প্রকাশিত: ১৬ আগস্ট, ২০২৬ ২৩:২৮
সুনামগঞ্জ পৌর শহরের প্রাণকেন্দ্রসহ গুরুত্বপূর্ণ পুরাতন পৌরসভা ভবনের জায়গায় ময়লা—আবর্জনা ফেলায় চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন পথচারী, শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ী ও স্থানীয় বাসিন্দারা। দীর্ঘদিন ময়লা পড়ে থাকায় ছড়াচ্ছে দুর্গন্ধ, বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি। শহরের ব্যস্ত সড়ক, স্কুল, জাদুঘর ও শাপলা চত্বরের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থানও এর প্রভাব থেকে রেহাই পাচ্ছে না।
সরেজমিনে দেখা যায়, শহরের পুরাতন পৌরসভা ভবনের জায়গায় দীর্ঘদিন ধরে ময়লা—আবর্জনা জমিয়ে রাখা হয়েছে। প্রতিদিন বিভিন্ন এলাকা ও বাসাবাড়ি থেকে ময়লা এনে এখানে ফেলা হচ্ছে। এতে তীব্র দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে আশপাশে। এর পাশেই রয়েছে সরকারি জুবিলী উচ্চ বিদ্যালয়, সরকারি পুকুর, জাদুঘর ও শাপলা চত্বর। ফলে শিক্ষার্থী, পথচারী ও সাধারণ মানুষকে দুর্গন্ধের মধ্য দিয়েই চলাচল করতে হচ্ছে।
শাপলা চত্বর শহরের অন্যতম পরিচিত ও জনসমাগমপূর্ণ স্থান। বিকেলে পথচারী, শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষ এখানে এসে কিছুটা সময় বসে কাটান। কিন্তু ময়লা—আবর্জনা ফেলে রাখায় দুর্গন্ধের কারণে শুনশান হয়ে পড়েছে চত্বরের আশপাশ। একইভাবে জাদুঘরের সামনেও দেখা যায় জনশূন্য হয়ে পড়েছে। শুধু পুরাতন পৌরসভা ভবনের স্থান নয়, শহরের বিভিন্ন ডাস্টবিনেও দিনের পর দিন ময়লা পড়ে থাকতে দেখা গেছে। নির্ধারিত সময়ে ময়লা অপসারণ না করায় কোথাও কোথাও ডাস্টবিন উপচে সড়কের পাশেও আবর্জনা ছড়িয়ে পড়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, ময়লা পড়ে থাকার কারণে শুধু দুর্গন্ধই নয়, মাছি—মশার উপদ্রবও বাড়ছে। বৃষ্টির সময় ময়লার সঙ্গে পানি মিশে দুর্গন্ধ আরও তীব্র হয়। এতে আশপাশের পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
উকিলপাড়ার বাসিন্দা মো. জহুর মিয়া বলেন, শহরের মাঝখানে স্কুল ও মানুষের চলাচলের রাস্তার পাশে ময়লার স্তূপ রাখা হয়েছে। দুর্গন্ধের কারণে ওই এলাকা দিয়ে চলাচল করাই কঠিন হয়ে পড়েছে। তিনি বলেন, পৌরবাসীর দাবি, ময়লার স্তূপগুলো দ্রুত সরিয়ে অন্যত্র নেওয়া হোক। শহরের মানুষ দীর্ঘদিন ধরে এ কারণে দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন।
পৌর কলেজের স্টাফ কাউন্সিলের সাধারণ সম্পাদক কাঞ্চন বৈদ্য বলেন, এখানে পুরাতন পৌরসভা ও পৌর কলেজের পুরাতন ক্যাম্পাস ছিল। শহরের প্রাণকেন্দ্র পুরাতন কোর্ট ও শাপলা চত্বরের পাশে এবং সরকারি জুবিলী উচ্চ বিদ্যালয়ের পুকুরসংলগ্ন এই জায়গাটি একটি ঐতিহ্যবাহী স্থান। অথচ বর্তমানে এটি পৌরসভার ময়লার ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে।
তিনি বলেন, প্রতিদিন শহরের বাসাবাড়ির ময়লা এখানে ফেলা হচ্ছে। এতে তীব্র দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। পাশের রাস্তা দিয়ে চলাচলের সময় দুর্গন্ধে বমি আসার মতো অবস্থা হয়। অসহ্য দুর্গন্ধের কারণে শাপলা চত্বরেও এখন স্বাভাবিকভাবে বসে সময় কাটানো যায় না। কাঞ্চন বৈদ্য আরও বলেন, শহরের প্রাণকেন্দ্রের এমন নান্দনিক ও ঐতিহ্যবাহী জায়গায় কেন ময়লা ফেলা হচ্ছে, তা বোধগম্য নয়। পৌরসভা কর্তৃপক্ষের কাছে অনুরোধ, দ্রুত ময়লা অপসারণ করে এই জায়গাটিকে ময়লার ভাগাড় থেকে রক্ষা করুন।
