ট খোলার পর বছর খানেক হয়েছে। এখনো ঘুরাচ্ছে। একদিন আমাকে বলেছে, আসলে টাকা দিয়ে দেবে। আমি কেবল আসার ভাড়া নিয়ে এসেছিলাম। এসে টাকা না পাওয়ায় যাবার সময় বিশ^ম্ভরপুর পর্যন্ত হেটে বাড়ি গিয়েছি।’


জয়মতির সঙ্গে আসা একই গ্রামের দিনমজুর কনিকা বিশ^াস বললেন, আমার জমা হওয়া ২৪ হাজার চারশ ৪৪ টাকা পাওনার স্লিপ দেওয়া হয়েছে বছর খানেক আগে। এখনো টাকা দেই নি। বার বার আসি, আসলেই বলে পরের মাসে আসুন।

 


এরা দুজনই জানালেন, রবিবার আসার পর দেখা গেছে, অফিসে লোক একেবারে কম। যাদেরকে টাকা দিয়েছিলেন এদেরকে ফোন দেবার পর এরা জানায়, ‘আমরা এখানে আর চাকুরি করি না, যারা আছে তাদেরকে তোমরা বল।’
এই দরিদ্র মহিলার আকুতিতে এই প্রতিবেদক দুপুর সাড়ে ১২ টায় ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্সুরেন্স অফিসে গিয়ে অফিসের প্রধান গেটে তালা দেখতে পান।

 

 

 

 

 


কিছুক্ষণ ওখানে দাঁড়ালে আরেক মহিলা (নাম জানাতে অপরাগতা জানালেন) কে আসতে দেখা যায়। তিনি বললেন, আমি কিস্তি জমা দিতে এবং আমার বোনাস নিতে এসেছি। অফিস তালা দেখে ‘ভ্রম্ন কুঁচকে গেল’ ওই নারীরও। গেটে দাঁড়ানো অপর দুই মহিলাকে বললেন, এরা কোথায়, এরা তথ্য দিতে না পারায় তিনি অফিসের সহকারী আঞ্চলিক ব্যবস্থাপক মেহেদী হাসানকে ফোন দেন। মেহেদী হাসান তাকে বলে দেন আরেকজনকে ফোন দিতে, সেই অনুযায়ী ওই নারী আরেকজনকে ফোন দেন’। তিন—চার মিনিটের মাথায় অফিস সহকারী আতিকুর আসেন অফিসে।
আতিকুল বলেন, আমরা অফিস পরিচালনা ও কিস্তির টাকা সংগ্রহের দায়িত্বে আছি। গ্রাহকদের টাকা পরিশোধ করার দায়িত্ব আমাদের নয়, হেড অফিসের। হেড অফিস যদি দুই—তিন দিনের মধ্যে টাকা পরিশোধ করতে পারে, তাহলে আমাদের কোনো সমস্যা নেই। গ্রাহকদের টাকা দেওয়ার বিষয়ে আমাদের কোনো ক্ষমতা নেই। আমরাও হেড অফিসে বারবার যোগাযোগ করে গ্রাহকদের টাকা দেওয়ার জন্য অনুরোধ করছি। কিন্তু টাকা দেওয়ার বিষয়টি তারা সিরিয়াল অনুযায়ী করছে। কেউ কেউ ইন্সুরেন্সের মেয়াদ পূর্ণ হবার এক বছর পর, আবার কেউ দুই থেকে আড়াই বছর পর টাকা পাচ্ছেন। এভাবে সিরিয়াল অনুযায়ী টাকা দেওয়া হচ্ছে।

 


গ্রাহকরা যদি টাকা জমা দেওয়ার জন্য আসেন, আমরা তাদের টাকা নিতে অস্বীকার করতে পারি না। কারণ টাকা না নিলে আমাদের চাকরি নিয়ে সমস্যা হতে পারে। আবার টাকা নেওয়ার পর গ্রাহকদের পাওনা পরিশোধ করার ক্ষমতাও আমাদের হাতে নেই। অফিসে বর্তমানে তিনজন কর্মী আছেন। এরমধ্যে একজন ছুটিতে থাকায় বর্তমানে দুজন দায়িত্ব পালন করছেন। আমি অফিস সহকারী হিসেবে এবং আরেকজন ক্যাশিয়ার হিসেবে টাকা রাখছেন।

 


বিশ^ম্ভরপুরের দরিদ্র মহিলাদের নিয়ে আসেন এলাকার সমাজ কর্মী মোহাম্মদ তারেক। তিনি বলেন, ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্সু্যরেন্স কোম্পানি লিমিটেডে আমার মহল্লার ৪০ জন সদস্য আছেন, ৪০ জন সদস্যের কাছ থেকে তারা টাকা এনেছে, ২৪ কিস্তি দেওয়ার পর  তারা টাকা উঠাতে পারবে শুরুতে বলা হয়েছিল, পরে আবার ১০ বছর যদি তারা কিস্তি চালিয়ে রাখে, ১০ বছর পরেই টাকা তারা ওঠাতে পারবে বলে জানানো হয়। এখন দশ বছর পরেও ঘুরতে ঘুরতে টাকা পাচ্ছে না। এখানে ইনচার্জ আছে মেহেদি হাসান নামের এক লোক। তারে কল দিলে ধরে না, অফিসেও আসে না, আজকে দিতেছি— কালকে দিতেছি বলে দেড় বছর হয় ঘুরাচ্ছে। রবিবার অফিস এসে দায়িত্বপ্রাপ্ত কাউকে পাই নি। যে দুজনকে পেয়েছি, তারা জানালো, চাকুরি ছেড়ে তারাও চলে যাবে। দরিদ্র মানুষদের টাকা পাবার ব্যবস্থা যেন করে দেয় সরকারের সংশ্লিষ্ট কতৃর্পক্ষের কাছে এই দাবি আমাদের।

 


ফারইস্ট লাইফ ইন্সুরেন্সের সুনামগঞ্জের ইনচার্জ অফিসের সহকারী আঞ্চলিক ব্যবস্থাপক (এজিএম) মেহেদি হাসান বললেন, গ্রাহকদের টাকা একটি নির্দিষ্ট সিরিয়াল অনুযায়ী দেওয়া হচ্ছে। আগে যারা টাকা জমা দিয়েছেন, তাদের আগে দেওয়া হচ্ছে। এরপর পর্যায়ক্রমে অন্যরা টাকা পাচ্ছেন। সবাইকে টাকা দেওয়ার মতো সক্ষমতা বর্তমানে কোম্পানির নেই। ফ্যাসিবাদী সরকারের সময়ে যে লুটপাট হয়েছে, তার প্রভাব আমাদের কোম্পানির ওপরও পড়েছে। আমরা হেড অফিসে বারবার গ্রাহকদের টাকা পরিশোধের জন্য চেষ্টা করছি। আমরা চাকরি করি, আমাদের সব ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা নেই। আমাদের বলা হয়েছে, গ্রাহকদের আরও কিছুদিন ধৈয্যর্ ধরতে বলতে। ডিসেম্বরের মধ্যে কোম্পানির জায়গা—জমি বিক্রি করে গ্রাহকদের টাকা পরিশোধের ব্যবস্থা করার চেষ্টা করা হবে। অফিসে মোট গ্রাহক ১২ থেকে ১৪শ’ জনের মতো হবে। এরমধ্যে প্রায় পাঁচ—ছয়শ গ্রাহকের টাকা দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে আটকে আছে। তারা টাকা পাওয়ার জন্য নিয়মিত যোগাযোগ করছেন। আমরা তাদের পক্ষ থেকে হেড অফিসে বারবার কথা বলছি। গ্রাহকদের পক্ষে কথা বলতে গিয়ে অনেক সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়েছে। এমনকি তিনজন ইনচার্জ ইতোমধ্যে চাকরি হারিয়েছেন। হেড অফিসে গ্রাহকদের টাকা দেওয়ার বিষয়ে বেশি কথা বললে আমাদের উল্টো প্রশ্ন করা হয়, ‘আমরা ঘুষ খেয়েছি কি না।’ গ্রাহকদের পক্ষে বেশি কথা বললে ধমক দেওয়া হয়। বলা হয়, এভাবে কথা বললে চাকরি করতে হবে না, চাকরি ছেড়ে দিতে হবে।

 


এই কর্মকর্তা জানালেন, তিনি নিয়মিত অফিসে যেতে পারেন না। প্রয়োজন হলে মাঝে মাঝে অফিসে যান। গ্রাহকদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দিতে পারছেন না জানিয়ে বললেন, 
গ্রাহকদের কত তারিখের মধ্যে টাকা দেব, সেই প্রতিশ্রম্নতি কীভাবে দেব? তারিখ দেওয়ার ক্ষমতাও আমার হাতে নেই। আমি—ই তিন বছর ধরে নিয়মিত বেতন পাচ্ছি না। এরমধ্যে দুই বছর পার হওয়ার পর কিছু টাকা পেয়েছিলাম। এরপর আরও প্রায় দুই বছর ধরে কোনো বেতন পাই নি। সুনামগঞ্জে মাঠপর্যায়ে প্রায় ৫০০ কর্মকর্তা—কর্মচারী রয়েছেন, যারা দীর্ঘদিন ধরে কোনো বেতন বা সুবিধা পাচ্ছেন না বলে জানান এই কর্মকর্তা।

 


অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মতিউর রহমান খান বললেন, যারা হয়রানির শিকার, তারা লিখিত দিলে সংশ্লিষ্টদের ডাকা হবে। প্রয়োজনে অর্থ মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠিয়ে অবস্থা জানানো হবে।

উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন


সম্পাদক মণ্ডলীর উপদেষ্টা : স্বপন কুমার দেব, কুমার সৌরভ

সম্পাদক ও প্রকাশক : পঙ্কজ কান্তি দে

অনলাইন সম্পাদক : মাহবুবুল হাছান শাহীন

সম্পাদক কর্তৃক অক্ষর মুদ্রণ অফসেট প্রেস, জোয়াহের রাজা ট্রেড সেন্টার, পুরাতন বাসস্টেশন, সুনামগঞ্জ।

মোবাইল : ০১৭১৮৩৪৫৯৭৫

বিজ্ঞাপন : ০১৩২৫৪৬২৪৯৫

ই-মেইল : [email protected]

সুনামগঞ্জের খবর পরিবার