প্রকাশিত: ১১ আগস্ট, ২০২৬ ২১:৩১
ক্রমাগতভাবে কমছে এসএসসি পরীক্ষার পাসের হার ও জিপিএ—৫ প্রাপ্তির সংখ্যা। জাতীয়ভাবে যেমন, সিলেট বোর্ডেও তেমন। ১০ আগস্ট প্রকাশিত এসএসসি’র ফলাফলে সুনামগঞ্জ জেলায়ও একই চিত্র পাওয়া যায়। সুনামগঞ্জে এ বছর পাসের হার শতকরা ৫৪ দশমিক ৬৭ শতাংশ, জিপিএ—৫ প্রাপ্ত সংখ্যা ৪১০ জন। ২০২২ সনে পাসের হার ছিলো ৭৯ দশমিক ৯৫ শতাংশ, জিপিএ—৫ ছিলো ৬৬৮। ২০২৩ সনে পাসের হার ও জিপিএ—৫ প্রাপ্তি ছিলো যথাক্রমে ৭৫.৪৯ শতাংশ ও ৬৫৬ জন। ২০২৪ সনে পাসের হার ছিলো ৭৪.৪১ শতাংশ, সে বছর জিপিএ—৫ পেয়েছিলেন ৬৪৫ জন। ২০২৫ সনে পাসের হার ও জিপিএ—৫ ছিলো ৬৭.৪৬ শতাংশ ও ৪১৭ জন। সরকারের শিক্ষামন্ত্রী জানিয়েছেন, এ বছর পরীক্ষার্থীদের যার যে নম্বর পাওয়ার কথা ঠিক সেই নম্বরই দেয়া হয়েছে। অর্থাৎ কাউকে টেনেটুনে পাসমার্কস দিয়ে যেমন পাস করানো হয়নি তেমনি মানবিক মার্কস দিয়ে জিপিএ—৫ এর সংখ্যাও বাড়ানো হয়নি। শিক্ষার মান বাড়ানোর জন্যই এই ব্যবস্থা, এবং অবশ্যই তা ইতিবাচক। শিক্ষাক্ষেত্রে অগ্রগতির ফাঁপা বেলুন ফোলানোর পরিবর্তে সঠিক মূল্যায়ন সর্বাবস্থায় ভালো ফলাফল বয়ে আনে। এতে শিক্ষার্থীরা পাঠে মনোনিবেশ করে এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেও পাঠদান ব্যবস্থার উন্নতি হয়। আমরা একটি যথার্থ শিক্ষিত জনগোষ্ঠী প্রত্যাশা করি। এই জনগোষ্ঠীর হাত ধরে কর্মসংস্থান এবং জ্ঞান—বিজ্ঞানের বৈচিত্রময় জগতে অনুপম ভূমিকা রাখার মাধ্যমেই আমাদের দেশটি এগিয়ে যাবে। ে¯্রফ পাসের হার বাড়ানোর জন্য অযথার্থ নম্বর দিয়ে শিক্ষার্থীর ভিত্তি নষ্ট করা কখনও কাম্য নয়। সুতরাং শিক্ষার মান উন্নয়নের লক্ষ্যে সরকারের এই দৃষ্টিভঙ্গি ভবিষ্যতে আমাদের কাক্সিক্ষত ফল এনে দিতে সহায়ক হবে। কিন্তু আসল প্রশ্ন হচ্ছে, শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের উন্নতির ব্যবস্থা না করে কেবল মূল্যায়নের ক্ষেত্রে কঠোরতা প্রদর্শন করার মধ্য দিয়ে কি শিক্ষার মান ও জাতীয় উদ্দেশ্য পূরণ সত্যিই সম্ভব ?