হাওর ও নদী রক্ষা আন্দোলনের সভাপতি মো. রাজু আহমেদ বলেন, পুরাতন পৌরসভা ভবন ভেঙে বহুতল ভবন নির্মাণের কথা দীর্ঘদিন ধরে শোনা গেলেও এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো কাজ হয়নি। তিনি বলেন, জনগুরুত্বপূর্ণ একটি স্থানকে কী পরিকল্পনায় ময়লার অস্থায়ী স্টেশন করা হলো, সেটি পৌরবাসীর প্রশ্ন? প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ না নিয়ে ভবনটি অপসারণ করা উচিত হয়নি। জায়গাটি একসময় পৌর কলেজ, কর্মকর্তাদের আবাসন ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে মুখরিত ছিল। এখন মানুষ নাকে রুমাল দিয়ে চলাচল করেন।
হাওর মন্ত্রণালয় বাস্তবায়ন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক কুদরত পাশা বলেন, শহরের বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় আরও কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন। ঐতিহ্য জাদুঘর ও শাপলা চত্বরে মানুষ বিকেলে ঘুরতে আসে। অথচ এর পাশেই পুরাতন পৌরসভা ভবনের জায়গাকে ময়লার ভাগাড়ে পরিণত করা হয়েছে। এতে মানুষজন এখানে আসতে অনাগ্রহী হচ্ছেন।
তিনি আরও বলেন, শাপলা চত্বরের পাশেই জুবিলী স্কুলের হোস্টেল। ময়লার দুর্গন্ধে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায়ও বিঘ্ন ঘটছে। শহরের ভেতরে ময়লা না ফেলে নির্ধারিত স্থানে নেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে।
গণমাধ্যমকর্মী ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব জাহাঙ্গীর আলম বলেন, শহরের বিভিন্ন স্থানে ময়লা—আবর্জনা পড়ে থাকে। পুরাতন পৌরসভা ভবনের জায়গায় ময়লার স্তূপ এমনভাবে রাখা হয়েছে যে দুর্গন্ধে পাশ দিয়ে হাঁটাও কঠিন।
তিনি বলেন, শহরের বিভিন্ন ডাস্টবিনেও দিনের পর দিন ময়লা পড়ে থাকে। রায়পাড়ার মোড়ের ডাস্টবিনও নিয়মিত পরিষ্কার করা হয় না। মানুষকে নাকে রুমাল দিয়ে চলাচল করতে হয়। এতে স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে। তিনি আরও বলেন, প্রতিদিনের ময়লা প্রতিদিন অপসারণ করতে হবে। মানুষকে নির্দিষ্ট স্থানে ময়লা ফেলতে সচেতন করতে মাইকিং করা যেতে পারে। পাশাপাশি নিয়মিত ডাস্টবিন পরিষ্কার করতে হবে।
শহীদ মুক্তিযোদ্ধা জগৎজ্যোতি পাবলিক লাইব্রেরির সাধারণ সম্পাদক খলিল রহমান বলেন, পৌরসভার বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় পরিকল্পিত উদ্যোগ প্রয়োজন। পুরাতন পৌরসভা ভবনের জায়গাটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এর আশপাশে সরকারি জুবিলী উচ্চ বিদ্যালয়, জাদুঘর ও শাপলা চত্বর রয়েছে। এখানে ময়লা ফেলার কারণে মানুষের ভোগান্তি বাড়ছে এবং রোগবালাই ছড়ানোর আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে। নির্ধারিত স্থানে পরিকল্পিতভাবে বর্জ্য অপসারণ করা উচিত।
এ বিষয়ে সুনামগঞ্জ পৌরসভার সহকারী প্রকৌশলী আশরাফুল ইসলাম কয়েস বলেন, পুরাতন পৌরসভা ভবনের স্থানে ময়লার ভাগাড় থেকে দুর্গন্ধ ছড়ানোর বিষয়টি দুঃখজনক। তবে ওই স্থানে একটি বহুতল ভবন নির্মাণের প্রকল্প প্রস্তাব স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, আশা করছি, খুব শিগগিরই এখানে দৃষ্টিনন্দন মার্কেট ও কমিউনিটি সেন্টার নির্মাণ করা হবে। পার্কিংয়ের ব্যবস্থাও থাকবে। ময়লার ভাগাড়টি সরিয়ে নিতে ট্রান্সফার স্টেশন নির্মাণের পরিকল্পনাও রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশ সরকারের সহযোগিতায় ‘২৫০’ নামে একটি প্রকল্প চলমান রয়েছে। এ প্রকল্পে সলিড ওয়েস্ট ব্যবস্থাপনার জন্য বড় অঙ্কের অর্থ বরাদ্দের বিষয়টি চুক্তি পর্যায়ে আছে। একজন প্রকৌশলী এ প্রকল্পের আওতায় বিদেশে প্রশিক্ষণ নিতে যাচ্ছেন। প্রকল্পটি শুরু হলে পুরো শহরের সলিড ওয়েস্ট একটি ব্যবস্থাপনার আওতায় আনা হবে।
উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন