প্রকাশিত: ১১ আগস্ট, ২০২৬ ২২:৩৩
এসএসসিতে জিপিএ ৪.৮৯
নবম শ্রেণিতে পড়ার সময় বাসার ছাদে খেলতে গিয়ে বিদ্যুতের তারে স্পৃষ্ট হয়ে তিনতলা থেকে নিচে পড়ে যায় মুহতাসিম ইশরাক অর্ণব। দীর্ঘদিন চিকিৎসার পর সুস্থ হয়ে উঠলেও দুর্ঘটনায় তাকে হারাতে হয় ডান হাত। তবে শারীরিক এই প্রতিবন্ধকতা তাকে পড়াশোনা থেকে ছিটকে দিতে পারে নি। মাত্র এক বছরেরও কম সময়ে এসএসসির পূর্ণাঙ্গ প্রস্তুতি নেওয়ার পাশাপাশি বাম হাতে লেখার কৌশলও রপ্ত করে অর্ণব। কঠিন পরিস্থিতিকে জয় করে এবার এসএসসি পরীক্ষায় সফলতার সঙ্গে উত্তীর্ণ হয়েছে সে।
মুহতাসিম ইশরাক অর্ণব জামালগঞ্জ উপজেলার জামালগঞ্জ সরকারি মডেল উচ্চ বিদ্যালয়ের বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী। এবারের এসএসসি পরীক্ষায় সে জিপিএ ৪.৮৯ অর্জন করেছে। তার এই ফলাফলে পরিবার, শিক্ষক ও স্বজনরা উল্লাসিত।
পরিবার সূত্রে জানা যায়, নবম শ্রেণিতে পড়ার সময় একদিন বাসার ছাদে খেলছিল অর্ণব। অসাবধানতাবশত: বিদ্যুতের তারে স্পৃষ্ট হয়ে ছাদ থেকে নিচে পড়ে যায় সে। তিনতলা থেকে পড়ে গুরুতর আহত অর্ণবকে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা করানো হয়। দীর্ঘ চিকিৎসার পর প্রাণে বেঁচে ফিরলেও তার ডান হাতটি আর রক্ষা করা সম্ভব হয় নি। একপর্যায়ে চিকিৎসকদের পরামর্শে কেটে ফেলতে হয় তার ডান হাত।
দুর্ঘটনার পর স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসা অর্ণবের জন্য সহজ ছিল না। বিশেষ করে লেখাপড়া চালিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায় হাত হারানোর বিষয়টি। কিন্তু অর্ণব হাল ছাড়ে নি। নিজের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে আবারও পড়াশোনায় মনোযোগী হয়। মাত্র এক বছরেরও কম সময়ে বাম হাতে লেখার অভ্যাস গড়ে তোলে সে। পাশাপাশি এসএসসি পরীক্ষার প্রস্তুতিও চালিয়ে যায়।
অর্ণবের এই পথচলায় সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল তার পরিবার। দুর্ঘটনার পর শারীরিক ও মানসিকভাবে কঠিন সময় পার করলেও বাবা—মা তাকে সাহস জুগিয়েছেন। পড়াশোনা চালিয়ে যেতে সব ধরনের সহযোগিতা করেছেন তারা। পরিবারের অনুপ্রেরণা ও নিজের অদম্য চেষ্টা অর্ণবকে আবারও স্বাভাবিক ছন্দে ফিরতে সহায়তা করে।
অর্ণবের এসএসসি ফল প্রকাশের পর উচ্ছ্সিত বাবা জহিরুল ইসলাম ও মা কাকলী বেগম। ছেলের এমন সাফল্যে তারা আনন্দিত ও গর্বিত। তাদের প্রত্যাশা, ভবিষ্যতেও অর্ণব তার স্বপ্ন পূরণে এগিয়ে যাবে এবং জীবনের প্রতিকূলতাকে জয় করে আরও ভালো ফলাফল অর্জন করবে।
অর্ণবের বাবা জহিরুল ইসলাম বলেন, অর্ণবের এই সাফল্য শুধু একটি পরীক্ষার ফল নয়, বরং প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে তার দৃঢ় লড়াইয়ের প্রতিফলন। শারীরিক সীমাবদ্ধতা যে মানুষের স্বপ্নপূরণ ও এগিয়ে যাওয়ার পথে বাধা হতে পারে না, অর্ণব তা প্রমাণ করেছে। দুর্ঘটনায় একটি হাত হারানোর পরও সে নতুন করে বাম হাতে লেখার কৌশল রপ্ত করে পড়াশোনা চালিয়ে গেছে। শেষ পর্যন্ত বিজ্ঞান বিভাগ থেকে জিপিএ ৪.৮৯ অর্জন করে সে আমাদের গর্বিত করেছে।
জামালগঞ্জ সরকারি মডেল উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. লুৎফর রহমান বলেন, অর্ণবের অধ্যবসায়, পরিশ্রম ও মানসিক দৃঢ়তার পাশাপাশি বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সহযোগিতায় সে ভালো ফলাফল অর্জন করেছে। অর্ণব খুবই ন¤্র ও ভদ্র স্বভাবের ছেলে। দুর্ঘটনায় তাকে একটি হাত হারাতে হয়েছে। তা না হলে হয়তো সে জিপিএ—৫ অর্জন করতে পারত। ডান হাত হারানোর পর বাম হাতে লিখতে অভ্যস্ত হওয়ায় তার লেখার গতি কিছুটা ধীর হয়ে গেছে। এরপরও সব প্রতিকূলতা জয় করে অর্ণব যে সাফল্য অর্জন করেছে, তাতে আমরা গর্বিত। তার ভবিষ্যৎ জীবনের উত্তরোত্তর সাফল্য কামনা করি।
উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন