পাঠাগার ঘুমিয়ে গেলে জেগে উঠে অন্ধকার

প্রকাশিত: ১৪ আগস্ট, ২০২৬ ২২:৩৩

গত বুধবারের (১২ আগস্ট) দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরের একটি সংবাদ থেকে জানা যায়, ধর্মপাশা উপজেলা পাবলিক লাইব্রেরিটি অব্যবহৃত থাকতে থাকতে এখন পুরাবাড়ির রূপ নিয়েছে। সংবাদতথ্য অনুসারে ‘দীর্ঘদিন ধরে তালাবদ্ধ ও অযত্নে পড়ে থাকা ভবনটি দেখে বুঝার উপায় নেই এটি একটি পাবলিক লাইব্রেরি। ভবনের ছাদ ও দেয়ালে জমেছে শ্যাওলা। চারপাশে জন্মেছে ঝোপঝাড় ও আগাছা। ধুলাবালি ও মাকড়সার জালে আটকা পড়েছে ভিতরের একটিমাত্র বইয়ের তাক।’ গা ছমছম করা ভুতুড়ে বর্ণনা। বর্ণনায় ভয় ধরে মনে। মনে হয় ওখানে বুঝি অশুভ কিছু আছে। অমঙ্গলের জায়গাগুলোই এমন হয়। কিন্তু এ তো একটি পাঠাগার, বইয়ের সা¤্রাজ্য। আর বইয়ের পাতার প্রতিটি শব্দই তো মানুষের ভিতরে একটু একটু করে আলো প্রজ্জ্বলিত করে। পুস্তকে সঞ্চিত জ্ঞানভাণ্ডার মানুষকে আরও অজানা আবিষ্কারের নেশা বাড়িয়ে দেয়। পুস্তক মানুষকে নির্মল বিনোদন দেয়। মানুষকে ভালো হতে শেখায় পুস্তক। তাই পুস্তকের রাজ্য তো সবচাইতে বর্ণোজ্জ্বল ও সুন্দরতম হওয়ার কথা। তাহলে ধর্মপাশা পাবলিক লাইব্রেরিটি এতো বিবর্ণ এতো ভয়—জাগানিয়া চেহারায় কেন ? কারণ— নামে এটি লাইব্রেরি হলেও এর বাস্তব কোনো ব্যবহার নেই। সরকারি নির্দেশনা মানার রুটিন অনুসারে এটি তৈরি হয়। কিছু বইও সংগ্রহ করা হয়। আমরা নিশ্চিত সংগৃহিত বইগুলো সুনির্বাচিত নয় এবং সংগ্রহের সংখ্যাও অপ্রতুল। যাই ছিলো, সেটিও পাঠকদের জন্য উন্মুক্ত করা হয়নি অথবা তেমন করে সক্রিয় করার কার্যকর উদ্যোগের অভাব ছিলো। পাঠাগারে পাঠক না আসলে সেটি আর উজ্জ্বল থাকে কী করে, অবশ্যম্ভাবী পরিণতিতে এখন এটি ভুতুড়ে ঘরে পরিণত হয়েছে। আফসোস, বুি্দ্ধবৃত্তিক উৎকর্ষতা তৈরির জায়গায় আমাদের এই উদাসীনতা দেখে।  এই লাইব্রেরি সংস্কারের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। ২০২৫—২০২৬ অর্থবছরে এডিবি বরাদ্দ থেকে পাঠাগার সংস্কারের জন্য তিন লাখ টাকা বরাদ্দ হয়। এই বরাদ্দে কিছু কাজও হয়েছে। তবে স্থানীয় সচেতন ব্যক্তিরা প্রশ্ন তুলেছেন, যে পাঠাগার সবসময় বন্ধই থাকে সেখানে সংস্কারের নামে অর্থের অপচয় কেন ? তাঁদের এই অভিমতকে উপেক্ষা করার উপায় নেই। যে উদ্দেশ্যে পাঠাগার সংস্কার করা হয়েছে সেই উদ্দেশ্য সাধনে মনোযোগ না দিয়ে কেবল ভবনের যৎসামান্য উন্নয়ন করে কী লাভ ?  

 

 


প্রতিটি উপজেলায় সরকারি অর্থায়নে এরকম পাবলিক লাইব্রেরি তৈরি করা হয়েছে। দুর্ভাগ্যের বিষয় হলো— খোঁজ নিলে জানা যাবে প্রতিটি উপজেলা পাবরিক লাইব্রেরিই ধর্মপাশার মতো সংকটাপন্ন এবং পরিত্যক্ত অবস্থায় রয়েছে। পাঠাগারকে পাঠকের নিকট আকৃষ্ট করতে হলে কেবল আমলাতান্ত্রিক ব্যবস্থায় তা করা সম্ভব নয়। এর পেছনে বই—দরদি মানুষদের সম্পৃক্ত করতে হবে। দেশের বড় বড় শহরে বেসরকারিভাবে গড়ে উঠা অনেক সমৃদ্ধ লাইব্রেরির কথা আমরা জানি। এগুলো সরকারি—বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় তৈরি হয়। প্রাচীন বহু লাইব্রেরি এখনও ভালো ব্যবস্থাপনার আওতায় পাঠক ও পাঠাভ্যাস তৈরির জায়গায় অনুপম ভূমিকা রাখছে। বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত এইসব লাইব্রেরি যদি ভালোভাবে চলতে পারে তাহলে সরকারি আনুকূল্যে প্রতিষ্ঠিত পাবলিক লাইব্রেরি কেন কার্যকারিতা দেখাতে পারছে না ? এখানেই ব্যবস্থাপনায় আমলাতান্ত্রিক যান্ত্রিকতা পরিহার করে সৃজনশীলতার প্রয়োগ আবশ্যক বলে আমরা মনে করি। নানা কারণে ছাপানো বইয়ের পাঠক এখন কমছে। বিশেষ করে তরুণ সম্প্রদায়ের মধ্যে পুস্তক বিমুখতা উদ্বেগজনক। বইয়ের পরিবর্তে তাঁরা মোবাইল ফোনের পর্দায় বেশি আগ্রহী। বই বলতে এখন অনেকেই পাঠ্যপুস্তকের বাইরে বিভিন্ন নিয়োগ পরীক্ষার গাইডবই বুঝেন। বইয়ের প্রতি এমন অনাগ্রহ আমাদের জাতীয় মেধা বিকাশের জায়গাকে যে নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত করবে তা বলাই বাহুল্য। সমাজে বিরাজিত নানবিধ অস্থিরতা, অন্যায্যতা ও আত্মকেন্দ্রিকতার পিছনে যেসব অনুষঙ্গ দায়ী তার মধ্যে পাঠে অনাগ্রহ অন্যতম। আমাদের মেধাগত এই বন্ধ্যাত্ব কাটিয়ে তোলা অতিশয় জরুরি। এক্ষেত্রে সরকারের উপজেলা পাবলিক লাইব্রেরিগুলো ভালো ভূমিকা রাখতে পারতো। কিন্তু প্রয়োজনীয় পরিচর্যার অভাবে তা হচ্ছে না। সরকার ও স্থানীয় প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষকে এ বিষয়ে দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখার আহ্বান আমাদের। 

 


উপজেলা পাবলিক লাইব্রেরিগুলো পরিচালনার জন্য উপজেলা নির্বাহী অফিসারের নেতৃত্বে স্থানীয় সাহিত্যানুরাগী ব্যক্তিদের সমন্বয়ে একটি শক্তিশালী কমিটি গঠন করে দিলে ভালো ফলাফল পাওয়া যেতে পারে বলে আমাদের বিশ^াস। এর সাথে লাইব্রেরির অভ্যন্তরীণ পরিবেশ, পাঠকক্ষে প্রয়োজনীয় সুবিধাদি সংযোজন, দৈনিক সংবাদপত্র সরবরাহ এবং বিনোদন, শিক্ষা, বিজ্ঞান, দর্শন, নৈতিকতা প্রভৃতি বিচিত্র বিষয়ে প্রয়োজনীয় বইয়ের সমাহার ঘটাতে হবে। এক্ষেত্রে স্থানীয়ভাবে পৃষ্ঠপোষকতার ব্যবস্থাও করা যেতে পারে। পাঠাগার অন্ধকার দূর করে, এরও আগে দূর করতে হবে পাঠাগারকে ঘিরে তৈরি হওয়া অন্ধকার।

সম্পাদকীয় থেকে আরো পড়ুন


সম্পাদক মণ্ডলীর উপদেষ্টা : স্বপন কুমার দেব, কুমার সৌরভ

সম্পাদক ও প্রকাশক : পঙ্কজ কান্তি দে

অনলাইন সম্পাদক : মাহবুবুল হাছান শাহীন

সম্পাদক কর্তৃক অক্ষর মুদ্রণ অফসেট প্রেস, জোয়াহের রাজা ট্রেড সেন্টার, পুরাতন বাসস্টেশন, সুনামগঞ্জ।

মোবাইল : ০১৭১৮৩৪৫৯৭৫

বিজ্ঞাপন : ০১৩২৫৪৬২৪৯৫

ই-মেইল : [email protected]

সুনামগঞ্জের খবর পরিবার