প্রকাশিত: ২১ আগস্ট, ২০২৬ ২৩:৪৯
প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসছে নানা কিংবদন্তি
দিরাই উপজেলার জগদল ইউনিয়নের সিংহনাদ গ্রামে কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে বিশাল আকৃতির একটি প্রাচীন বৃক্ষ। স্থানীয়দের কাছে এটি ‘বুড়া ঠাকুর’ কিংবা ‘পাঁচগাছি’ নামে পরিচিত। শত বছরের পুরোনো এই বৃক্ষকে ঘিরে রয়েছে ধর্মীয় আচার, পূজা, মানত, মেলা এবং নানা লোককথা। এসব বিশ্বাস ও কিংবদন্তির কারণে গাছটি স্থানীয়দের পাশাপাশি দূর—দূরান্তের মানুষের কাছেও কৌতূহলের কেন্দ্র হয়ে উঠেছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, প্রায় তিন কেদার জমিজুড়ে বিস্তৃত এই বৃক্ষের বয়স কত— তা সুনির্দিষ্টভাবে কেউ বলতে পারেন না। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে গাছটি একই এলাকায় দাঁড়িয়ে আছে। এর বিশাল শিকড়, বিস্তৃত ডালপালা ও আশপাশের পরিবেশ দেখে এর দীর্ঘ অস্তিত্বের ধারণা পাওয়া যায়। পালাক্রমে আশেপাশে গড়ে উঠেছে অসংখ্য হিজলবৃক্ষ।
.jpg)
বৃক্ষটির মূল শিকড়ের পাশে রয়েছে একটি শিবলিঙ্গ। সেখানে নিয়মিত ভক্তরা পূজা—অর্চনা, প্রার্থনা ও মানত করেন। স্থানীয়দের দাবি, শুধু দিরাই বা সুনামগঞ্জ নয়, দেশের বিভিন্ন স্থান থেকেও মানুষ এখানে আসেন মানত ও পূজা দিতে।
স্থানীয় বাসিন্দা রাবেন্দ্র তালুকদার বলেন, বুড়া ঠাকুরকে ঘিরে এলাকার মানুষের বিশ্বাস অনেক পুরোনো। ছোটবেলা থেকেই দেখে আসছি, দূর—দূরান্তের মানুষ এখানে এসে মানত করেন। মানত পূরণ হলে অনেকে আবার এসে পূজা দেন। এই বিশ্বাস আমাদের পূর্বপুরুষদের সময় থেকেই চলে আসছে।
কখনো পাঁচ, কখনো ছয়— রহস্যময় পাথর
বৃক্ষটির আশপাশে থাকা কয়েকটি পাথর নিয়েও স্থানীয়দের মধ্যে নানা কৌতূহল রয়েছে। কেউ কেউ দাবি করেন, কোনো সময় সেখানে পাঁচটি পাথর দেখা যায়, আবার কখনো সংখ্যা বেড়ে ছয়টি হয়। এসব পাথর কোথা থেকে এসেছে বা সংখ্যার এমন পরিবর্তনের কারণ কী — তার কোনো নিশ্চিত ব্যাখ্যা স্থানীয়দের জানা নেই।
স্থানীয় লিলু বিশ্বাস বলেন, ছোটবেলা থেকেই পাথরগুলোর কথা শুনে আসছি। কখনো পাঁচটা, কখনো ছয়টা দেখা যায় — এমন কথাই মানুষ বলে।
‘বুড়া ঠাকুর’ গাছের পেছনেই রয়েছে একটি বড় বিল। এই বিলকে ঘিরেও স্থানীয়দের মধ্যে প্রচলিত রয়েছে নানা পুরোনো কাহিনি। গ্রামের প্রবীণদের মুখে শোনা যায়, একসময় বিলের পানিতে নাকি সিন্দুক ভেসে উঠত। কথিত আছে, এসব সিন্দুকের ভেতরে ছিল সোনার তৈরি বিভিন্ন পূজার সামগ্রী।
গ্রামের জুয়েল দাস রায় বলেন, গাছটির বয়স সঠিক করে বলা সম্ভব নয়। আমাদের বাবা—ঠাকুরদারাও এর বয়স সম্পর্কে বলতে পারেননি। আগের প্রজন্মের মানুষের কাছ থেকে বিলের সিন্দুকের গল্প শুনেছি। বলা হতো, পানিতে কখনো কখনো সিন্দুক ভেসে উঠত। পূজা দিতে আসা ভক্তদের প্রয়োজনীয় বাসন না থাকলে, মহিলারা উলু ধ্বনি দিলেই পানিতে তা ভেসে উঠত— এমন গল্পও শুনেছি। তবে এসব আমরা নিজের চোখে দেখিনি। বহুদিন ধরে মানুষের মুখে মুখে গল্পগুলো চলে আসছে।
স্থানীয়দের এসব বক্তব্যের কোনো স্বাধীন ঐতিহাসিক প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তাই সিন্দুক, সোনার পূজাসামগ্রী কিংবা পানিতে বাসন ভেসে ওঠার বিষয়গুলোকে লোককথা ও স্থানীয় কিংবদন্তি হিসেবেই দেখছেন অনেকে।
‘বুড়া ঠাকুর’ কে ঘিরে স্থানীয়ভাবে রয়েছে নিয়মিত ধর্মীয় আয়োজনও। বেণু মাধব তালুকদার জানান, প্রতি বছর চৈত্র মাসের প্রথম রবিবার এখানে মহাদেবের পূজা অনুষ্ঠিত হয়। এ উপলক্ষে বসে বড় মেলা। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে ভক্ত ও দর্শনার্থীরা এতে অংশ নেন।
তিনি বলেন, মেলা উপলক্ষে গাছটির সামনের বিশাল মাঠজুড়ে বিভিন্ন ধরনের দোকানপাট বসে। শিশু—কিশোরসহ নানা বয়সী মানুষের উপস্থিতিতে পুরো এলাকা উৎসবমুখর হয়ে ওঠে। মেলার অন্যতম আলোচিত আয়োজন হলো পাঠা বলি। স্থানীয় ধর্মীয় রীতি ও বিশ্বাস অনুসরণ করে অনেক ভক্ত মানত পূরণের অংশ হিসেবে পাঠা নিয়ে আসেন।
নিয়মিত ভক্ত জিবেশ বৈদ্য বলেন, চৈত্র মাসের প্রথম রবিবারের মেলাটি আমাদের কাছে বিশেষ দিন হিসেবেই চলে আসছে। এটি শুধু পূজা নয়, মানুষের মিলনমেলাও। দূর—দূরান্তের আত্মীয়স্বজন ও ভক্তরা এ সময় এখানে আসেন।
শতবর্ষী এই বৃক্ষের বয়স, পাথরের সংখ্যা পরিবর্তন কিংবা বিলের সিন্দুকের গল্প— এসবের কোনো নির্ভরযোগ্য বৈজ্ঞানিক বা ঐতিহাসিক ব্যাখ্যা এখনো পাওয়া যায় নি। তবে স্থানীয় মানুষের দীর্ঘদিনের বিশ্বাস, ধর্মীয় আচার ও লোককথার সঙ্গে মিশে ‘বুড়া ঠাকুর’ আজ সিংহনাদ গ্রামের একটি পরিচিত ঐতিহ্য ও কৌতূহলের স্থান হিসেবে টিকে আছে।
উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন