স্লিপার বাস যেন নিরব মৃত্যুর বাহন না হয়

প্রকাশিত: ১০ আগস্ট, ২০২৬ ০০:০৮

সড়কপথে স্বাচ্ছন্দ্য ও আরামদায়ক বাস—সার্ভিসে সর্বশেষ সংযুক্ত হয়েছে স্লিপার বাস। বিশেষ করে যাঁরা রাতে দূরগন্তব্যে যাতায়াত করেন তাঁরা স্লিপার বাসকেই পছন্দ করেন।  ঘুমানোর মতো ব্যবস্থা থাকায় রাত্রি জাগরণের ক্লান্তি থেকে বাঁচতে যাত্রীরা এইসব বাসে চড়েন। কিন্তু জানা যায়, স্লিপার বাসের নামে বিভিন্ন সড়কে যে বাসগুলো চালানো হয় তার অনেকগুলোরই চেসিস ও কাঠামোসহ যান্ত্রিক ব্যবস্থাদি দুর্বল। যে চেসিসের উপর যতগুলো স্লিপিং সিট থাকা উচিৎ বহু মালিক এর চাইতে বেশি সিট বানিয়ে ফেলেন বাসে। যে চেসিস ডাবল ডেকার (দু’তলা) হওয়ার কথা নয় সেগুলোও অনায়াসে ডাবল ডেকারে পরিণত হচ্ছে। চেসিসের ভার—বহন ক্ষমতার অতিরিক্ত সিট বসানোর ফলে গাড়িগুলোর ভারসাম্য নষ্ট হয়। ফলে এইসব স্লিপার বাসের দুর্ঘটনার সম্মুখীন হওয়ার ঝঁুকিও বাড়ে।

 

গত শুক্রবার সিলেট—ঢাকা মহাসড়কের ওসমানিনগর এলাকায় যে মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় ৯ প্রাণহানি ও ২৫ জন আহত হয়েছেন, তার পিছনেও একটি স্লিপার বাস দায়ী বলে দেখা যায়। ঢাকা থেকে ছেড়ে আসা বেঙ্গল পরিবহনের ওই স্লিপার বাসটি অন্য একটি পিকআপকে ওভারটেক করে সড়কের বিপরীত লেনে চলে আসে এবং তখন সিলেট থেকে ছেড়ে আসা ইউনিক পরিবহনের সাথে মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। এই দুর্ঘটনার পর মহাসড়কে চলাচলকারী স্লিপার বাসগুলো নিয়ে নতুন করে আলোচনার সূত্রপাত হয়েছে। গতকাল দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে এ সংক্রান্ত একটি বিশেষ প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। প্রতিবেদনের তথ্য অনুসারে গাড়ির চেসিস তৈরিকারী বিভিন্ন বিদেশি প্রতিষ্ঠান নানাভাবে বিআরটিএকে ম্যানেজ করে এইসব চেসিসের অনুমোদন করিয়ে নেয়। পরে স্থানীয় মালিকরা দেশের বিভিন্ন ওয়ার্কশপে এই চেসিসের উপর স্লিপার বাসের কাঠামো তৈরি করেন। এক্ষেত্রে চেসিসের ধারণ ক্ষমতা, গাড়ির নিখঁুত নকশা এবং অন্যান্য যান্ত্রিক সক্ষমতা পরীক্ষার বিষয়টি উপেক্ষিত থাকে। যাত্রীরা নিরাপত্তা, স্বাচ্ছন্দ্য ও আরামের জন্য অধিক ভাড়া দিয়ে এসব বাসে ভ্রমণ করেন, কিন্তু এগুলো যখন দুর্ঘটনা এবং ঝঁুকির কারণ হয় তখন তা নিয়ে জনপরিসরে আতঙ্ক তৈরি হওয়া অতি স্বাভাবিক। বিআরটিএ, সড়ক মন্ত্রণালয়সহ সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর এ বিষয়ে নজর দেয়া জরুরি। 

 


