‘সচেতনতা ও তদারকির সমন্বয়েই নিরাপদ হবে হাওর ভ্রমণ’

প্রকাশিত: ২২ আগস্ট, ২০২৬ ২৩:১৪

চলতি মৌসুমে টাঙ্গুয়ার হাওরে হাউসবোট থেকে পানিতে পড়ে একাধিক পর্যটকের প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ১১ দফা নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও তা যথাযথ পালন না হওয়া এবং নজরদারির অভাব নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরের নিয়মিত বিশেষ আয়োজন ‘খবরনামা’—য় টাঙ্গুয়ার হাওরে পর্যটক নিরাপত্তা, হাউসবোট দুর্ঘটনা ও জেলা প্রশাসনের ১১ দফা নির্দেশনা বাস্তবায়ন নিয়ে আলোচনা হয়েছে। সহকারী সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলমের সঞ্চালনায় এই আয়োজনে অতিথি ছিলেন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) তাপস শীল। কথা প্রসঙ্গে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক তাপস শীল স্পষ্ট করেন যে, হাওরে পর্যটন ব্যবসাকে উৎসাহিত করার পাশাপাশি পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই জেলা প্রশাসনের প্রধান অগ্রাধিকার। সাক্ষাৎকারের গুরুত্বপূর্ণ অংশ নিচে তুলে ধরা হলো

 

প্রশ্ন: টাঙ্গুয়ার হাওরে হাউসবোট পরিচালনার ক্ষেত্রে পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জেলা প্রশাসনের কী কী শর্ত রয়েছে এবং সেগুলো মানা হচ্ছে কি না?
তাপস শীল: পর্যটকদের নিরাপত্তার বিষয়টি বহুমাত্রিক। একটি বিষয় হলো পর্যটন এলাকায় নিরাপত্তা, অন্যটি হাউসবোটে অবস্থানকালে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। টাঙ্গুয়ার হাওর একটি প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা হওয়ায় পর্যটকদের নিরাপত্তা ও পরিবেশ সুরক্ষার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে সম্প্রতি জেলা প্রশাসন ১১ দফা নির্দেশনা জারি করেছে।
নির্দেশনা বাস্তবায়নে জেলা প্রশাসন, উপজেলা প্রশাসন, পুলিশসহ সংশ্লিষ্টরা সম্মিলিতভাবে কাজ করছে। জনসচেতনতামূলক লিফলেট বিতরণ, বিলবোর্ড স্থাপন, মাইকিং এবং হাউসবোট মালিক সমিতির মাধ্যমে নির্দেশনা পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি নিয়মিত অভিযান ও ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে বিভিন্ন হাউসবোটকে অর্থদণ্ড দেওয়া হয়েছে এবং প্রয়োজনীয় নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে।


সম্প্রতি শিশুদের কয়েকটি দুর্ঘটনার ঘটনা অত্যন্ত দুঃখজনক। হাউসবোটে অবস্থানকালে শিশু নিখোঁজ, পানিতে পড়ে যাওয়া এবং ইঞ্জিনবোটে দুর্ঘটনার ঘটনা ঘটেছে। এসব ক্ষেত্রে প্রশাসনের পাশাপাশি অভিভাবকদেরও সতর্ক থাকতে হবে। ছোট শিশুদের সর্বক্ষণ নজরদারিতে রাখা জরুরি। সামান্য অসচেতনতায় আনন্দের ভ্রমণ মুহূর্তেই বিষাদে পরিণত হতে পারে।

 


প্রশ্ন: প্রশাসনের পক্ষ থেকে নানা নির্দেশনা ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনার পরও দুর্ঘটনা কমছে না। এ ক্ষেত্রে নতুন কোনো পরিকল্পনা রয়েছে কি?
তাপস শীল: আপনারা সঠিক বিষয়টিই তুলে ধরেছেন। নির্দেশনা দেওয়া এবং প্রচারণা চালানোর পরও দুর্ঘটনা পুরোপুরি কমছে না। এর অন্যতম কারণ হলো টাঙ্গুয়ার হাওরে বিভিন্ন দিক দিয়ে হাউসবোট প্রবেশ করে। আনোয়ারপুর ঘাট, মধ্যনগর, জামালগঞ্জ ও ধর্মপাশাসহ বিভিন্ন পথ দিয়ে হাউসবোট আসে। একটি নির্দিষ্ট প্রবেশপথ থাকলে প্রতিটি হাউসবোট পরীক্ষা করে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া সহজ হতো।

 


ভবিষ্যতের জন্য কিছু পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। সচেতনতামূলক প্রচারণা আরও বাড়ানো হবে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও কমিউনিটির মানুষকে এ কার্যক্রমে সম্পৃক্ত করা হবে। পর্যটন মৌসুম শুরুর আগেই হাউসবোট মালিকদের নিয়ে কর্মশালার আয়োজন করা হবে, যাতে তারা আগে থেকেই নিরাপত্তার বিষয়গুলো সম্পর্কে জানতে পারেন।
নিবন্ধিত হাউসবোট ছাড়া অন্য হাউসবোটের প্রবেশ নিয়ন্ত্রণের বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে। নির্ধারিত মানদণ্ডের বাইরে যেসব হাউসবোট পরিচালিত হয়, সেগুলো অনেক সময় ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে। নিয়ম না মানলে আইনগত ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে।

