নিত্যদিনের দুর্ভোগ যানজট

প্রকাশিত: ০২ আগস্ট, ২০২৬ ২২:০৮

‘আমার বাবাকে নিয়ে সিলেটে ডাক্তার দেখাতে যাচ্ছি। কিন্তু এই যানজট যেন শেষই হচ্ছে না। মনে হচ্ছে ঢাকা শহরের মতো যানজট। বাবার অসুস্থতা নিয়ে এমনিতেই দুশ্চিন্তায় আছি, তার ওপর রাস্তায় এভাবে আটকে থাকতে হচ্ছে।’ কথাগুলো বলতে বলতে কান্নায় ভেঙে পড়েন রাজীব। যানজটে আটকে থাকা অবস্থায় আশপাশের মানুষ ও যানবাহন চালকদের সহযোগিতায় কোনোভাবে পথ চলার চেষ্টা করছিলেন তিনি।

 


সুনামগঞ্জ শহরে যানজট এখন যেন নিত্যদিনের দুর্ভোগে পরিণত হয়েছে। দিনের বিভিন্ন সময়ে শহরের গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোতে দীর্ঘ যানজট সৃষ্টি হচ্ছে। এতে রোগী, শিক্ষার্থী, চাকরিজীবী, ব্যবসায়ী, পথচারী ও গণপরিবহনের যাত্রীদের ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে। বিশেষ করে আলফাত স্কয়ার থেকে ওয়েজখালী চৌরাস্তা পর্যন্ত সড়কের উন্নয়নকাজ চলমান থাকায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে।


রবিবার দুপুর ১২ টায় সরেজমিনে দেখা যায়, আলফাত স্কয়ার, কালীবাড়ি মোড়, পুরাতন বাসস্টেশন, কোর্ট পয়েন্ট, মল্লিকপুর ও ওয়েজখালীসহ শহরের বিভিন্ন সড়কে যানজট সৃষ্টি হয়েছে। কোথাওবা যানবাহনের দীর্ঘ সারি দেখা যায়। আবার কোথাও অল্প জায়গার মধ্যে মুখোমুখি অবস্থানে পড়ে যানবাহন চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে যায়।


সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়তে দেখা যায় রোগী ও তাদের স্বজনদের। অ্যাম্বুলেন্স, সিএনজি ও অটোরিকশায় করে রোগী নিয়ে শহর থেকে বের হতে গিয়ে অনেককে যানজটে আটকে থাকতে হচ্ছে। জরুরি প্রয়োজনে বের হওয়া মানুষও সময়মতো গন্তব্যে পৌঁছাতে পারছেন না।

 

 

 

 

 

 


সদর হাসপাতাল থেকে রোগী নিয়ে সিলেট যাচ্ছিলেন অ্যাম্বুলেন্সচালক জালাল উদ্দীন। তিনি বলেন, পুরাতন বাসস্টেশন এলাকায় প্রায় ১০ মিনিট একই জায়গায় আটকে ছিলাম। সামনে—পেছনে কোনো দিকেই যাওয়ার সুযোগ ছিল না। পরে ট্রাফিক পুলিশ ও আশপাশের যানবাহন চালকেরা সহযোগিতা করায় অ্যাম্বুলেন্সটি বের করতে পেরেছি।


স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুল লতিফ বলেন, স্কুল ও অফিস ছুটির সময় যানজটের মাত্রা আরও বেড়ে যায়। সড়কের উন্নয়নকাজের পাশাপাশি অপরিকল্পিতভাবে যানবাহন থামানো, ফুটপাত দখল এবং অতিরিক্ত অটোরিকশা চলাচলের কারণে পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠেছে।

 


অটোরিকশাচালক বিল্লাল মিয়া বলেন, যানজটের কারণে যাত্রী নিয়ে চলাচলে অনেক সময় লাগছে। শহরের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে একবার যানজট সৃষ্টি হলে তা দ্রুত আশপাশের সড়কেও ছড়িয়ে পড়ে। এতে চালক, যাত্রী ও পথচারী সবাইকে দুর্ভোগ পোহাতে হয়।


পথচারী সুরঞ্জন বলেন, যানজটের জন্য গাড়ি ছেড়ে পায়ে হেঁটে যাচ্ছি। এই রাস্তায় বের হলে কখন কোথায় আটকে যেতে হবে, তা বলা যায় না। অল্প দূরত্বের পথ যেতে অনেক সময় লাগছে। বিশেষ করে অসুস্থ রোগী, শিশু ও বয়স্ক মানুষদের নিয়ে চলাচল করা খুব কষ্টকর।

 


আরেক অটোরিকশাযাত্রী সমির বলেন, যানজটের মধ্যে দীর্ঘ সময় বসে থাকার কারণে শিশু ও বয়স্কদের আরও বেশি কষ্ট হচ্ছে।
গণমাধ্যম ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব জাহাঙ্গীর আলম বলেন, শহরে যানজটের অন্যতম কারণ হলো সরু সড়ক, লাইসেন্সবিহীন ও অতিরিক্ত যানবাহন চলাচল এবং ফুটপাত দখল হয়ে থাকা। শহরে হাতে গোনা কয়েকটি সড়কের ওপর অতিরিক্ত চাপ থাকায় যানজট সৃষ্টি হচ্ছে।


তিনি বলেন, যানজট নিরসনে ট্রাফিক ব্যবস্থাকে আরও আধুনিক ও কার্যকর করতে হবে। পাশাপাশি সড়ক সংস্কার ও প্রশস্তকরণ, ফুটপাত দখলমুক্ত করা এবং যেখানে—সেখানে যানবাহন থামিয়ে স্ট্যান্ড তৈরি বন্ধ করতে হবে।


তিনি বলেন, শহরে ফোরলেনের কাজ শুরু হলেও তা ধীরগতিতে চলছে। সড়ক ভেঙে রাখায় কাদা ও দুর্ভোগের সৃষ্টি হয়েছে, ফলে যান চলাচলও ব্যাহত হচ্ছে। ফোরলেনের কাজ দ্রুত শেষ করা না হলে শহরের যানজট আরও বাড়বে। তাই প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে দ্রুত কাজ শেষ করার উদ্যোগ নিতে হবে।

 


ট্রাফিক পুলিশের পরিদর্শক (প্রশাসন) মোহাম্মদ হানিফ মিয়া বলেন, যানজট নিরসনে পুলিশ সুপারের কঠোর নির্দেশনা রয়েছে। কোথাও যানজট সৃষ্টি হলে বা কেউ যান চলাচলে বাধা সৃষ্টি করলে দ্রুত ট্রাফিক পুলিশকে জানাতে বলা হয়েছে। প্রয়োজনে উর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও সরেজমিনে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করবেন।
তিনি বলেন, সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের চলমান কাজের কারণে শহরের বিভিন্ন স্থানে সাময়িকভাবে যানজট সৃষ্টি হচ্ছে। রাস্তার অর্ধেক অংশ বন্ধ রেখে কাজ করায় বাকি অংশ দিয়ে উভয়মুখী যানবাহন চলাচল করতে গিয়ে চাপ তৈরি হচ্ছে।

 

 

মোহাম্মদ হানিফ মিয়া বলেন, সড়ক ও জনপথের কাজের সঙ্গে ট্রাফিক পুলিশের সমন্বয়ের ঘাটতিও রয়েছে। কোনো সড়ক বন্ধ করে কাজ করতে হলে আগে ট্রাফিক পুলিশকে জানাতে বলা হয়েছে। তাহলে প্রয়োজন অনুযায়ী অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করে যান চলাচল স্বাভাবিক রাখা সম্ভব হবে।


