প্রকাশিত: ১৮ আগস্ট, ২০২৬ ২২:৪৪
লিবিয়া থেকে ইউরোপে যাওয়ার পথে অতিমাত্রায় বিপজ্জনক সমুদ্রযাত্রায় অভিবাসন প্রত্যাসীদের মৃত্যু, নিখোঁজ ও দেশে ফেরৎ আসার সংখ্যা ক্রমশ বাড়ছে। গতকাল দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে প্রকাশিত একাধিক সংবাদ থেকে জানা যায়, লিবিয়া থেকে সমুদ্রপথে গ্রিস যাওয়ার পথে ভূমধ্যসাগরে খাবার ও পানির অভাবে অন্তত ১১ বাংলাদেশীর মৃত্যু ঘটেছে।
এক প্রত্যক্ষদর্শীর বরাতে জানা যায় ৪২ ব্যক্তিকে নিয়ে একটি প্লাস্টিকের নৌকায় সমুদ্রপথে যাত্রা শুরু হয় লিবিয়া থেকে। এর মধ্যে ৩৮ জনই ছিলেন বাংলাদেশী। পথে আকষ্মিক ঝড়ের কবলে পড়ে নৌকার খাবার ও পানি সমুদ্রে পড়ে যায়। পানি ও খাবারের অভাবে সকলের চোখের সামনে ১১ ব্যক্তির মৃত্যু হয়। মরদেহে পচন ধরার পর দুর্গন্ধ বের হলে অন্য সহযাত্রীরা মরদেহগুলো সমুদ্রে ফেলে দেয়। ওই নৌকায় সুনামগঞ্জের শান্তিগঞ্জ ও দিরাই উপজেলার কিছু ব্যক্তি ছিলেন। এদের অনেকেই এখনও নিখোঁজ রয়েছেন। ফলে দেশে থাকা স্বজনরা উদ্বেগাকুল সময় পার করছেন। সুনামগঞ্জের খবরের অন্য একটি সংবাদ থেকে জানা যায়, গত দুই মাসে সুনামগঞ্জ ও হবিগঞ্জের ৯২ জন অভিবাসন প্রত্যাশী ব্যক্তিকে লিবিয়া থেকে দেশে ফেরৎ আনা হয়, এদের ৬৬ জন সুনামগঞ্জ জেলার বিভিন্ন উপজেলার বাসিন্দা। জাতীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী কেবলমাত্র আগস্ট মাসেই লিবিয়া থেকে এমন ৫১৪ অবৈধ অভিবাসনপ্রত্যাশীকে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। অভিবাসনপ্রত্যাশী তরুণ ও যুবকদের জন্য লিবিয়া এখন একটি মরণফাঁদে পরিণত হয়েছে। পতঙ্গ যেমন আগুনে ঝাঁপ দেয় তেমনি উন্নত জীবনের স্বপ্ন দেখা তরুণরা ইউরোপে যাওয়ার স্বপ্ন নিয়ে লিবিয়া পারি জমাচ্ছেন দলে দলে। এদের অনেকেই সমুদ্রে সলিল সমাধিপ্রাপ্ত হয়ে জীবনের স্বপ্নকে মৃত্যুতে পরিণত করছেন, অনেকে বিদেশ—বিভুঁইয়ে মানবেতর, কষ্টকর ও নিপীড়নের শিকার হচ্ছেন, যাঁদের কপাল ভালো তাঁদের কিছু আন্তর্জাতিক সংস্থার উদ্যোগে সর্বস্ব খঁুইয়ে দেশে ফেরৎ আসছেন। সম্মুখে সমূহ বিপদ ও মৃত্যুর আশঙ্কা থাকা সত্ত্বেও লিবিয়া হয়ে ইউরোপ যাওয়ার প্রবণতা কিছুতেই কমছে না। অভিবাসনপ্রত্যাসীরা দেশে সুন্দর ভবিষ্যতের উপায় না পেয়ে সহায়—সম্পদ বিক্রি করে এই বিপদসঙ্কুল পথে যাত্রা করার চরম ঝঁুকি গ্রহণ করেন। যারা সফল হতে পারেন তাঁরা তো হলেন, বাকি যারা মৃত্যু, নিখোঁজ ও দেশে ফিরে আসার সংখ্যা বাড়াচ্ছেন তাঁদের মর্মন্তুদ জীবনগাঁথা পুরো দেশ ও জাতির জন্য গভীর লজ্জার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। এইসব