প্রকাশিত: ০২ আগস্ট, ২০২৬ ১২:৪৯
সংগৃহীত ছবি
সিঁড়ি বেয়ে ওঠার সময় বা জোরে হাঁটার সময় অনেকেরই কষ্ট হয়। শ্বাস আটকে আসে, হাঁপ ধরে যায়। বয়স বাড়লে বা ওজন বাড়লে এমনটা হতে পারে। শরীরচর্চা না করলেও এই সমস্যা দেখা দেয়।
চিকিৎসকরা বলছেন, এসবের বেশিরভাগই সাধারণত ভয়ের কিছু নয়। তবে কিছু ক্ষেত্রে এটা চিন্তার বিষয় হতে পারে। যেমন, আগে যে কাজ সহজে করা যেত, এখন সেই একই কাজ করতে গিয়ে হঠাৎ শ্বাসকষ্ট শুরু হচ্ছে। অথবা সময়ের সাথে সাথে শ্বাসকষ্ট আরও বাড়ছে। এমন হলে শুধু বয়স বা ক্লান্তির দোষ দিয়ে ব্যাপারটা এড়িয়ে যাওয়া ঠিক নয়।
চিকিৎসকদের মতে, পরিশ্রমের সময় শ্বাসকষ্ট হৃদরোগ, ফুসফুসের রোগ, রক্তাল্পতা বা থাইরয়েডের সমস্যার লক্ষণ হতে পারে। নারী, বয়স্ক মানুষ এবং ডায়াবেটিস রোগীদের ক্ষেত্রে এটা হৃদরোগের প্রথম লক্ষণও হতে পারে। বুকে ব্যথা শুরু হওয়ার আগেই এই লক্ষণ দেখা দিতে পারে বলে জানান বিশেষজ্ঞরা।
যাদের ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, উচ্চ কোলেস্টেরল, স্থূলতা আছে বা যারা ধূমপান করেন, তাদের এই বিষয়ে বেশি সতর্ক থাকা দরকার। শ্বাসকষ্টের সাথে যদি বুকে চাপ লাগা, মাথা ঘোরা, হৃদস্পন্দন অনিয়মিত হওয়া, ঘাম হওয়া বা পা ফুলে যাওয়ার মতো সমস্যা থাকে, তাহলে দেরি না করে ডাক্তার দেখানো উচিত।
কী কারণে শ্বাসকষ্ট হচ্ছে, তা কীভাবে বোঝা যাবে
শুধু লক্ষণ দেখে বলা যায় না যে শ্বাসকষ্টের আসল কারণ কী। হৃদরোগ, ফুসফুসের রোগ, রক্তাল্পতা, থাইরয়েডের সমস্যা, স্থূলতা, কিডনির সমস্যা এমনকি মানসিক চাপ থেকেও এটা হতে পারে। তাই আসল কারণ জানতে রোগীর আগের স্বাস্থ্য ইতিহাস জানা এবং কিছু পরীক্ষা করা দরকার।
শুরুতে রক্তচাপ মাপা, ইসিজি, বুকের এক্স-রে এবং রক্ত পরীক্ষা করা হয়। এর মধ্যে থাকে হিমোগ্লোবিন, ব্লাড সুগার, থাইরয়েড এবং কিডনি-লিভারের পরীক্ষা। হার্টের সমস্যা সন্দেহ হলে ইকোকার্ডিওগ্রাফি, ট্রেডমিল স্ট্রেস টেস্ট বা সিটি করোনারি অ্যাঞ্জিওগ্রাফির মতো পরীক্ষাও করা লাগতে পারে। কখনো কখনো ফুসফুসের কাজ কেমন চলছে, তা দেখার জন্যও আলাদা পরীক্ষা লাগে।
ইকোকার্ডিওগ্রাফিতে শব্দ তরঙ্গ দিয়ে হার্টের গঠন ও ভাল্ভ পরীক্ষা করা হয়। ট্রেডমিল টেস্টে হাঁটার সময় হার্টের অবস্থা দেখা হয়। আর করোনারি অ্যাঞ্জিওগ্রামে দেখা হয়, হার্টে রক্ত নিয়ে যাওয়া ধমনীতে কোনো বাধা আছে কি না।
চিকিৎসকরা বলছেন, হঠাৎ শ্বাসকষ্ট বেড়ে যাওয়া বা বিশ্রামের পরও শ্বাসকষ্ট না কমা, এসব গুরুতর লক্ষণ। এমন হলে সাথে সাথে সতর্ক হওয়া উচিত। রোগ যত দ্রুত ধরা পড়বে, চিকিৎসা তত তাড়াতাড়ি শুরু করা যাবে। এতে হৃদরোগ বা হার্ট ফেলিওরের মতো বড় সমস্যা এড়ানো সম্ভব হয়।
রোগ খুঁজে বের করা কেন জরুরি
শ্বাসকষ্ট হলে তা অবহেলা করাও ঠিক নয়, আবার নিজে থেকে কারণ ধরে নেওয়াও ঠিক নয়। এক্ষেত্রে পরীক্ষা করানো জরুরি। মুম্বাইয়ের নিউবার্গ অজয় শাহ ল্যাবরেটরির ম্যানেজিং ডিরেক্টর ডা. অজয় শাহ বলেন, ‘যেকোনো রোগ নির্ধারণের সময় আমরা প্রথমে রোগীর বিশদ মেডিকেল হিস্ট্রি খতিয়ে দেখি। শ্বাসকষ্টের ধরন, কতক্ষণ তা স্থায়ী হচ্ছে এবং কতটা গুরুতর, সব দেখা হয়। এছাড়া বুকে ব্যথা, বুক ধড়ফড়, কাশি, শ্বাসের সময় শিসের মতো শব্দ, দুর্বলতা এবং পা ফোলার মতো লক্ষণও পরীক্ষা করি। রোগীর জীবনযাত্রা ও অভ্যাসও বিবেচনা করা হয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘মেডিকেল টেস্ট সমস্যার কারণ ধরতে গুরুত্বপূর্ণ সূত্র দেয়। আমাদের কাজ হলো, ডাক্তাররা যেন সঠিক রোগ ধরতে পারেন, সেজন্য দরকারি পরীক্ষার পরামর্শ দেওয়া।’
কোন পরীক্ষা প্রথমে করা দরকার, তা জানতে চাইলে ডা. শাহ বলেন, ‘সিবিসি রক্ত পরীক্ষা জরুরি, কারণ এতে রক্তাল্পতা বা সংক্রমণের মতো কারণ ধরা পড়ে। এছাড়া ব্লাড সুগার, লিভার, কিডনি, থাইরয়েড এবং প্রদাহের পরীক্ষাও করা যায়। হৃদরোগের সন্দেহ হলে কার্ডিয়াক বায়োমার্কার পরীক্ষার কথাও বলা হয়।’ এছাড়া তিনি জানান, ‘ফুসফুস বা হার্টের সমস্যা বুঝতে বুকের এক্স-রে করা হয়। আর ইসিজি দিয়ে বোঝা যায়, হৃদস্পন্দন স্বাভাবিক আছে কি না।’
দ্রুত রোগ ধরা কেন দরকার
হাঁটার সময় হাঁপিয়ে গেলে বা হঠাৎ ক্লান্ত লাগলে দেরি না করে ডাক্তার দেখানো উচিত। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শ্বাসকষ্ট বড় কোনো সমস্যার ইঙ্গিত হতে পারে। তাই সময় থাকতে রোগ ধরা জরুরি, নয়তো সমস্যা বাড়তে পারে।
সময়মতো রোগ ধরা পড়লে হার্ট ফেলিওর, হার্টের ধমনীর রোগ, দীর্ঘস্থায়ী ফুসফুসের রোগ, রক্তনালীতে রক্ত জমাট বাঁধা এবং রক্তাল্পতার মতো সমস্যার চিকিৎসা সহজ হয়। এতে ভবিষ্যতে বড় জটিলতা, বারবার হাসপাতালে ভর্তি হওয়া এবং গুরুতর স্বাস্থ্য সমস্যা এড়ানো যায়। রোগীর জীবনযাত্রার মানও ভালো হয়।
কিন্তু অনেকেই শ্বাসকষ্টকে গুরুত্ব দেন না। বয়স বা ফিটনেস কম থাকাকে দোষ দিয়ে বিষয়টা এড়িয়ে যান। এতে রোগ ধরতে দেরি হয়।
হৃদরোগের ঝুঁকি
সামান্য পরিশ্রমেই বা রোজকার কাজে যদি শ্বাসকষ্ট হয় এবং তা বাড়তে থাকে, বিশ্রামের পরও না কমে, বা সাথে বুকে চাপ, ব্যথা, মাথা ঘোরা বা ঘামের মতো লক্ষণ থাকে, তাহলে দেরি না করে হৃদরোগ বিশেষজ্ঞের কাছে যাওয়া উচিত।
পুণের বানেরের মণিপাল হাসপাতালের কার্ডিওলজি বিভাগের প্রধান ডা. অভিজিৎ যোশী বলেন, ‘অনেক রোগীর ক্ষেত্রে, বিশেষত নারী, বয়স্ক মানুষ এবং ডায়াবেটিস রোগীদের ক্ষেত্রে, বুকে ব্যথার আগেই শ্বাসকষ্ট হৃদরোগের প্রথম লক্ষণ হতে পারে। তাই এটা অবহেলা করা উচিত নয়।’
সব হৃদরোগেই বুকে ব্যথা হয়, এমন নয় বলে জানান তিনি। তার ভাষায়, ‘কিছু রোগীর ক্ষেত্রে শ্বাসকষ্ট, ক্লান্তি, হৃদস্পন্দন বেড়ে যাওয়া, মাথা ঘোরা বা দুর্বলতাই প্রধান লক্ষণ হতে পারে। ডায়াবেটিস রোগীদের ক্ষেত্রে কোনো লক্ষণ ছাড়াই হৃদরোগ হওয়ার ঝুঁকি বেশি থাকে।’
