টাঙ্গুয়ার পরিবেশ দূষণ বন্ধে কাঠামোগত সংস্কার প্রয়োজন

প্রকাশিত: ১৯ আগস্ট, ২০২৬ ২২:৪৪

টাঙ্গুয়ার হাওরে একটি হাউসবোটের প্লাস্টিক বর্জ্য ফেলার ভিডিও ফেসবুকে ভাইরাল হলে পরিবেশ অধিদপ্তর সংশ্লিষ্ট হাউসবোট মালিককে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েছেন। ‘দ্য হাউসবোট’ নামের ওই নৌযান থেকে গত ৭ আগস্ট হাওরে প্লাস্টিক ফেলার দৃশ্য ধারণ করেন স্থানীয় এক যুবক, ওই যুবক পরিবেশ দূষণের প্রতিবাদও করেন। পরে তিনি ভিডিওটি নিজের ফেসবুকে আপলোড করেন। ভিডিও ভাইরাল হলে নজরে পড়ে পরিবেশ অধিদপ্তরের। অধিদপ্তর সরেজমিন পরিদর্শন করে অভিযোগের সত্যতা পান। এরপর পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ১৯৯৫ (সংশোধিত ২০১০) এর ৬ (ক) ধারার বিধান লঙ্ঘনের অভিযোগে নৌকা মালিককে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেয়া হয়েছে। নাগরিক প্রতিবাদ, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচার করা এবং তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের গোচরিভূত হওয়া এবং সর্বশেষ আইনি প্রক্রিয়া শুরুর এই পুরো চক্রটিকে আমরা ইতিবাচকভাবে দেখছি। এই ধরনের চক্র যদি সদা—সর্বদা অব্যাহত থাকে তাহলে আইনভঙ্গকারীরা আইন মানায় অধিকতর মনোযোগী হবে বলে আমাদের বিশ^াস। সম্প্রতি জেলা প্রশাসন টাঙ্গুয়ার হাওরের প্রতিবেশগতভাবে সংকটাপন্ন এলাকায় (ইসিএ) যান্ত্রিক নৌযানের প্রবেশ নিষিদ্ধসহ বেশকিছু নির্দেশনা জারি করে গণবিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেন। এরপর টাঙ্গুয়ার হাওর পর্যটন এলাকায় কয়েকটি ভ্রাম্যমান আদালত পরিচালনার মাধ্যমে নির্দেশ অমান্যকারী কিছু নৌযানকে জরিমানা ও সতর্ক করার ঘটনাও ঘটেছে। অর্থাৎ একদিকে হাউসবোটগুলোর আইন না মানার প্রবণতা এবং এর বিপরীতে কর্তৃপক্ষীয় প্রতিকারমূলক ব্যবস্থার উপস্থিতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। আমরা বিশ^াস করি আইন অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া গ্রহণ ব্যতিরেকে তাদের আইন মানতে বাধ্য করা সম্ভব নয়। কর্তৃপক্ষীয় প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের ধারাবহিকতা ও আন্তরিক প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকলে একসময় হাউসবোটগুলোও আইন মানার অভ্যাস রপ্ত করতে বাধ্য হবে।

 

 