জাতীয়ভাবে ২০২৬ সনের এসএসসি পরীক্ষার ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা যায়, বিজ্ঞান ও ব্যবসায় শিক্ষা শাখার চাইতে মানবিক বিভাগের শিক্ষার্থীদের অকৃতকার্য হওয়ার হার অনেক বেশি। মানবিক বিভাগ থেকে সারা দেশে অর্ধেকের কম শিক্ষার্থী কৃতকার্য হয়েছেন। অধিকাংশ শিক্ষার্থী ইংরেজি ও গণিতে খারাপ করেছেন। বাংলা, ইংরেজি ও গণিত শিক্ষার মৌলিক বিষয়। এই বিষয়গুলোতে ভালো না করলে পরবর্তী শিক্ষা জীবনে কেউই উন্নতি করতে পারবে না। ফলাফল বিশ্লেষণের জায়গায় আরেকটি মৌলিক বিষয় উপেক্ষা করা হয়। শহর ও গ্রাম, বিত্তবান ও প্রান্তিক পরিবারের ফলাফলের তুলনামূলক বিশ্লেষণ আমরা কখনও দেখতে পাই না। যদি এই বিশ্লেষণ সামনে আসতো তাহলে আমরা নিশ্চিত যে, গ্রাম ও আর্থিকভাবে প্রান্তিক পরিবারের শিক্ষার্থীদের অনগ্রসর অবস্থানই দেখতে পাওয়া যেতো। এতে আমাদের রাষ্ট্রে অন্যান্য সকল জায়গার মতো শিক্ষায়ও যে প্রচুর বৈষম্য বিদ্যমান সেই হতাশাজনক অবস্থাটি উঠে আসতো। আমাদের অভিজ্ঞতায় বুঝতে পারি, শিক্ষা এখন মুনাফা অর্জনকারী পণ্যে পরিণত হয়েছে। যে অভিভাবক সন্তানকে প্রচুর টাকার নোট—গাইড ও অন্যান্য সহায়ক গ্রন্থ কিনে দিতে পারেন এবং অধিক সংখ্যক প্রাইভেট শিক্ষক রেখে পড়াতে পারেন; সেইসব শিক্ষার্থীরাই ভালো ফলাফল করছেন। অর্থাৎ শিক্ষা গ্রহণের ক্ষেত্রেও এখন আর্থিক অস্বচ্ছলতা একটি বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। অথচ কথা ছিলো রাষ্ট্রের সকল স্তরের শিক্ষার্থীরা একই ধরনের সুযোগ পেয়ে শিক্ষা জীবনের এক একটি ধাপ অতিক্রম করবে। সকলে সমান সুযোগ পেলে প্রকৃত মেধার যাচাই সম্ভব হয়। এখন যেভাবে আমরা শিক্ষাকে পণ্যে পরিণত করেছি তা অব্যাহত থাকলে সামনের বছরগুলোতে যে পাসের হার ও জিপিএ প্রাপ্তির হারও আরও কমবে তা হলফ করে বলা যায়। সুতরাং শিক্ষার মানোন্নয়নের জায়গায় কাক্সিক্ষত ফল পেতে হলে মূল্যায়ন ব্যবস্থার ন্যায্যতা বজায় রাখার পাশাপাশি শিক্ষাক্ষেত্রে বিরাজিত চরম বৈষম্য দূর করার উদ্যোগও গ্রহণ করতে হবে।
যেসব শিক্ষার্থী এ বছর এসএসসি পরীক্ষা পাস করেছেন তাঁদের অভিনন্দন। এই শিক্ষার্থীরা যাতে পরবর্তী উচ্চতর ধাপে ঝরে না পড়ে সরকারকে সেদিকে মনোযোগী হতে আমাদের অনুরোধ। প্রতিযোগিতামূলক বিশ^ব্যবস্থায় জায়গা করে নিতে উপযুক্ত শিক্ষা গ্রহণের বিকল্প নেই। আমাদের দেশে শিক্ষার দর্শন ও উদ্দেশ্য কী, তা এখনও অনেকটা অস্পষ্ট। ফলে দেশে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা বাড়ার অনভিপ্রেত অবস্থা দেখতে পাওয়া যায়। এই জায়গায় ভারসাম্য আনয়ন করতে মৌলিক স্তরের শিক্ষা গ্রহণের পর কর্মমুখী শিক্ষার বিস্তারে সরকারকে মনোযোগী হতে হবে। কর্মমুখী শিক্ষা এবং উচ্চশিক্ষার দিগ্দর্শন ঠিক করতে পারলে আমরা জনসংখ্যাগত সুবিধা প্রাপ্যতার বিষয়টিও নিশ্চিত করতে পারব।
সম্পাদকীয় থেকে আরো পড়ুন