কেউ কিনছে না কালো ধান

প্রকাশিত: ১৬ আগস্ট, ২০২৬ ২৩:২২

জগন্নাথপুর উপজেলার কৃষকরা মহাসংকটে পড়েছেন। নায্যদাম না পেয়ে ধান বিক্রি করতে না পেরে হতাশায় ভুগছেন। একদিকে জলাবদ্ধতায় পানির নীচ থেকে যুদ্ধ করে উত্তোলনকৃত ধানের রং কালো বর্ণ হওয়ায় এসব ধান বিক্রি করতে পারছেন না। আবার যেসব ধান জলাবদ্ধতার আগে তুলতে পেরেছেন সেগুলোরও নায্য দাম মিলছে না। 

 


কৃষকরা এসব ধান বিক্রি করেই সারাবছরের আনুষঙ্গিক ব্যয় নির্বাহ করেন। ছেলে মেয়েদের পড়ালেখার খরচ, বিয়ে—সাদি, ঘর—দরজা মেরামত এমনকি চাষাবাদের ব্যয় মিটিয়ে আগামী মৌসুমের বোরো আবাদের ব্যয় নির্বাহ— এসব কাজ বোরোধান উত্তোলনের পর ধান বিক্রি করে মিটিয়ে থাকেন কৃষকেরা। এবার জলাবদ্ধতায় অনেক কৃষকের পাকা ফসল তলিয়ে গেছে। কেউ কেউ যুদ্ধ করে পানির নীচ থেকে নৌকা দিয়ে ডুবিয়ে কিছু ধান তুলেন। এসব ধান শুকানোর পর কালোরং ধারণ করেছে ফলে কৃষকরা এসব ধান বিক্রি করতে পারছেন না। স্থানীয় ধান ব্যবসায়ীর পাশাপাশি খাদ্য গুদাম কতৃপক্ষ কেউ এসব ধান কিনছে না। 

 


কৃষকরা জানান, জগন্নাথপুর উপজেলার কৃষকরা বোরো ফসলের ওপর নির্ভরশীল। এবার বোরো ফসল উত্তোলনের শুরুতে অব্যাহত বৃষ্টিতে জলাবদ্ধতায় হাওরের ফসল তলিয়ে যায়। কেউ কেউ কিছুটা উত্তোলন করতে পারলেও অধিকাংশ কৃষক ফসল উত্তোলন করতে পারেন নি। বর্গাচাষিসহ ক্ষুদ্র কিছু সংখ্যক কৃষক পানিতে তলিয়ে যাওয়া ধান প্রাণপণ চেষ্টা করে তুলেন। কিন্তু বাজারে এসব ধান বিক্রি করতে পারছেন না। এমনকি সরকারি খাদ্য গুদামে এসব ধান বিক্রি করতে পারেননি। এরমধ্যে ৯ আগস্ট থেকে হঠাৎ করে ধান কেনা বন্ধ করে দেয় সরকার। ফলে ধান কেনার লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হয়নি। 
সরকারি ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা প্রণয়নের মাধ্যমে তিন মাসের আর্থিক সহায়তা ও চাল প্রদানের কর্মসূচি গ্রহণ করা হলেও জগন্নাথপুর উপজেলায় প্রকৃত কৃষকরা এতে বঞ্চিত হয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। বিশেষ করে জগন্নাথপুর পৌরসভা সহ বিভিন্ন  ইউনিয়নে এ তালিকা নিয়ে ক্ষোভের অন্ত নেই। সংশ্লিষ্ট দপ্তরে এ বিষয়ে লিখিত অভিযোগ জমা রয়েছে। 

 


উপজেলার মেঘারকান্দি গ্রামের কৃষক দ্বিজেশ দাস জানান, বোরো মৌসুমে ১৫০ মণ ধান উত্তোলন করতে পেরেছেন। প্রতিমণ ধান আবাদ থেকে উত্তোলন পর্যন্ত এবার মন প্রতি কমপক্ষে ৮০০ টাকা ব্যয় হয়েছে। ধান ক্রয়ের কোন ক্রেতা নেই। বিশেষ অনুরোধ করে বিক্রি করতে চাইলে ভালো ধান ৭০০ টাকা মণ ও জলাবদ্ধতা থেকে উত্তোলনকৃত একটু কালো রংয়ের ধান সাড়ে চারশত টাকা মণ দাম করে। সরকারি খাদ্য গুদামে বিক্রি করা আমাদের জন্য তো স্বপ্ন। কোন দিন বিক্রি করতে পারি নাই, নানা অজুহাতে ফিরতে হয়। তিনি বলেন, আগামীতে বোরো আবাদ করতে পারব কীনা বুঝে উঠতে পারছি না। 
দাসনোওয়াগাঁও গ্রামের কৃষক সারদা চরম দাস জানান, এবার কৃষকরা জলাবদ্ধতায় ফসল হারিয়ে দিশেহারা।  সরকার তিন মাসের জন্য নগদ অর্থ ও চাল দিয়ে পাশে দাঁড়িয়েছে এটা যথার্থ নয়। আগামী বোরো মৌসুমের ফসল উত্তোলনের আগ পর্যন্ত এ সহায়তা চালিয়ে যাওয়া দরকার। তিনি বলেন, এক হাল বোরো আবাদ করে এক ছটাক ধান তুলতে পারেননি। আগামীতে কীভাবে বোরো আবাদ করব।
হাওর বাঁচাও আন্দোলন জগন্নাথপুর উপজেলা কমিটির সদস্য সচিব আমিনুল হক সিপন জানান, প্রকৃতির সঙ্গে যুদ্ধ করে ফসল ফলানোর পর যদি কৃষক ন্যায্য মূল্য না পান তাহলে চাষাবাদে আগ্রহ হারাবে। কৃষি উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও অর্থনীতি চাঙা রাখতে  কৃষকের পাশে দাঁড়িয়ে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। 

 


জগন্নাথপুর উপজেলা কৃষি কার্যালয় সূত্র জানায়, এবার ২০ হাজার ৪২৩ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ করা হয়। উৎপাদনের লক্ষ্য মাত্রা নির্ণয় করা হয় ১ লাখ ২৮ হাজার ৫০৯ মেট্রিক্স টন। উত্তোলন হয়েছে ১ লাখ ২৫ হাজার মেট্রিক্স টন। প্রাথমিকভাবে আট হাজার কৃষককে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক হিসেবে তালিকা বদ্ধ করা হলেও সর্বশেষ তিনহাজার ৬০৩ জন কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক হিসেবে সহায়তা পান।
কৃষি কর্মকর্তা কাওসার আহমেদ বলেন, কৃষকরা নানা সংকটে থাকলেও আমরা তাদেরকে নানা ধরনের সরকারি প্রণোদনা দিয়ে সহযোগিতা করছি। বোরো মৌসুমে লক্ষ্য মাত্রা অর্জন না হলেও আউশে লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করে ক্ষতি পোষানো হবে। 

 


জগন্নাথপুর উপজেলা ভারপ্রাপ্ত খাদ্য কর্মকর্তা এলএসডি শিবু ভূষন পাল জানান, জগন্নাথপুর উপজেলায় চলতি মৌসুমে ১৯৮২ মেট্রিক টন ধান ক্রয় করার কথা ছিল। গত ৩ মে থেকে শুরু করে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত ধান ক্রয় কার্যক্রম চলার কথা থাকলেও হঠাৎ করে ৯ আগস্ট থেকে ধান ক্রয় বন্ধ করে দেয় সরকার। ধান ক্রয় বন্ধের আগ পর্যন্ত ১১১৪ মেট্রিক টন ধান ক্রয় করা হয়।

উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন


সম্পাদক মণ্ডলীর উপদেষ্টা : স্বপন কুমার দেব, কুমার সৌরভ

সম্পাদক ও প্রকাশক : পঙ্কজ কান্তি দে

অনলাইন সম্পাদক : মাহবুবুল হাছান শাহীন

সম্পাদক কর্তৃক অক্ষর মুদ্রণ অফসেট প্রেস, জোয়াহের রাজা ট্রেড সেন্টার, পুরাতন বাসস্টেশন, সুনামগঞ্জ।

মোবাইল : ০১৭১৮৩৪৫৯৭৫

বিজ্ঞাপন : ০১৩২৫৪৬২৪৯৫

ই-মেইল : [email protected]

সুনামগঞ্জের খবর পরিবার