প্রকাশিত: ১০ আগস্ট, ২০২৬ ২৩:২০
হাওরাঞ্চলের সমন্বিত উন্নয়ন কাজের পরিকল্পনা গ্রহণ, বাস্তবায়ন ও তদারকির জন্য সরকার পৃথক হাওর ও জলাভূমি উন্নয়ন অধিদপ্তর নামের সরকারি প্রতিষ্ঠানটি গঠন করেছিলেন। সুনামগঞ্জের এর জেলা দপ্তরের তিনতলা ভবন নির্মাণ শেষ হয় ২০১০ সনে। ২০১৬ সনে তৎকালীন পানিসম্পদমন্ত্রী ঘটা করে এই কার্যালয়ের উদ্বোধন করেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় হাওরাঞ্চলের জন্য প্রতিষ্ঠিত এই বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানটি এখন পর্যন্ত কোনো কাজই শুরু করেনি। কাজ শুরু করতে না পারলেও এই কার্যালয়ের বিপরীতে সরকারি বরাদ্দ দেয়া কিন্তু থেমে নেই। গতকাল দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে প্রকাশিত একটি সংবাদ থেকে জানা যায়, সরকারের ২০২৬—২০২৭ অর্থবছরের ক্রয় পরিকল্পনায় বোর্ডের সুনামগঞ্জ ও কিশোরগঞ্জ আঞ্চলিক কার্যালয় মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ খাতে ৪০ লাখ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এছাড়া প্রতিষ্ঠানটির অন্যান্য বরাদ্দও যথারীতি দেয়া আছে। আমাদের প্রশ্ন হলো, যে আঞ্চলিক কার্যালয়ের নতুন ভবনে কোনো কাজই শুরু হয়নি সেই ভবন মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণের নামে নতুন বরাদ্দ কেন ? নাকি দীর্ঘদিন অব্যবহৃত থাকার কারণে এটি পুনরায় ব্যবহার উপযোগী করতে এই বরাদ্দ ? যদি শেষেরটি মূল কারণ হয় তাহলে আমাদের আরেকটি প্রশ্ন, তাহলে কি এখন সুনামগঞ্জ হাওর ও জলাভূমি উন্নয়ন বোর্ডের কাজ শুরু হবে ? যদি কাজ শুরু করে তাহলে বিষয়টি হাওরবাসীর জন্য স্বস্তিদায়ক খবর হবে। এর পরিবর্তে এই বরাদ্দ খরচ করার পরও ভবনটি যদি আগের মতোই ভুতুড়ে বাড়ি হিসেবে থেকে যায় তাহলে সেটি হবে দুর্ভাগ্যের। যদি সে—রকমই হয় তাহলে জনগণের কষ্টার্জিত টাকা খরচ করে ভবনটি মেরামত করার প্রয়োজন কী ?
হাওর ও জলাভূমি উন্নয়ন অধিদপ্তরের ওয়েবসাইটের বর্ণনায় এই প্রতিষ্ঠানের রূপকল্প নির্ধারণ করা হয়েছে— ‘বাংলাদেশের হাওর ও জলাভূমি অঞ্চলের জনগণের টেকসই জীবনমান উন্নয়ন’। অভিলক্ষ্য নির্ধারিত আছে— ‘হাওর ও জলাভূমি অঞ্চলের জীববৈচিত্র সুরক্ষা, বন্যা ব্যবস্থাপনা ও অবকাঠামো উন্নয়নের মাধ্যমে জনগণের উন্নত জীবনযাত্রার মান বৃদ্ধি করা’। ঢাকায় সদর দপ্তর ও কিশোরগঞ্জ ও সুনামগঞ্জে দুইটি আঞ্চলিক কার্যালয়ের মাধ্যমে হাওরাঞ্চলের এই রূপকল্প ও অভিলক্ষ্য বাস্তবায়ন করার কথা প্রতিষ্ঠানটির। বাস্তবে প্রধান কার্যালয় ব্যতীত এর আঞ্চলিক কার্যালয়গুলো এখনও কার্যকর করা হয়নি। ফলে অধিদপ্তর প্রতিষ্ঠার পর কী করে বর্ণিত রূপকল্প ও অভিলক্ষ্য বাস্তবায়ন করছে তা এখন এক রহস্যময় প্রশ্ন। মূলত এখন পর্যন্ত হাওরবাসীর বিবেচনায় অধিদপ্তরটি একটি মাথাভারী প্রতিষ্ঠানের বাইরে হাওর উন্নয়নের অপরিহার্য প্রতিষ্ঠানে পরিণত হতে পারে নি। দেশের প্রধান হাওর এলাকা হিসেবে বিবেচিত সুনামগঞ্জ, সিলেট, কিশোরগঞ্জ, মৌলভিবাজার, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, হবিগঞ্জ, নেত্রকোণা প্রভৃতি জেলার জন্য এই অধিদপ্তর অদ্যবধি কোনো উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ করেছে কি—না সে ধরনের কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। সুনামগঞ্জের অভিজ্ঞতায় আমরা বলতে পারি, এ জেলায় এই অধিদপ্তরের কোনো কাজ নেই। সরকার হাওরের সার্বিক উন্নয়নের জন্য নীতিমালা ও মহাপরিকল্পনা তৈরি করেছে। সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে এসব মহাপরিকল্পনায়। হাওর ও জলাভূমি উন্নয়ন বোর্ডকেই এই বিশাল কর্মযজ্ঞের সমন্বয়কারী প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বপ্রাপ্ত হওয়ার কথা। কিন্তু হাওর মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে যেমন কোনো দৃশ্যমান উদ্যোগ নেই তেমনি এই অধিদপ্তরকেও তৃণমূলে কার্যকর করার অগ্রগতি নেই। হাওরবাসীর জন্য এ বড় দুর্ভাগ্যের।
হাওরে বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও ফসলরক্ষা বাঁধ নির্মাণে এককভাবে দায়িত্ব পালন করে পানি উন্নয়ন বোর্ড। পানি উন্নয়ন বোর্ডের ফোল্ডার বাঁধ কর্মসূচি এবং অন্যান্য কাজ ইতোমধ্যে হাওরাঞ্চলের জন্য অনুপযুক্ত বলে বিভিন্ন মহল থেকে মতামত ব্যক্ত করা হয়। হাওরের প্রকৃতি, পরিবেশ, জলবায়ু, বাস্তুতন্ত্র প্রভৃতি বিবেচনায় নিয়ে উপযুক্ত হাওর উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নের তাগিদ এইসব মহলের। হাওর ও জলাভূমি উন্নয়ন বোর্ড যদি সক্রিয় থাকতো তাহলে এ ব্যাপারে কিছুটা অগ্রগতি হলেও হতে পারতো। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটিকে একেবারেই ঠুঁটো জগন্নাথ করে রাখা হয়েছে। কেন এবং কী কারণে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধিদপ্তরকে কার্যকর করার পরিবর্তে অথর্ব করে রাখা হয়েছে, সেই প্রশ্নের কোনো উত্তর নেই। তবে হাওরবাসী আশা করেন, হাওরের সার্বিক উন্নয়নে প্রতিষ্ঠানটি তার বিধিবদ্ধ দায়িত্ব পালনে সক্রিয় হোক। নতুবা নতুন অর্থবছরে এর আঞ্চলিক কার্যালয় মেরামতের জন্য সরকারের দেয়া ৪০ লাখ টাকাও অপরিকল্পিত ফসলরক্ষা বাঁধের মতো জলে যাবে। আমাদের দেশটি খুব ধনি নয়। তাই আমাদের প্রতিটি পয়সা খরচ করতে হবে যথাযথ পরিকল্পনামাফিক এবং সর্বোত্তম উন্নয়ন অভিপ্রায়ে। এখানে অপচয় বিলাস দেখানোর কোনো অবকাশ নেই। হাওরবাসীর এই আকুতি কি হাওর ও জলাভূমি উন্নয়ন বোর্ডসহ সরকারের কর্ণকুহরে পৌঁছাবে ?
সম্পাদকীয় থেকে আরো পড়ুন