অভ্যন্তরীণ মানদণ্ড অনুসারে বাসটির উচ্চতা ও ডিজাইন এমনভাবে করতে হয় যাতে মহাসড়কে বাসটি সহজেই উল্টে না পড়ে। এজন্য প্রকৌশলগত ভারসাম্য থাকতে হবে। বাংলাদেশের বিভিন্ন সড়কে চলাচলকারী স্লিপার বাসগুলোর অধিকাংশই অনুমোদনহীন বলে জানা যায়। সাধারণ বাসের অনুমোদন নিয়ে এগুলোকে স্লিপার বাসে রূপান্তর করে চালানো হয়ে থাকে। সড়কপথে অনুমোদনহীনভাবে চলাচলকারী এসব বাস নিয়ন্ত্রণের কোনো উদ্যোগ দৃশ্যমান নয়। বরং সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন সড়কে প্রতিদিন স্লিপার বাসের সংখ্যা বাড়ছে বলে আমরা দেখতে পাই। আমদানিকৃত চেসিসের উপর স্লিপার বাসের অতিরিক্ত উচ্চতার যে বডি বসানো হয় তা চেসিসের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ আছে কি—না তা কখনও পরীক্ষা করা হয় না। অভিযোগ আছে এই না দেখার পিছনে রয়েছে আমদানিকারক—বডি নির্মাতা ওয়ার্কশপ—মালিক এবং বিআরটিএ’র মধ্যে এক গভীর সখ্যতা। কিসের বিনিময়ে এই সখ্যতা তৈরি হয় তা এই দেশের সকলের জানা। কিন্তু আমাদের প্রশ্ন হচ্ছে, মানুষের জীবনকে মৃত্যুঝঁুকির মধ্যে ফেলে এমন নির্মম সখ্যতার শেষ হবে কবে ? এর উত্তর কারও জানা নেই। কারণ সড়ক, মহাসড়কের নানা অব্যবস্থাপনা, দুর্ঘটনা, মৃত্যু, পঙ্গুত্ববরণ ইত্যাদি এখন আমাদের গা—সওয়া হয়ে গেছে। এজন্য কোনো পরিবহন মালিক বা সংশ্লিষ্ট অন্যদের আইনি ব্যবস্থার মুখোমুখি হতে হয় না। সড়ক পথের এই দুর্দান্ত প্রতাপশালী মালিক পক্ষকে রুখবার সাধ্য কারও রয়েছে কি—না, এমন প্রশ্ন এখন সর্বত্র ঘোরপাক খাচ্ছে। 

 


সিলেট, সুনামগঞ্জ থেকে ঢাকা পর্যন্ত যেসব স্লিপার বাস চলাচল করে থাকে তার অনেকগুলোই অনুপযুক্ত বলে চলাচলকারী যাত্রীরা জানিয়েছেন। স্লিপারে অগ্নিনির্বাপন ব্যবস্থা, জরুরি নির্গমন পথ, দক্ষ চালক, শৌচাগার প্রভৃতির ব্যবস্থা থাকার প্রত্যাশা থাকলেও কার্যত কোনো বাসে এর কিছুই নেই। বরং একটি স্বাভাবিক এসি বাসের চাইতেও বেশি সিটের ব্যবস্থা করা হয় এইসব স্লিপারে। একটি  এসি বাসে যেখানে ৩২টি সিট থাকে সেখানে দু’তলা স্লিপারে ৪৫টি পর্যন্ত সিট থাকতে দেখা যায়। যাত্রীরা বেশি টাকা খরচ করে নিরপত্তা ও স্বাচ্ছন্দ্যে ভ্রমণ করতে চান। বাস্তবে হচ্ছে উল্টো। এর প্রতিকার হওয়া প্রয়োজন। মহাসড়ক থেকে সকল অবৈধ স্লিপার বাস সরিয়ে নিতে বিআরটিএকে জরুরি উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। যেসব স্লিপার চলবে সেগুলো যাতে সব দিক থেকে উপযুক্ত থাকে তা নিশ্চিত করতে হবে। আমরা স্লিপার বাসে নিরব মৃত্যুর মিছিল দেখতে চাই না।

সম্পাদকীয় থেকে আরো পড়ুন


সম্পাদক মণ্ডলীর উপদেষ্টা : স্বপন কুমার দেব, কুমার সৌরভ

সম্পাদক ও প্রকাশক : পঙ্কজ কান্তি দে

অনলাইন সম্পাদক : মাহবুবুল হাছান শাহীন

সম্পাদক কর্তৃক অক্ষর মুদ্রণ অফসেট প্রেস, জোয়াহের রাজা ট্রেড সেন্টার, পুরাতন বাসস্টেশন, সুনামগঞ্জ।

মোবাইল : ০১৭১৮৩৪৫৯৭৫

বিজ্ঞাপন : ০১৩২৫৪৬২৪৯৫

ই-মেইল : [email protected]

সুনামগঞ্জের খবর পরিবার