প্রকাশিত: ০২ আগস্ট, ২০২৬ ২৩:২৮
গ্রামের কাদামাটি মাখা ছোট্ট মাঠে ফুটবলের স্বপ্ন বুনেছিল দুই কিশোর। সেই স্বপ্ন আজ বাস্তব হয়েছে জাতীয় পর্যায়ে। দেশজুড়ে ক্রীড়া ক্ষেত্রে কিশোর—কিশোরীদের জন্য প্রতিভা অন্বেষণ কর্মসূচি ‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস ২০২৫—২৬’—এর ফুটবল (বালক) বিভাগে চ্যাম্পিয়ন দলের সদস্য হয়ে দিরাই উপজেলার দুই কিশোর ফুটবলার সাইফ আহমেদ রিহাম (১৫) ও হোসাইন আহমেদ জিহাদ (১৪) এখন পুরো উপজেলার গর্বে পরিণত হয়েছেন।
সম্প্রতি রাজধানীর বাংলাদেশ আর্মি স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত টুর্নামেন্টের ফাইনালে ময়মনসিংহ অঞ্চলকে ১—০ গোলে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয় সিলেট অঞ্চল। বিজয়ী দলের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য ছিলেন দিরাই পৌর শহরের চন্ডিপুর গ্রামের রাজ উদ্দিনের ছেলে সাইফ আহমেদ রিহাম এবং ভরারগাঁও গ্রামের ছুবা মিয়ার ছেলে হোসাইন আহমেদ জিহাদ।
এই অসাধারণ সাফল্যের স্বীকৃতিস্বরূপ রবিবার উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে দুই কৃতি ফুটবলারকে সংবর্ধনা দেওয়া হয়। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সনজীব সরকার উপজেলা পরিষদের পক্ষ থেকে তাদের প্রত্যেককে ১০ হাজার টাকা করে মোট ২০ হাজার টাকার সম্মাননা চেক এবং একটি করে ফুটবল তুলে দেন। এ সময় তিনি বলেন, গ্রামবাংলার প্রতিভাবান খেলোয়াড়দের যথাযথ পরিচর্যা করা গেলে তারা একদিন আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও দেশের মুখ উজ্জ্বল করবে।
জানা গেছে, সাইফ ও জিহাদ প্রথমে উপজেলা, পরে জেলা পর্যায়ে নিজেদের প্রতিভার স্বাক্ষর রেখে সিলেট বিভাগীয় দলে জায়গা করে নেন। ধারাবাহিক ভালো পারফরম্যান্সের মাধ্যমে তারা ফাইনাল পর্যন্ত পৌঁছে দলকে শিরোপা জয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন।
স্থানীয়দের মতে, দুই কিশোরের এই সাফল্যের পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের কঠোর অনুশীলন, অদম্য পরিশ্রম এবং দিরাই ফুটবল একাডেমির নিয়মিত প্রশিক্ষণ। প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে উঠে এসে জাতীয় পর্যায়ে সাফল্য অর্জন করায় তাদের পরিবার, শিক্ষক, কোচ এবং এলাকাবাসী গর্বিত।
পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, দিরাই বাজারের সবজি ব্যবসায়ী রাজ উদ্দিনের দুই ছেলে ও দুই মেয়ের মধ্যে দ্বিতীয় সন্তান সাইফ আহমেদ রিহাম। ছোটবেলা থেকেই গ্রামের মাঠে বড় ভাই ও বন্ধুদের সঙ্গে ফুটবল খেলতেন তিনি। পরে গ্রামেরই ক্রীড়াপ্রেমী জায়েদ হোসেনের সহযোগিতায় জেলা দলের সঙ্গে খেলার সুযোগ পান। সেখান থেকেই শুরু হয় তার এগিয়ে যাওয়ার পথ। পরে ‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস’—এ নির্বাচিত হয়ে সিলেট বিভাগের হয়ে খেলার সুযোগ পান। বর্তমানে তিনি দিরাই হাজী মাহমদ মিয়া ইসলামিয়া আলীম মাদ্রাসার নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী এবং দিরাই ফুটবল একাডেমির প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত খেলোয়াড়।
অন্যদিকে ভরারগাঁও গ্রামের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ছুবা মিয়া ও রেবা বেগম দম্পতির তিন ছেলে ও এক মেয়ের মধ্যে সবচেয়ে ছোট হোসাইন আহমেদ জিহাদ। ৭ম শ্রেণিতে পড়ুয়া জিহাদ ছোটবেলা থেকেই ফুটবলের প্রতি তার প্রবল আগ্রহ দেখে পরিবার তাকে খেলাধুলায় উৎসাহ দেয়। একইভাবে দিরাই ফুটবল একাডেমির প্রশিক্ষণ নিয়ে তিনি সিলেট বিভাগের হয়ে খেলে চ্যাম্পিয়ন দলের সদস্য হওয়ার গৌরব অর্জন করেন।
জিহাদের বাবা ছুবা মিয়া বলেন, আমরা গ্রামের সাধারণ মানুষ। ছেলের খেলাধুলার প্রতি আগ্রহ দেখে কখনো বাধা দেইনি। আজ সে দেশের জন্য সম্মান বয়ে এনেছে, এতে আমরা খুব আনন্দিত। আমি চাই, একদিন সে জাতীয় দলে খেলুক। এজন্য সবার দোয়া ও সহযোগিতা কামনা করছি।
প্রধানমন্ত্রীর হাত থেকে পুরস্কার গ্রহণের অনুভূতি জানাতে গিয়ে সাইফ ও জিহাদ বলেন, এত অল্প বয়সে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর হাত থেকে পুরস্কার গ্রহণ করা আমাদের জীবনের অন্যতম সেরা মুহূর্ত। তিনি আমাদের বলেছেন—ভালো খেলেছ, সামনে আরও ভালো খেলবে। আশা করি একদিন জাতীয় দলে সুযোগ পাবে। তাঁর এই উৎসাহ আমাদের আরও অনুপ্রাণিত করেছে।
দুই কিশোর ফুটবলারের স্বপ্ন, একদিন বাংলাদেশ জাতীয় ফুটবল দলের জার্সি গায়ে মাঠে নেমে দেশের জন্য আরও বড় সাফল্য বয়ে আনা। তাদের এই অর্জন শুধু দিরাই নয়, পুরো সুনামগঞ্জের ক্রীড়াঙ্গনের জন্যও একটি অনুপ্রেরণার গল্প হয়ে থাকবে।
উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন