প্রকাশিত: ১২ আগস্ট, ২০২৬ ২৩:৪৪
ভোলাগঞ্জ—ছাতক রজ্জুপথটি কেবল বাংলাদেশ রেলওয়ের একটি বিরল পরিবহন ব্যবস্থাই নয় এটি রেলওয়ের এক সময়ের ঐতিহ্য ও সক্ষমতার ঐতিহাসিক নিদর্শন। ছাতকের সিমেন্ট শিল্পকে লক্ষ করে ভারত থেকে চুনাপাথর পরিবহনের জন্য রেলওয়ে স্বাধীনতা পূর্ব সময়ে ১৯ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যবিশিষ্ট এই রজ্জুপথটি তৈরি করে। পরে এই রজ্জুপথ দিয়ে পাথর পরিবহনও শুরু হয়। এই রজ্জুপথের চারটি স্টেশন, ১২০টি ট্রেসেল ও ৪২৫টি বাকেটের মাধ্যমে প্রতিবছর ১২ লাখ ঘনফুট পাথর ও চুনাপাথর পরিবহন করা হতো। ২০১৩ সনের শেষের দিকে এই রজ্জুপথটি বন্ধ হয়ে যায়। এটি পুনরায় সচল করার কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়নি। আমদানিকৃত চুনাপাথর ও পাথর পরিবহনের নানবিধ বিকল্প পরিবহন ব্যবস্থা চালু হওয়ার কারণে রজ্জুপথটি আগের প্রয়োজনীয়তা হারায়। এরপর এই রজ্জুপথে চলতে থাকে নির্বিচারে সম্পদ হরণ, চুরি ও বিনষ্টকরণের দীর্ঘযাত্রা।
গতকাল এই ঐতিহ্যবাহী রজ্জুপথের দুর্দশা নিয়ে সুনামগঞ্জের খবরে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। যেখানে এর যন্ত্রপাতি ও মূল্যবান উপকরণ লুটপাটের পাশাপাশি রেলওয়ের মালিকানাধীন ভূমি বেহাত হওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে। এই রজ্জুপথটি বেপরোয়া লুটপাটের শিকার হয় ২০২৪ সনের ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে। রজ্জুপথের নিরাপত্তাকর্মীরা এই লুণ্ঠনযজ্ঞ থামাতে ব্যর্থ হন। প্রতিবেদনের তথ্য অনুসারে বাংলাদেশ রেলওয়ের নথি মোতাবেক ভোলাগঞ্জ পাথর কোয়ারি ও রোপওয়ে এলাকায় রেলওয়ের ১ হাজার ২৭ দশমিক ৩৩ একর জমি রয়েছে। রজ্জুপথটি পরিত্যক্ত হওয়ার কারণে এই মূল্যবান ভূমি অবৈধ দখলের ঝঁুকিতে আছে। রেলওয়েও নিজের সম্পদ রক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় কর্ম সম্পাদনে গাফিলতি দেখাচ্ছে। সারা দেশে রেলওয়ের অনেক জমি অবৈধ দখলদারদের দখলে যাওয়ার কথা আমাদের জানা। সেই পথেই এগোচ্ছে ছাতক—ভোলাগঞ্জ রজ্জুপথটি। বিষয়টি দুঃখজনক এবং সরকারি সম্পদ রক্ষণাবেক্ষণে চূড়ান্ত গাফিলতির প্রমাণ বহন করে। বাংলাদেশ রেলওয়েকে সরকারি সম্পদ রক্ষায় মনোযোগী হওয়া উচিৎ।
