‘অভিযোগ পেলেই কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব’

প্রকাশিত: ২১ আগস্ট, ২০২৬ ০০:১২

বিদেশে পাঠানোর নামে দালালচক্রের প্রতারণা, অবৈধ পথে ইউরোপে যাওয়ার ঝুঁকি এবং দালালদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিয়ে ‘দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর’ এর নিয়মিত বিশেষ আয়োজন ‘খবরনামা’য় কথা বলেছেন পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) অ্যাডভোকেট মল্লিক মঈনুদ্দিন সোহেল। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন জাহাঙ্গীর আলম। সাক্ষাৎকারের গুরুত্বপূর্ণ অংশ নিচে তুলে ধরা হলো।

 


দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর: দালালদের বিরুদ্ধে নানাভাবেই বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় অভিযোগ আসছে, কিন্তু এদের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের ব্যবস্থা এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান নয়। তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের করণীয় কী?
অ্যাড. মল্লিক মঈনুদ্দিন সোহেল: আমাদের এলাকায় যারা বিদেশে যান, তাদের বেশির ভাগই দালালনির্ভর। তবে যারা দালালি করেন, তারা অনেক সময় ভুক্তভোগীর নিকটাত্মীয় বা ঘনিষ্ঠজন হওয়ায় সরাসরি আর্থিক লেনদেন থেকে নিজেদের কৌশলে দূরে রাখেন। ফলে মূল দালালদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা অনেকটা কঠিন হয়ে পড়ে। আরেকটি বিষয় হলো, ভুক্তভোগীরা যদি সঠিকভাবে অভিযোগ না করেন, তাহলে সরকার, রাষ্ট্র বা আইন প্রয়োগকারী সংস্থার পক্ষেও তাদের আইনের আওতায় আনা বেশ দুঃসাধ্য হয়ে পড়ে।

 


দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর: দালালদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইনে কী ধরনের ব্যবস্থা বা সুযোগ রয়েছে?
অ্যাড. মল্লিক মঈনুদ্দিন সোহেল: দালালদের বিষয়ে মানব পাচার আইনের ২০২৬ সালের অধ্যাদেশে কঠোর ব্যবস্থা রয়েছে। দালালসহ তৃতীয় পক্ষকেও এই আইনের আওতায় আনা যায়। তবে এ ক্ষেত্রে কিছু তথ্য—প্রমাণ এবং বিশেষ করে অর্থ লেনদেনের প্রমাণের প্রয়োজন হয়।
আমাদের দেশের অধিকাংশ প্রান্তিক জনগোষ্ঠী জীবিকার তাগিদে ও অর্থনৈতিক সচ্ছলতার আশায় বিদেশ যাওয়ার স্বপ্ন দেখেন। মানুষ যেভাবে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপে যাওয়ার চেষ্টা করছে, আমি মনে করি এটি অত্যন্ত দুঃসাহসিক ও ঝুঁকিপূর্ণ। তারপরও ইউরোপ যাওয়ার জন্য মানুষ একরকম মরিয়া হয়ে উঠেছে। বিপদ সম্পর্কে তারা সচেতন থাকলেও অনেক সময় সেটিকে গুরুত্ব দেয় না। আমরা উদ্বিগ্ন যে, আমাদের যুবক—তরুণরা অর্থ উপার্জনের আশায় পথে দুর্ঘটনার শিকার হয়ে প্রাণ হারাচ্ছে। এটি অত্যন্ত বেদনাদায়ক।

 


দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর: দালালদের বিরুদ্ধে আইন প্রয়োগ হলে শাস্তির বিধান কতদিন পর্যন্ত?
অ্যাড. মল্লিক মঈনুদ্দিন সোহেল: দালাল বা সহায়তাকারীদের বিরুদ্ধে মানব পাচার আইনে কঠোর শাস্তির বিধান রয়েছে। একজন মানব পাচারকারীর সর্বোচ্চ শাস্তি যাবজ্জীবন কারাদণ্ড। আর সংঘবদ্ধ মানব পাচারের ক্ষেত্রে মৃত্যুদণ্ডের বিধানও রয়েছে। এছাড়া অপরাধের ধরন অনুযায়ী ন্যূনতম পাঁচ বছর ও সাত বছর পর্যন্ত কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে। আইনে আরও বলা হয়েছে, যারা মূল অপরাধীর সঙ্গে সহযোগিতা করে, তারাও অপরাধ অনুযায়ী একইভাবে দণ্ডিত হতে পারে।

 


দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর: দালালদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে কী ধরনের আইনি উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে?
অ্যাড. মল্লিক মঈনুদ্দিন সোহেল: অভিযোগ প্রাপ্তির পর ভুক্তভোগীরা যদি অভিযোগ দেন, তাহলে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা দালালদের আইনের আওতায় আনতে কোনো দ্বিধা করবে না বলে আমি মনে করি। কারণ এগুলো অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয়— মানুষ পথে প্রাণ হারাচ্ছে এবং এই অপরাধ শুধু বাংলাদেশের ভেতরে নয়, বাইরেও সংঘটিত হয়, যা দেশের ভাবমূর্তিকেও প্রশ্নবিদ্ধ করে। সরকারি কর্তৃপক্ষ ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থা এ বিষয়ে অত্যন্ত কঠোর মনোভাব রাখেন এবং প্রতিটি দায়িত্বশীল কর্মকর্তা এটিকে গুরুত্বের সঙ্গে নেন।

 


দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর: দালালদের বিভিন্ন এলাকায় প্রকাশ্যে ঘোরাফেরার অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকায় কোনো দুর্বলতা আছে কি? দালালদের আইনের আওতায় আনতে সবচেয়ে জরুরি পদক্ষেপ কী হওয়া উচিত?
অ্যাড. মল্লিক মঈনুদ্দিন সোহেল: এ ব্যাপারে ভুক্তভোগী বা তাদের পরিবার অভিযোগ না করলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষে দালালদের আইনের আওতায় আনা অনেকটা দুঃসাধ্য। কারণ দালালদের চিহ্নিত না করা পর্যন্ত তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়াও কঠিন। ভুক্তভোগীরা যদি অভিযোগ করেন, তাহলে দালালরা অবশ্যই আইনের আওতায় আসবে বলে আমি বিশ্বাস করি। তবে দালালরা সাধারণত নিজেদের কোনো পদচিহ্ন রাখতে চায় না এবং নানা কৌশলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজর এড়িয়ে যায়। সঠিক ও কার্যকর তদন্ত হলে তাদের শনাক্ত করা সম্ভব।

 


দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর: একটু উদাহরণ দিলে ভালো হতো—কীভাবে তারা নিজেদের পদচিহ্ন রাখতে চায় না?
অ্যাড. মল্লিক মঈনুদ্দিন সোহেল: দালালরা সরাসরি কোনো আর্থিক লেনদেন বা চুক্তিতে স্বাক্ষর করে না; প্রয়োজনে তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে এসব কাজ করিয়ে নেয়। তারা অত্যন্ত কৌশলে নিজেদের আড়াল করে রাখে এবং কোনো প্রমাণযোগ্য চিহ্ন রেখে যেতে চায় না।

 


দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর: প্রয়োজনীয় প্রমাণ না থাকায় অনেক সময় ভুক্তভোগীরা আইনি প্রক্রিয়ায় যেতে পারেন না বা কাঙ্ক্ষিত সমাধান পান না। এ ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীদের জন্য কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া উচিত?
অ্যাড. মল্লিক মঈনুদ্দিন সোহেল: ভুক্তভোগীরা প্রথমেই অভিযোগ করেন না। এর একটি কারণ হলো, তারা আশা করেন—তাদের ছেলে বা স্বজন যদি শেষ পর্যন্ত গন্তব্যে পৌঁছাতে পারে, তাহলে ক্ষতিটা মেনে নেবেন। এবার না হলে পরবর্তীতে আবার পাঠানোর চেষ্টা করবেন। ফলে শুরুতেই অভিযোগ না আসায় বিষয়টি আইনগতভাবে সামনে আসে না।

 


দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর: যে সমস্ত তরুণরা রঙিন স্বপ্ন নিয়ে ইতালি বা গ্রিস যাওয়ার জন্য অবৈধ পথ অবলম্বন করছেন, তাদের উদ্দেশে আপনি কিছু বলুন।
অ্যাড. মল্লিক মঈনুদ্দিন সোহেল: আমি আমার তরুণ ভাইদের উদ্দেশে বলতে চাই— বিদেশ যাওয়ার এই আকাঙ্ক্ষা অনেকটা মরীচিকার পেছনে ছোটার মতো। এর পেছনে ছুটে জীবনকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলা কোনোভাবেই উচিত নয়। এর পরিবর্তে আমাদের দেশে যদি কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা যায়—আমি আমার বিদেশ ভ্রমণের অভিজ্ঞতা থেকে বলতে চাই, আমাদের দেশ অনেক ভালো। বিদেশ যেতে যে পরিমাণ অর্থ খরচ করতে হয়, সেই অর্থ জীবনে উপার্জন করাই অনেক সময় কঠিন হয়ে যায়। এই উপলব্ধিটা যদি আমরা তরুণ সমাজের মধ্যে তৈরি করতে পারি এবং বিদেশে একজন মানুষ যে পরিশ্রম করেন, তার অর্ধেক পরিশ্রমও যদি বাংলাদেশে করেন, তাহলে আমার বিশ্বাস, একজন তরুণ এখানেই সফল হতে পারবেন।

 


দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর: আপনাকে ধন্যবাদ, মূল্যবান সময় দেওয়ার জন্য। আশা করি, পাঠক ও দর্শকরা এই আলোচনার মাধ্যমে অনেক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর পেয়েছেন। আমরাও আশা করব, আমাদের তরুণরা যেন মরীচিকার পেছনে না ছুটে। রঙিন স্বপ্নের হাতছানিতে যেন কেউ দালালের খপ্পরে পড়ে নিজের জীবন, পরিবার ও ভবিষ্যৎ নষ্ট না করে। অর্থের পেছনে ছুটতে গিয়ে যেন কেউ নিজের জীবনকে ঝুঁকির মধ্যে না ফেলে— এটাই আমাদের প্রত্যাশা

উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন


সম্পাদক মণ্ডলীর উপদেষ্টা : স্বপন কুমার দেব, কুমার সৌরভ

সম্পাদক ও প্রকাশক : পঙ্কজ কান্তি দে

অনলাইন সম্পাদক : মাহবুবুল হাছান শাহীন

সম্পাদক কর্তৃক অক্ষর মুদ্রণ অফসেট প্রেস, জোয়াহের রাজা ট্রেড সেন্টার, পুরাতন বাসস্টেশন, সুনামগঞ্জ।

মোবাইল : ০১৭১৮৩৪৫৯৭৫

বিজ্ঞাপন : ০১৩২৫৪৬২৪৯৫

ই-মেইল : [email protected]

সুনামগঞ্জের খবর পরিবার