তিনি জানান, আজ (রবিবার) বিকালে নতুন বাসস্ট্যান্ড এলাকায় সড়ক ও জনপথের কাজের কারণে যানজট সৃষ্টি হয়েছিল। ট্রাফিক পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে কাজ বন্ধ রেখে সড়কটি যান চলাচলের উপযোগী করার ব্যবস্থা নেয়। পরে যানজট নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়।


তিনি আরও বলেন, সড়ক ও জনপথের কাজের কারণে হঠাৎ হঠাৎ বিভিন্ন স্থানে কৃত্রিম যানজট তৈরি হচ্ছে। তবে ট্রাফিক পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে মাঠে কাজ করছে। জরুরি যানবাহন, বিশেষ করে অ্যাম্বুলেন্স চলাচল নির্বিঘ্ন রাখতে ট্রাফিক সদস্যদের বিশেষভাবে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

 


সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের উপ—বিভাগীয় প্রকৌশলী মো. সাজেদুর রহমান বলেন, বৃষ্টিপাতের কারণে চলমান কাজে কিছুটা বিঘ্ন ঘটছে। ফোরলেনের কাজ বর্তমানে চলমান রয়েছে। সিলেট অভিমুখী দুই লেনের কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। যানবাহন চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করতে নির্ধারিত কিউরিং পিরিয়ড (পরিচর্যা কাল) শেষ হতে হবে। এই সময়সীমা প্রায় ২৮ দিন। কিউরিং পিরিয়ড শেষ হলে দুই লেন যান চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হবে।

 


তিনি বলেন, দুই লেন চালু হলে সড়কের পাশে থাকা ভ্রাম্যমাণ দোকানসহ বিভিন্ন অস্থায়ী স্থাপনা সরিয়ে দেওয়া হবে। বাকি দুই লেনের কাজও দ্রুত শেষ করার চেষ্টা চলছে। বর্তমানে কিউরিং পিরিয়ডের কারণে দুই লেন উন্মুক্ত করা সম্ভব হচ্ছে না। এতে সাময়িকভাবে জনভোগান্তি হচ্ছে।


ওয়েজখালী এলাকার বিষয়ে তিনি বলেন, এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বাজার। বর্তমানে যানবাহন চলাচলের দুই লেনের মধ্যে একটি লেন অটোরিকশা ও সিএনজিচালিত অটোরিকশা স্ট্যান্ড হিসেবে ব্যবহার করায় যান চলাচলে সমস্যা হচ্ছে। নতুন বাসস্ট্যান্ড থেকে ওয়েজখালী পর্যন্ত সড়কের বিভিন্ন অংশেও কিছু যানবাহন রাস্তার ওপর পার্কিং করে রাখা হচ্ছে। বিষয়গুলো জেলা পর্যায়ের সংশ্লিষ্ট কমিটির কাছে উপস্থাপন করা হবে এবং কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সাজেদুর রহমান বলেন, ফোরলেন প্রকল্পের কাজের অগ্রগতি বর্তমানে ৬৫ শতাংশের বেশি। কাজ দ্রুত শেষ করার চেষ্টা চলছে। শহর অংশের কাজও দ্রুত শেষ করে জনভোগান্তি কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন


সম্পাদক মণ্ডলীর উপদেষ্টা : স্বপন কুমার দেব, কুমার সৌরভ

সম্পাদক ও প্রকাশক : পঙ্কজ কান্তি দে

অনলাইন সম্পাদক : মাহবুবুল হাছান শাহীন

সম্পাদক কর্তৃক অক্ষর মুদ্রণ অফসেট প্রেস, জোয়াহের রাজা ট্রেড সেন্টার, পুরাতন বাসস্টেশন, সুনামগঞ্জ।

মোবাইল : ০১৭১৮৩৪৫৯৭৫

বিজ্ঞাপন : ০১৩২৫৪৬২৪৯৫

ই-মেইল : [email protected]

সুনামগঞ্জের খবর পরিবার