সময়ের বিবর্তনে পুরনো প্রযুক্তি ও ব্যবস্থা পরিত্যক্ত হয়, নতুন এবং উন্নত ব্যবস্থা আসে। এটি অগ্রগতির লক্ষণ। তবে ভোলাগঞ্জ—ছাতক রজ্জুপথটির উপযোগিতা শেষ হয়ে গেছে বলে আমরা মনে করি না। ছাতকে এখন বাংলাদেশের বৃহত্তম বেসরকারি সিমেন্ট উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান লাফার্জের কারখানা অবস্থিত। সরকারি মালিকানাধীন ছাতক সিমেন্ট ফ্যাক্টরিকেও পুনরায় উৎপাদনে ফিরিয়ে আনার চিন্তাভাবনা সক্রিয়। সিমেন্ট শিল্পের জন্য অপরিহার্য কাঁচামাল চুনাপাথর নিকটবর্তী ভারতের মেঘালয় রাজ্য থেকে আমদানি করা হয়। মূলত চুনাপাথর আমদানিস্থলের নিকটবর্তী হওয়ার কারণেই ছাতকে সিমেন্ট শিল্পের বিকাশ ঘটেছে। এখনও এইসব সিমেন্ট কারখানায় ভারত থেকে প্রচুর চুনাপাথর আনা হয়। নৌপথ বা সড়কপথে চুনাপাথর পরিবহনের তুলনায় রজ্জুপথে পরিবহন অনেক সাশ্রয়ী বলেই আমরা মনে করি। এছাড়া ভোলাগঞ্জ সীমান্ত হতে প্রচুর পাথর বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গায় সরবরাহ করা হয়।
এইসব পণ্য পরিবহনে রজ্জুপথের গুরুত্ব এখনও আছে বলেই সকলে মনে করেন। এমতাবস্থায় দীর্ঘ ১৩ বছর যাবৎ রজ্জুপথটি সংস্কার ও সচল করার পরিবর্তে একেবারে পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হলো কেন তা আমাদের বোধগম্য নয়। এই রজ্জুপথটি রেলওয়ের রাজস্ব আয়ের একটি প্রধান উৎস হতে পারতো। কিন্তু রেলওয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ না করায় এই সম্ভাবনার অকাল মৃত্যু ঘটতে চলেছে। অন্যদিকে পরিত্যক্ত রজ্জুপথের সম্পদ বেহাত হওয়ার বিষয়টি সম্পর্কে রেলওয়ের উদাসীনতাও গভীর উদ্বেগের বিষয়। আশা করি রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ বিষয়টি নিয়ে নতুন করে চিন্তা শুরু করবেন এবং এই রজ্জুপথ নিয়ে নতুন পরিকল্পনা গ্রহণ করে সচল করার পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন।
রজ্জুপথটি যে কেবল পণ্য পরিবহনের জন্যই উপযোগী তা নয়। বরং এটি একটি প্রাচীন ঐতিহ্যের অংশ হয়ে এই অঞ্চলের পরিচয়গর্বের অনন্য উপলক্ষ হতে পারে। ভোলাগঞ্জ সীমান্ত এলাকা, এর সাথে সংযুক্ত পাহাড়ি নদী, নৈসর্গিক শোভা; সবকিছু মিলিয়ে এই এলাকার পর্যটন সম্ভাবনাও উজ্জ্বল। রজ্জুপথটি সম্ভাবনাময় পর্যটন বিকাশের একটি অনন্য প্রতীকে পরিণত হতে পারতো। আমরা ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে মুহূর্তেই ধ্বংস করে ফেলতে যতোটা ওস্তাদ ততোটাই অকর্মা ওই ঐতিহ্যকে নতুন সম্ভাবনার আলোয় উজ্জ্বল করতে। পৃথিবীর কোনো দেশেই এভাবে ইতিহাসের বিষয়বস্তু ধ্বংস করতে দেয়া হয় না। বরং ইতিহাসের নানা কালপর্বকে ধারণ করার স্মারকচিহ্ন হিসেবে এগুলোকে যত্ন করে সংরক্ষণ করা হয়। সুতরাং এই রজ্জুপথের অর্থনৈতিক, পরিবহনগত এবং পর্যটন সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে অবিলম্বে এর উপযুক্ত সংস্কার সাধন ও সচলকরণের প্রত্যাশা আমাদের। বাংলাদেশ রেলওয়ে কি তাদের অতীত সক্ষমতা ও গর্বের প্রতীকটিকে রক্ষা করবেন ?
সম্পাদকীয় থেকে আরো পড়ুন