প্রকাশিত: ১৩ আগস্ট, ২০২৬ ২২:৪০
বুধবার সকালে সিলেটের রায়নগর মিতালী আবাসিক এলাকায় নিজ বাসায় খুন হন বয়স্ক দম্পতি আব্দুস ছাত্তার ও সুরাইয়া বেগম এবং তাঁদের গৃহপরিচারিকা তাহমিনা। তাঁদের নৃশংসভাবে গলা কেটে হত্যা করা হয়েছে। গতকাল (শুক্রবার) দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে প্রকাশিত সংবাদের তথ্য অনুসারে হত্যাকাণ্ডের ৫ ঘণ্টার মাথায় হত্যারহস্য উদঘাটন করে খুনিকে গ্রেফতার করতে সমর্থ হয় পুলিশ। পুলিশের দেয়া তথ্যমতে, ঘাতক বাবুল মিয়া পেশায় কখনও রঙমিস্ত্রি কখনও কসাইর কাজ করতো। গৃহপরিচারিকা তাহমিনার সাথে ছিলো তার প্রণয়। ওইদিন সকালে বাবুল মিয়া বাসায় ঢুকে, তাহমিনাই তাকে দরোজা খোলে দেয়। বাবুল কুপ্রস্তাব দিলে তাহমিনা তাতে রাজি হয়নি। ক্ষিপ্ত হয়ে বাবুল সাথে থাকা ছুড়ি দিয়ে তাহমিনার গলা কেটে ফেলে। তাহমিনার চিৎকার শুনে গৃহকর্ত্রী সুরাইয়া বেগম এগিয়ে এলে তাকেও খুন করে, ঘটনার শেষ স্বাক্ষ্য বৃদ্ধ আব্দুস ছাত্তারকেও হত্যা করে বাবুল। সুনামগঞ্জের খবরে প্রকাশিত পৃথক সংবাদ থেকে খুনের আরেকটি হৃদয়বিদারক সংবাদ পাওয়া যায়। ঘটনাটি দিরাই উপজেলার। পারিবারিক কলহের জের ধরে পিতা নিজের যথাক্রমে ছয় ও তিন বছর বয়সী দুই অবোঝ সন্তানকে নৃশংস কায়দায় হত্যা করে হাওরে ভাসিয়ে দেয়। ঘটনার বিবরণ থেকে জানা যায়, ন্ত্রীর সাথে ঝগড়া করে দিরাই উপজেলার চরনারচর ইউনিয়নের পেরুয়া মধুপুর গ্রামের কামরুল হাসান গত শুক্রবার নিজের দুই সন্তান মুহাদ্দিস ও তুলনাকে নিয়ে বাড়ি থেকে বের হয়ে সিলেট চলে আসে। সন্তানদের নিয়ে সে দুইদিন সিলেট অবস্থান করে। রবিবার সন্ধ্যায় দুই সন্তানকে নিয়ে কামরুল সিলেট ছাড়ে। পথিমধ্যে সে সন্তানদের ঘুমের ঔষধ মিশ্রিত পানি পান করায়। এরপর রাত সাড়ে আটটার দিকে শান্তিগঞ্জের ডাবর এলাকায় ঘুমন্ত ছোট মেয়ে তুলনাকে দেখার হাওরে ফেলে দেয়। একইভাবে দিরাই রাস্তা পেরিয়ে বড় ছেলে মুহাদ্দিসকেও হাওরে ফেলে। ঘুমন্ত দুই শিশু পানিতে ডুবে মৃত্যুবরণ করে। হাওরে শিশু দুইটির মৃতদেহ ভেসে উঠলে পুলিশ লাশ উদ্ধার করে। এক্ষেত্রেও পুলিশ কম সময়ের মধ্যে ঘাতক কামরুলকে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়। পুলিশের কাছে দুই সন্তান হত্যার কথা স্বীকার করেছে ঘাতক পিতা। সিলেট ও দিরাই উপজেলার এই দৃই পৃথক খুনের ঘটনা আমাদের অন্তরাত্মাকে কাঁপিয়ে দিয়েছে। কী সাংঘাতিক হত্যাপ্রবণ জাতিতে পরিণত হচ্ছি আমরা যেখানে কাউকে হত্যা করতে হাত একটুও কাঁপে না। নির্বিকারে নিজ সন্তানকে হত্যা করা যায়। তুচ্ছ কারণে প্রতিনিয়ত মানুষ কর্তৃক অন্য মানুষকে খুন করার ঘটনা এখন যেন নৈমিত্তিক বিষয়ে পরিণত হয়েছে। প্রতিদিন সংবাদপত্রের পাতা খুনোখুনির ঘটনায় সয়লাব থাকে। গড়ে প্রতিদিন দেশে ৬ এর অধিক খুন হয়ে থাকে। গত ৭ জুন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল (টিআইবি) বর্তমান সরকারের ১০০ দিনে ৬০৫ খুনের পরিসংখ্যান তুলে ধরে সংবাদ সম্মেলন করে। রাজনৈতিক কারণে প্রতিপক্ষকে খুন করা কিছু এলাকার অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। কাউকে শত্রু মনে করলে তাঁকে প্রাণে মেরে ফেলতে প্রতিপক্ষ একটুও চিন্তা করে না। খুনের প্রবণতা হঠাৎ করে বাড়েনি। বিগত বহু বছর ধরেই এমন প্রবণতা সর্বনাশা রূপ ধারণ করেছে। এই খুনী চরিত্র অর্জনের পিছনে কী কারণ, এর পেছনে বিদ্যমান আর্থ-রাজনৈতিক-সামাজিক ব্যবস্থার কী ভূমিকা, ব্যক্তির মধ্যে জিঘাংসা তৈরি হওয়ার প্রেক্ষাপট; সবকিছু নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার মতো এক দুঃসময়ে বসবাস করছি আমরা। ব্যক্তিতে-ব্যক্তিতে নানা কারণে বিরোধ, শত্রুতা থাকবেই। তা মিটানোর আইনসম্মত উপায়কে বাদ দিয়ে কেন হত্যাকাণ্ডে কিছু মানুষ মেতে উঠছে তা নির্ধারণ করে এই অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসার উপায় অবলম্বিত না হলে ক্রমশ খুনের প্রবণতা বাড়তেই থাকবে।
আমাদের বৈষম্যপীড়িত রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা এই ধরনের খুনোখুনির উপযুক্ত কি-না তাও গভীর অনুসন্ধানের বিষয়। রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডগুলো বেশিরভাগ সময় ক্ষমতার প্রভাবে বিচারবহির্ভূত থাকতে দেখা যায়। এতে খুনীরা অধিকতর উৎসাহিত হয়। সমাজে অভাব প্রকট অথবা সম্পদ বৈষম্য বাড়লে কিংবা ন্যায্যতা লঙ্ঘিত হলে বঞ্চিতদের মধ্যে হতাশাজনিত ক্ষোভ তৈরি হয়। এই ক্ষোভ থেকে কেউ কেউ খুনির পরিচয় ধারণ করে। আমাদের সামাজিক ভারসাম্যও এখন নষ্ট হয়ে গেছে। জনগোষ্ঠী বিচ্ছিন্ন, স্বার্থান্ধ ও আত্মকেন্দ্রিক হয়ে উঠেছে। রাষ্ট্রকে আজ হত্যাপ্রবণ জাতিতে পরিণত হয়ে উঠার এই মহাতঙ্ক দূর করার গুরুদায়িত্ব গ্রহণ করতে হবে।
সিলেট ও দিরাই উপজেলার দুই পৃথক হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের দ্রুত উপযুক্ত বিচারিক প্রক্রিয়ায় সাজা নিশ্চিত করার পাশাপাশি একটি সুস্থ্য ও সুন্দর সমাজ বিনির্মাণের জন্য আমরা রাষ্ট্র, সরকার, প্রশাসন ও রাজনীতিকসহ সমাজের সকল স্তরের মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করি।
সম্পাদকীয় থেকে আরো পড়ুন