তবে টাঙ্গুয়ার হাওরে প্রতিদিন যে পরিমাণ হাউসবোট ও অন্যান্য নৌযান যাতায়াত করে তার প্রেক্ষিতে তদারকি ব্যবস্থাকে যথেষ্ট বলার কোনো অবকাশ নেই। টাঙ্গুয়ার হাওরকেন্দ্রিক পর্যটন এখন মোটামুটি খ্যাতি অর্জন করেছে। সারা দেশ থেকেই  পর্যটকরা এই এলাকায় নিয়মিতভাবে আসেন। সুতরাং এই পর্যটন স্পটকে কেন্দ্র করে সরকারের একটি নিয়মিত ও স্থায়ী তদারকি কাঠামো তৈরি করা উচিৎ বলে আমরা মনে করি। দৈনন্দিন অতিরিক্ত ও বহুমুখী কাজের চাপে ন্যুব্জ প্রশাসনকে একতরফাভাবে প্রতিকারের দায়িত্ব দিয়ে রাখার যৌক্তিকতাও বিবেচনা করা উচিৎ। ছুটির দিনে গড়ে দুই শ’র বেশি হাউসবোট টাঙ্গুয়ার হাওর এলাকায় অবস্থান করে। একটি হাউসবোটে যদি ৫০ জন করে যাত্রী থাকেন তাহলেও পর্যটকের সংখ্যা দাঁড়ায় ১০ হাজার। অন্যান্য ছোট নৌকা বা যানবাহনের মাধ্যমে যাওয়া পর্যটকের সংখ্যাও অনেক। এতো পর্যটকের জন্য সংশ্লিষ্ট পর্যটনস্পটগুলোতে সব ধরনের ব্যবস্থাদি নিশ্চিত করা না গেলে পরিবেশ দূষণের মাত্রা কমানোর প্রত্যাশা করা ঠিক হবে না। হাউসবোট বা অন্যরা আইনপ্রয়োগকারীর অনুপস্থিতির সুযোগ নিয়ে আইন অমান্য করবেনই। সুতরাং সময় এসেছে টাঙ্গুয়ার হাওরের পর্যটনকে একটি বিধিবদ্ধ সংস্থার আওতায় এনে জোরদার তদারকি ব্যবস্থা চালু করার। 
পর্যটন শিল্পের বিকাশ, সম্প্রসারণ ও উন্নয়নের জন্য বাংলাদেশ পর্যটন কর্পোরেশন নামের একটি সরকারি প্রতিষ্ঠান আছে। আমরা যতদূর জানি টাঙ্গুয়ার হাওরকে এখনও পর্যটন কর্পোরেশন পর্যটন এলাকা হিসাবে তালিকাভুক্ত করেনি। টাঙ্গুয়ার হাওরের ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তা, আকর্ষণ, প্রাকৃতিক ও নৈসর্গিক সৌন্দর্য, হাওরের অনিন্দ্যশোভা  মিলিয়ে টাঙ্গুয়ার হাওরের যে পর্যটন—পরিচয় তৈরি হয়েছে তাতে এটি কর্পোরেশনের তালিকাভুক্ত না হওয়ার কোনো কারণ নেই। টাঙ্গুয়ার হাওর পর্যটন এলাকাকে বাংলাদেশ পর্যটন কর্পোরেশনের আওতায় দেয়া হলে এখানে পর্যটন—বান্ধব ব্যবস্থাদি তৈরি হওয়ার সুযোগ থাকতো। পর্যটনসম্পদ সংরক্ষণ ও উন্নয়নে এই কর্পোরেশনের দায়িত্ব আছে। তখন এখানে একটি নিয়মিত তদারকি কাঠামোও দাঁড়িয়ে যেতো। এই প্রক্রিয়ায় টাঙ্গুয়ার হাওর পর্যটন এলাকায় পরিবেশ দূষণসহ এখন যত ধরনের আইন না মানার অভিযোগ শোনা যায় তা নিয়ন্ত্রণ করাও সহজ হতো বলে আমরা মনে করি। 

 


টাঙ্গুয়ার হাওর সুরক্ষা আদেশ অনুসারে এই হাওরের প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য ক্ষতির সব ধরনের কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ। এই হাওর দেশের কৃষিজ, উদ্ভিদজাত, মৎস্যজ সম্পদসহ নানাবিধ বৈচিত্রের ঐতিহ্য এবং  ইতিহাসে সমৃদ্ধ। সম্পদশালী ও সম্ভাবনায় প্রাচুর্যপূর্ণ এই হাওরের পরিবেশ—প্রতিবেশ টিকিয়ে রাখতে আমরা জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে অঙ্গীকারবদ্ধ। সুতরাং এই হাওরে অনিয়ন্ত্রিত পর্যটনের মাধ্যমে পরিবেশ, প্রতিবেশ, বাস্তুতন্ত্র ও উৎপাদনশীলতা নষ্ট হোক তা কখনও কাম্য নয়। অবশ্যই টাঙ্গুয়ার হাওরের পর্যটন প্রক্রিয়া তদারকির জন্য স্থায়ী কাঠামো দরকার। বিচ্ছিন্ন প্রচেষ্টা মধ্য দিয়ে খুব বেশি ফল লাভ করা সম্ভব হবে না।

সম্পাদকীয় থেকে আরো পড়ুন


সম্পাদক মণ্ডলীর উপদেষ্টা : স্বপন কুমার দেব, কুমার সৌরভ

সম্পাদক ও প্রকাশক : পঙ্কজ কান্তি দে

অনলাইন সম্পাদক : মাহবুবুল হাছান শাহীন

সম্পাদক কর্তৃক অক্ষর মুদ্রণ অফসেট প্রেস, জোয়াহের রাজা ট্রেড সেন্টার, পুরাতন বাসস্টেশন, সুনামগঞ্জ।

মোবাইল : ০১৭১৮৩৪৫৯৭৫

বিজ্ঞাপন : ০১৩২৫৪৬২৪৯৫

ই-মেইল : [email protected]

সুনামগঞ্জের খবর পরিবার