হৃৎপিণ্ডের রক্ত পাম্প করার ক্ষমতা কমে গেলে কী হয়, জানতে চাইলে ডা. যোশী বলেন, ‘হার্টের পাম্প করার ক্ষমতা কমলে শরীরের অঙ্গগুলো পর্যাপ্ত রক্ত ও অক্সিজেন পায় না। এতে ক্লান্তি, শ্বাসকষ্ট, পা ফোলা এবং ফুসফুসে পানি জমার ঝুঁকি বাড়ে। রোজকার কাজ করতেও শ্বাসকষ্ট হতে পারে।’
তিনি আরও বলেন, ‘শ্বাসকষ্টের সাথে বুকে ব্যথা বা চাপ, জ্ঞান হারানো, মাথা ঘোরা, হৃদস্পন্দন বেড়ে যাওয়া, ঠোঁট নীল হয়ে যাওয়া, পা ফোলা, রক্ত বমি বা বিশ্রামের পরও শ্বাসকষ্ট থাকলে দ্রুত ডাক্তার দেখানো জরুরি।’
বয়স বাড়লে শরীরের কার্যক্ষমতা কিছুটা কমে, এটাই স্বাভাবিক। পেশির শক্তি কমে, হার্ট আর ফুসফুসের কাজও কিছুটা কমে যায়। তাই আগের চেয়ে বেশি হাঁপ ধরা স্বাভাবিক হতে পারে। কিন্তু হঠাৎ বা দীর্ঘদিন ধরে শ্বাসকষ্ট চললে সেটাকে শুধু বয়সের দোষ দেওয়া ঠিক না। ডায়াবেটিস আর উচ্চ রক্তচাপ থাকা মানুষদের এই বিষয়ে আরও সতর্ক থাকা উচিত।
মুম্বাইয়ের গ্লেনেগলস হাসপাতালের হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. রাহুল গুপ্তা বলেন, ‘ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ আর উচ্চ কোলেস্টেরল হৃদরোগের প্রধান কারণ। এসব সমস্যা থাকা মানুষদের ক্ষেত্রে শ্বাসকষ্ট হৃদরোগের লক্ষণ হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।’
তিনি আরও বলেন, ‘আগে যে কাজ সহজে করা যেত, এখন সেই কাজ করতে কষ্ট হচ্ছে বা শ্বাসকষ্ট হচ্ছে, এমন মনে হলে ডাক্তার দেখানো উচিত। দ্রুত রোগ ধরা পড়লে এবং চিকিৎসা শুরু হলে হার্ট অ্যাটাক বা হার্ট ফেলিওরের মতো বড় সমস্যা এড়ানো সম্ভব।’
শরীর ভালো আছে কি না, তা বোঝার কোনো সহজ উপায় আছে কি না জানতে চাইলে ডা. গুপ্তা বলেন, ‘একটা সহজ উপায় হলো, কোনো ব্যক্তি চরম ক্লান্তি বা শ্বাসকষ্ট ছাড়াই রোজকার কাজ করতে পারছেন কি না। যেমন, কোনো সমস্যা ছাড়া এক বা দুই তলা সিঁড়ি ভাঙতে পারলে বা প্রায় আধঘণ্টা জোরে হাঁটতে পারলে, শরীর ভালো আছে বলে ধরা যায়।’
তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, ‘স্মার্টওয়াচ বা নিজে নিজে বোঝার চেষ্টা কখনো ডাক্তারি পরীক্ষার বিকল্প নয়। শ্বাসকষ্টের সমস্যা থাকলে বা বাড়তে থাকলে ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া খুবই জরুরি।’
তাই সময়মতো চিকিৎসা যেমন জীবন বাঁচাতে পারে, তেমনই দীর্ঘদিনের জন্য শরীর ভালো রাখতেও সাহায্য করতে পারে। জীবনযাত্রায় বড় কোনো পরিবর্তন আনতে চাইলে, খাবারে বদল আনতে চাইলে বা ব্যায়াম শুরু করতে চাইলে অবশ্যই ডাক্তার আর প্রশিক্ষকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। সবচেয়ে ভালো উপায় হলো, ডাক্তারের কাছে গিয়ে পুরো শরীর পরীক্ষা করানো এবং তার পরামর্শ অনুযায়ী চলা। ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া নিজে থেকে ওষুধ খাওয়া বিপজ্জনক হতে পারে।
সূত্র: যুগান্তর .কম
এমডি
বিশেষ সংখ্যা থেকে আরো পড়ুন