তরুণদের প্রলুব্ধ করতে দেশে আছে দালাল ও মানবপাচারচক্রের এক শক্তিশালী নেটওয়ার্ক। দালালদের সম্মোহনী কথার জাদুতে আটকা পড়ে এইসব তরুণরা জীবনকে বিপন্ন করার পথ বেছে নিচ্ছেন। কিন্তু সরকারিভাবে এই দালালচক্রকে থামানোর কোনো উদ্যোগ লক্ষ্য করি না আমরা। একটি স্বাধীন দেশের কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী নিয়ে এমন ছেলেখেলা বুঝি আমাদের দেশেই সম্ভব।
বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা আহরণের প্রধান খাত হলো অভিবাসী বাংলাদেশীদের পাঠানো রেমিটেন্স। এই রেমিটেন্সপ্রবাহ না থাকলে দেশের অর্থনীতি নিমিষেই ম্লান হয়ে যাবে। কষ্ট করে বিদেশ গিয়ে যাঁরা দেশের অর্থনৈতিক ভিত্তি মজবুত করতে কাজ করেন, তাঁদের নিরাপত্তা ও কল্যাণের প্রতি রাষ্ট্রের মনোযোগ যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে তা এইসব মৃত্যু, নিখোঁজ ও দেশে প্রত্যাবর্তনের ক্রমবর্ধমান পরিসংখ্যান থেকে স্পষ্ট। আমরা জনসংখ্যাগত সুবিধার কথা বলি এবং আমাদের কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীকে নিয়ে গর্ব করি। কিন্তু এই জনগোষ্ঠীটি কীভাবে বেড়ে উঠছে তা নিয়ে জাতীয়ভাবে কোনো পরিকল্পনা নেই। কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীকে দক্ষ জনসম্পদে পরিণত করে বিদেশ পাঠানোর সুনির্দিষ্ট কর্মসূচির অভাব রয়েছে। দেশের ভিতর নেই যোগ্য কর্মসংস্থানের জায়গা। এই যখন অবস্থা তখন জনসংখ্যাগত সুবিধাটি যে কেমন বুমেরাং হতে পারে তা একের পর এক মৃত্যু, নিখোঁজ ও দেশে ফিরে আসার ঘটনার মধ্য দিয়ে প্রমাণিত হে্চ্ছ। রাষ্ট্র কখনও তার নাগরিককে নিশ্চিত মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিতে পারে না। লিবিয়া হয়ে ইউরোপে অভিবাসন অনেকটা মৃত্যুকূপে ঢুকার মতোই। প্রতিবছর যে হাজারো তরুণ—যুবক এই মৃত্যুকূপে ঢুকছে রাষ্ট্র কি তা জ্ঞাত নয় ? দালালচক্রের দুর্দান্ত প্রতাপ, প্রবল উপস্থিতি ও নিপীড়নমূলক ব্যবস্থা সম্পর্কে সরকারের নিশ্চয়ই জানা আছে। কিন্তু তা দমনের প্রচেষ্টা নেই। এতে নাগরিকের প্রতি রাষ্ট্রের দায়িত্ব—কর্তব্যে প্রচণ্ড ব্যত্যয় ঘটছে।
লিবিয়া থেকে ইউরোপ যাওয়ার পথে যাঁরা করুণ মৃত্যুর শিকার হয়েছেন, যাঁরা নিখোঁজ হয়েছেন, যাঁরা দেশে ফিরে এসেছেন; সকলের তথ্য সংগ্রহ করে সরকারের পুনর্বাসন পরিকল্পনা গ্রহণ করা দরকার। যে দালালচক্রের খপ্পরে পড়ে এইসব সম্ভাবনাময় তরুণ সর্বহারা হয়েছেন সেই দালালচক্রকে চিহ্নিত করে কঠিনতম সাজার ব্যবস্থা করা না গেলে অভিবাসনপ্রত্যাসীদের মৃত্যুর মিছিল ঠেকানো সম্ভব হবে না।
সম্পাদকীয় থেকে আরো পড়ুন