 

ছুটির দিনগুলোতে টাঙ্গুয়ার হাওরে ২০০ থেকে ২৫০টিরও বেশি হাউসবোট থাকে। এত বিপুলসংখ্যক হাউসবোট কোনো একটি সংস্থার একার পক্ষে তদারকি করা সম্ভব নয়। এ জন্য প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, সংশ্লিষ্ট সংস্থা, হাউসবোট মালিক ও স্থানীয় জনগণকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে।
প্রশ্ন: হাউসবোটে লাইফ জ্যাকেট থাকার কথা থাকলেও অনেক সময় পর্যটকরা তা ব্যবহার করেন না। শিশুদের দুর্ঘটনা রোধে এ বিষয়ে কী করা যেতে পারে?
তাপস শীল: অনেক হাউসবোটে লাইফ জ্যাকেট রয়েছে, কিন্তু সেগুলো অনেক সময় শুধু রাখার জন্যই রাখা হয়। পর্যটকদেরও এ বিষয়ে সচেতন করতে হবে। হাউসবোটে ওঠার শুরুতেই পর্যটকদের নিরাপত্তা নির্দেশনা দেওয়া উচিত।


আমরা দেখি, পর্যটকরা পানিতে নামার সময় লাইফ জ্যাকেট ব্যবহার করলেও হাউসবোটে অবস্থানকালে তা ব্যবহার করেন না — স্বাচ্ছন্দ্যের কথা ভেবে। কিন্তু এই অসচেতনতার সুযোগেই দুর্ঘটনা ঘটতে পারে, বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে। তাই লাইফ জ্যাকেট ব্যবহারের প্রবণতা বাড়াতে হবে এবং দুর্ঘটনা রোধে সবার সম্মিলিত সচেতনতা প্রয়োজন।

 


প্রশ্ন: টেকেরঘাটের পাশে হাউসবোটগুলো যেখানে রাতযাপন করে, সেই স্থানটি পর্যটকদের জন্য কতটা নিরাপদ?
তাপস শীল: যেখানে হাউসবোটগুলো রাতযাপন করে, সেটি বর্তমানে নিরাপদ রয়েছে। সেখানে একটি পুলিশ ফাঁড়ি রয়েছে এবং অতিরিক্ত পুলিশ ও টুরিস্ট পুলিশও দায়িত্ব পালন করে। তবে ভবিষ্যতে যাতে কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা না ঘটে, সে জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে আরও সতর্ক ও দায়িত্বশীলভাবে কাজ করতে হবে।
প্রশ্ন: টাঙ্গুয়ার হাওরে হাউসবোটের ভাড়া নিয়ে পর্যটকদের অভিযোগ রয়েছে। একেকটি হাউসবোট একেক ধরনের ভাড়া নিচ্ছে। এ বিষয়ে প্রশাসনের কোনো উদ্যোগ আছে কি?
তাপস শীল: এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বর্তমানে হাউসবোটের কোনো নির্দিষ্ট ভাড়া কাঠামো নেই। বিভিন্ন হাউসবোট ৫ হাজার টাকা থেকে ২০ বা ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত বিভিন্ন হারে ভাড়া নির্ধারণ করছে। কী ভিত্তিতে এই ভাড়া নেওয়া হচ্ছে, সেটিও একটি প্রশ্ন। আমরা হাউসবোট মালিক সমিতির সঙ্গে বসার উদ্যোগ নিয়েছি। আলোচনা করে একটি যৌক্তিক ও সাশ্রয়ী ভাড়া কাঠামো নির্ধারণের চেষ্টা করা হবে, যাতে পর্যটকরা হয়রানির শিকার না হন।

 


তিনি বলেন, টাঙ্গুয়ার হাওরে পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে শুধু প্রশাসন বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর নির্ভর করলে হবে না। হাউসবোট মালিক, পর্যটক, অভিভাবক, স্থানীয় জনগণ এবং সংশ্লিষ্ট সব সংস্থাকে সম্মিলিতভাবে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। সচেতনতা ও কার্যকর তদারকির সমন্বয়ের মাধ্যমেই হাওর ভ্রমণকে আরও নিরাপদ করা সম্ভব।

উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন


সম্পাদক মণ্ডলীর উপদেষ্টা : স্বপন কুমার দেব, কুমার সৌরভ

সম্পাদক ও প্রকাশক : পঙ্কজ কান্তি দে

অনলাইন সম্পাদক : মাহবুবুল হাছান শাহীন

সম্পাদক কর্তৃক অক্ষর মুদ্রণ অফসেট প্রেস, জোয়াহের রাজা ট্রেড সেন্টার, পুরাতন বাসস্টেশন, সুনামগঞ্জ।

মোবাইল : ০১৭১৮৩৪৫৯৭৫

বিজ্ঞাপন : ০১৩২৫৪৬২৪৯৫

ই-মেইল : [email protected]

সুনামগঞ্জের খবর পরিবার