প্রকাশিত: ১৫ আগস্ট, ২০২৬ ২৩:১৯
গতকাল দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে প্রকাশিত একটি সংবাদ অনুসারে জানা যায়, তাহিরপুর উপজেলার কৃষকরা উপযুক্ত ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় ধান বিক্রি করতে না পেরে চোখে অন্ধকার দেখছেন। অনেকে গোলায় ধান জমিয়ে রেখেছিলেন, দাম বাড়লে বিক্রি করে ছেলে—মেয়ের বিয়ে দিবেন বা অন্য কোনো বড় ব্যয়বহুল কাজে হাত দিবেন। এইসব কৃষকের এখন মাথায় হাত পড়েছে। পাইকরাররা প্রতি মণ ধানের মূল্য ৮০০ টাকার বেশি দিতে রাজি হচ্ছেন না। এই মূল্যে ধান বিক্রি করলে কৃষকদের উৎপাদন ব্যয়ও উঠে না। কৃষকরা জানিয়েছেন, গত বছরের এই সময়ে ধানের মণ ১৫০০ থেকে ১৬০০ টাকায় উঠেছিলো। এবারও এমন দর পাওয়ার আশায় কৃষক ধান জমিয়ে রেখেছিলেন। হঠাৎ করে এ বছর ধানের দাম পতনের কোনো সঠিক উত্তর আমাদের জানা নেই। কৃষকদের হিসাব অনুযায়ী এক কেয়ার (৩০ শতক) জমিতে ধান উৎপাদনে খরচ হয় প্রায় ১২ হাজার টাকা। ধান পাওয়া যায় ১২—১৫ মণ। বুঝাই যায় ৮০০ টাকা মণ বিক্রি করলে কৃষকরা উৎপাদন খরচ তুলতে পারবেন না। সরকার বোরো মৌসুমে প্রতি কেজি ধানের ক্রয়মূল্য নির্ধারণ করেছিলেন ৩৪ টাকা। এই হিসাবে এক মণ ধানের দাম সাড়ে বার শ’ টাকার উপরে পড়ে। সরকার ধানের এই মূল্য নির্ধারণ করে দেন কৃষকরা যাতে ন্যায্যমূল্য পেতে পারেন। সরকারিভাবে ধান ক্রয়ের স্বল্প লক্ষ্যমাত্রার কারণে কৃষকরা সরকারি গোদামে বেশি ধান বিক্রি করতে পারেন না। বেসরকারি বাজারেই তাঁদের ধান বিক্রি করতে হয়। সরকারিভাবে ধান কেনার যৎসামান্য যে লক্ষ্যমাত্রা দেয়া হয় তাও শতভাগ অর্জন করা হয় না। তাহিরপুর উপজেলায় এ বছর ১৫৯৪ মে.টন ধান ক্রয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারিত ছিলো। ক্রয় করা হয়েছে ১৫২১ মে. টন। অর্থাৎ ৭৩ মেট্টিক টন ধান ক্রয়ের বাকি। কিন্তু বিভাগীয় নির্দেশনায় তাঁরা ধান ক্রয় থেকে বিরত রয়েছেন। খাদ্য অধিদপ্তর কেন ধান ক্রয় না করার সিদ্ধান্ত দিলেন সে বিষয়ে কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা নেই। বোরো ধানের মূল্য পতন ও সরকারি গোদামের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ না হওয়ার এই চিত্র কেবল তাহিরপুর উপজেলার বাস্তবতা, এমন ভাবার অবকাশ নেই। এই অবস্থা পুরো হাওরাঞ্চলের বিরাজিত বাস্তবতা। দেশের কৃষকরা রক্ত—ঘাম এক করে, প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝঁুকি মাথায় নিয়ে যে ধান উৎপাদন করেন, বাজারে ন্যায্যমূল্য না পাওয়ার কারণে সেই কৃষক সমাজের মেরুদণ্ড ভাঙার উপক্রম হয়েছে। অথচ এ নিয়ে জাতীয় পর্যায়ে তেমন কোনো আলোচনা নেই।
আমরা বিস্ময়ের সাথে লক্ষ্য করি, আমাদের দেশে কৃষকরা তাঁদের উৎপাদিত কোনো পণ্যেরই ন্যায্যমূল্য কখনও পান না। কৃষকদের হাতে যতক্ষণ পণ্য থাকে ততক্ষণ বাজার ব্যবস্থা ওই পণ্যের দাম বাড়তে দেয় না। অল্প দামে কৃষকের পণ্য কিনে সেই পণ্যই ভোক্তা পর্যায়ে অস্বাভাবিকভাবে বেশি দামে বিক্রি করা হয়। চালের বাজারের দিকে তাকিয়ে দেখুন। বাজারে চালের দাম কমেনি। প্রতি মাসেই বাড়ছে। নিয়ম অনুসারে ধানের দাম কম থাকলে বাজারে চালের দামও কম হওয়ার কথা। কিন্তু তা হচ্ছে না। এই কারসাজির পিছনে নির্মম বাজার ব্যবস্থার সরাসরি ভূমিকা বিদ্যমান। হতাশ কৃষকরা মাঝে—মধ্যে ক্ষোভে—দুঃখে উপযুক্ত মূল্য না পেয়ে বাজারে আনা কৃষিজ পণ্য ফেলে দিয়ে অশ্রম্নসিক্ত নয়নে বাড়ি ফেরার করুণ সংবাদ প্রায়শই সংবাদ হয়। কিন্তু এই নিপীড়নমূলক বাজার ব্যবস্থার তাতে কিছুই যায় আসে না। এই বাজার বুঝে কেবল মুনাফা। কৃষকের কান্না, তাঁর বিপন্নতা, উৎপাদনকারীর হতাশা; কোনোকিছুই এই মুনাফাখোর বাজার ব্যবস্থার লোভের রাশ টানতে পারে না। ফলে যেমন কৃষকরা ঠকছেন তেমনি সাধারণ ভোক্তারা অতিরিক্ত দাম দিয়ে ক্ষতির শিকার হচ্ছেন। সাধারণ মানুষ বাজারের ক্রমবর্ধমান উর্দ্ধগতিতে এখন দিশেহারা। অন্যদিকে উৎপাদক কৃষক সমাজ ন্যায্যমূল্য না পেয়ে চোখে অন্ধকার দেখছেন। এই জায়গায় ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠার দায়িত্ব ছিলো রাষ্ট্রের। কিন্তু রাষ্ট্রও চোখ বন্ধ করে রেখেছে।
তাহিরপুরে ধানের দর পতনের যে সংবাদ পাওয়া গেছে, তা সারা দেশের বাস্তবতারই একটি ক্ষুদ্র দৃষ্টান্ত মাত্র। সরকার যদি এই জায়গায় দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ না করেন তাহলে কৃষকরা যে ধান চাষ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিবেন তা নিশ্চিত। ধানের দর পতনের পিছনে কী কারণ, অকারণে বিদেশ থেকে চাল আমদানি করে বাজার অস্থিতিশীল করা হচ্ছে কি—না, আড়ৎদার—মিলমালিক ও পাইকারি ব্যবসায়ীদের কোনো সিন্ডিকেশন রয়েছে কি—না তা খতিয়ে দেখে কৃষককে ধানের ন্যায্যমূল্য পাইয়ে দিতে সরকারকে দ্রুত এগিয়ে আসতে হবে।
সম্পাদকীয় থেকে আরো পড়ুন