প্রকাশিত: ২১ আগস্ট, ২০২৬ ০০:১৫
‘সুনামগঞ্জের শান্তিগঞ্জে এসেছিলাম লিবিয়া থেকে গ্রিস যাওয়ার পথে নিখোঁজদের তথ্য নিতে। অথচ নিখোঁজদের পরিবারগুলো তথ্য তো দেবে দূরের কথা, কথাই বলতে রাজি হয়নি। কী আজব মানুষগুলো!’
চার দিন আগে সুনামগঞ্জের গণমাধ্যমকর্মী লিপসন আহমদ তাঁর ব্যক্তিগত ফেসবুক ওয়ালে এই পোস্টটি করেছিলেন। এর একদিন পর শান্তিগঞ্জের গণমাধ্যমকর্মী নোহান আরেফিন নেওয়াজও তাঁর ফেসবুক পোস্টে লিখেছেন, ‘দালালচক্রের ভয়ে প্রকাশ্যে কথা বলতে চাইছেন না পরিবারের সদস্য ও স্বজনরা। তাঁদের শঙ্কা, দালালদের বিরুদ্ধে মুখ খুললে নিখোঁজ স্বজনদের জীবিত উদ্ধারের পথ আরও কঠিন হয়ে যেতে পারে। তবে দুই দালালের নাম জানিয়েছেন অভিবাসন প্রত্যাশী রন্টু পাল ও আব্দুল করিমের স্বজনরা।’
দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর বৃহস্পতিবারের পত্রিকায় ওই দুই দালালের নাম প্রকাশ করে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। প্রশ্ন হচ্ছে, গণমাধ্যমের সাথে কেন মন খুলে কথা বলছেন না নিখোঁজদের পরিবারের সদস্যরা?
এমন প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে কথা বলেছি নিখোঁজ ব্যক্তিদের অন্যান্য আত্মীয়স্বজনের সাথে। জানতে চেষ্টা করেছি, কেন কুলুপ এঁটেছেন নিখোঁজ তরুণদের মা—বাবা থেকে শুরু করে আত্মীয়স্বজনও। নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন জানিয়েছেন, ছেলেগুলো এমনিতেই নিখোঁজ। কার কাছে আছে, কোথায় আছে—তা তাঁরা জানেন না। যদি তাঁরা বেঁচে থাকেন, তাহলে তাঁদের উদ্ধারে ‘মধ্যস্থতাকারী’ বা দালালের সহযোগিতা প্রয়োজন হবে। এরমধ্যে যদি তাঁদের নামে নেতিবাচক কথাবার্তা বলা শুরু হয়, তাহলে দালালরা ছেলেগুলোর খোঁজখবর নেবে না, এমনকি কোনো ধরনের সহযোগিতাও করবে না।
পরিবারগুলোর সাথে দালালদের এমন প্রতিশ্রুতিও রয়েছে যে, কোনো অসুবিধা হলে কিংবা ‘গেম’ বাতিল বা নষ্ট হলে তৃতীয় পক্ষের কাছে গচ্ছিত মোটা অঙ্কের টাকা ফেরত দেওয়া হবে। কথা বলা শুরু করলে কেউ মারা গিয়ে থাকলে ‘কনট্রাক্টের’ টাকা ফেরত পাওয়াও অনিশ্চিত হয়ে পড়বে বলে আশঙ্কা করছেন স্বজনরা।
অন্যদিকে, গত বুধবার থেকে একটি খবর ছড়িয়ে পড়েছে যে, নিখোঁজদের কারও কারও সন্ধান পাওয়া গেছে। তাঁদের ফিরিয়ে আনতে এবং চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে সব ধরনের সহযোগিতার প্রতিশ্রুতিও দিচ্ছে দালালরা।
এসব দিক বিবেচনা করেই দালালদের নাম বলতে দ্বিধা করছেন অভিভাবকরা। একজন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘আমাদের ছেলেগুলো মহাবিপদে আছে। জীবিত না মৃত অবস্থায় আছে, তাও জানি না। যদি তারা বেঁচে থাকে তাহলে আমরা দালালদের পায়ে ধরে হলেও জীবিত অবস্থায় ছেলেদের উদ্ধার করে দেশে নিয়ে আসতে পারলেই শুকরিয়া। নামধাম বলার সময় এখন নয়। তবে কথাবার্তায় বা আচরণে ব্যত্যয় ঘটলে তখন আমরা আপনাদের (গণমাধ্যমকর্মীদের) সবকিছু বলব।’
পুলিশ ও উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কাছেও মুখ খুলছেন না অভিভাবকরা। তাঁরা বলছেন, তাঁদের সন্তানরা সাগর পাড়ি দিয়ে অবৈধভাবে গ্রিসের উদ্দেশ্যে পাড়ি জমিয়েছিল—এটি ঠিক। কিন্তু চুক্তিটা তাঁদের সন্তানরাই করেছিল। তাঁরা কিছুই জানেন না। তাঁরা শুধু টাকা দিয়েছেন। কাকে টাকা দিয়েছেন, তা—ও স্পষ্ট করে বলছেন না। এ কারণে প্রশাসনও জোরালোভাবে কাজ করতে পারছে না।
সুনামগঞ্জ জেলা কর্মসংস্থান ও জনশক্তি অফিসের সহকারী পরিচালক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মো. নাজমুস সাকিব বলেন, দালালচক্র ভিকটিমের পরিবারকে এক ধরনের ফাঁদে ফেলে মুখ বন্ধ রাখতে বাধ্য করছে। এখানে আমাদের আসলে কিছু করারও থাকে না। যেমন ধরুন, বৈধ পথে মধ্যপ্রাচ্যে যাওয়ার জন্য আমাদের জেলার ১৩ হাজার ২৪০ জন লোক ফিঙ্গারপ্রিন্ট রেজিস্ট্রেশন করেছেন। তাঁদের প্রায় সবাই প্রবাসে যাবেন বা গিয়েছেন। তাঁদের কোনো সমস্যা হলে আমরা দেখতে পারি। কিন্তু অবৈধ পথে যারা যান, তাঁদের আমরা চাইলেও দেখতে পারি না। এই পথ ভয়ংকর মৃত্যুফাঁদ। এজন্য সচেতনতা বাড়াতে হবে। এভাবে যাওয়ার পথ থেকে মুখ ফিরাতে হবে। শরীরের শক্তি দিয়ে নয়, বুদ্ধির জোরে ইউরোপে যেতে হয়। তারা কথা না বললে এই চক্র আরও সাহস পাবে।
শান্তিগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হিল্লোল চাকমা বলেন, কাউকে কিছু না জানিয়ে আমি এবং শান্তিগঞ্জ থানার ওসি অলী উল্লাহ সাহেব পূর্ব পাগলা ইউনিয়নের নিখোঁজ ব্যক্তিদের পরিবারের কাছে গিয়েছিলাম। কথা বলে তেমন কিছু উদ্ধার করতে পারিনি। তারা কোনো ধরনের সহযোগিতামূলক বক্তব্য দেননি। তারা যদি সহযোগিতা না করেন, তাহলে আমরা কতটুকু ফলপ্রসূ কাজ করতে পারব, তা তো আপনারা বুঝতেই পারছেন।
ইউএনও বলেন, ভুক্তভোগীরা জানিয়েছেন, ১২ লাখ টাকার বিনিময়ে তাঁদের ছেলে কনট্রাক্ট করেছে। কিন্তু কীভাবে করল বা গেল, তা তারা জানেন না। মূলত তাঁরা আমাদের তথ্যই দিতে রাজি নন। এখানে তারা আরেক প্রলোভনে পড়েছেন। দালালরা সম্ভবত তাদের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে যে, তাদের ছেলেদের ফিরিয়ে দেবে। হতে পারে হুমকি, ভয়ভীতি কিংবা অন্য কোনো কিছু। এজন্য মুখ খুলছেন না। এই মুখ না খোলা আরো বড় বিপদ ডেকে আনতে পারে।
শান্তিগঞ্জ থানার ওসি ওলী উল্লাহ বলেন, এখনো পর্যন্ত কোনো অভিযোগ আমরা পাইনি। অভিভাবকদের কাছে গিয়ে অনেক বুঝিয়েও তথ্য নেওয়া যাচ্ছে না। তারা দালালদের দিকে চেয়ে আছেন। সন্তানের জীবন ও ভবিষ্যৎ নিয়ে তারা নিদারুণ বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছেন। তবে এ ধরনের কর্মকাণ্ড অবৈধ পথে ইউরোপ যাওয়াকে আরও উৎসাহিত করবে। তাদের উচিত পুলিশকে তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করা। আমরা তাঁদের নাম—পরিচয় গোপন রাখব।
উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন