সাড়ে ৪ হাজার গাছে লোভের কুড়াল

প্রকাশিত: ২২ আগস্ট, ২০২৬ ২৩:৪১

সুনামগঞ্জ—সাচনা ১৯ কিলোমিটারের সড়ক। সড়ক ও জনপথ বিভাগের তত্ত্বাবধানে রয়েছে এই সড়ক। সড়কের প্রায় সাড়ে চার হাজার গাছ কর্তন শুরু করেছে বন বিভাগ। অথচ সড়ক ও জনপথ বিভাগ বলছে, ওখানে প্রশস্তকরণের কোন প্রকল্প তারা গ্রহণ করে নি। কেন গাছ কাটা হচ্ছে, এটি জানেন না তারা, তাদেরকে সিলেট বনবিভাগ থেকে একটি চিঠি দিয়ে কেবল গাছ কর্তন করা হবে এমনটি জানানো হয়েছে।

 

 


বন বিভাগরে এই অমানবিক কার্যক্রমে পুরো জেলাজুড়ে বৃক্ষপ্রেমি, পরিবেশকর্মীসহ বিভিন্ন পেশার মানুষেরা ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছেন। শনিবার ওই সড়কে ‘হাওর ও নদী রক্ষা আন্দোলন’ এর উদ্যোগে মানববন্ধন হয়েছে। মানববন্ধনকারীরা বলেছেন, ‘অবিলম্বে বৃক্ষ হত্যা বন্ধ না করলে, বন অফিস ঘেরাও করা হবে।’ সড়কের আশপাশের সাধারণ মানুষও বন বিভাগের এই কাজে ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছেন। বাড়ির পাশের ফলবৃক্ষ কর্তনে আফসোস করছেন তারা।

 

 


সড়কের পাশের ইচ্ছারচর গ্রামের মানিক মিয়া তার বাড়ির সামনের কেটে ফেলা জাম গাছটি দেখিয়ে বললেন, জায়গাটুকু সরকারি, কিন্তু জাম গাছটি আমি লাগিয়েছি। এলাকার শিক্ষার্থী, পথচারীরা এই গাছের ছায়া পেতেন, জাম মৌসুমে সকলে গাছ থেকে জাম নিয়ে খেতেন। গাছটি কাটার সময় আশপাশের সকলে মিলে বাধা দিয়েছি, তবুও তারা দুটি গাছ কেটেছে।
একই গ্রামের আবুল হোসেন বললেন, কোন কারণ ছাড়াই সড়কের পাশের শত শত গাছ তারা কেটে ফেলছে। শুনেছি আকাশমনি, রেইন্ট্রিসহ বিদেশী গাছ কাটার টেন্ডার হয়েছে। কিন্তু এরা অসংখ্য দেশী গাছও কেটে নিচ্ছে, কারও বাধা নিষেধ মানছে না বৃক্ষ কর্তনকারীরা।

 

 


সুনামগঞ্জ জেলা হাওর ও নদীরক্ষা আন্দোলনের পক্ষ থেকে শনিবার দুপুরে ওখানে মানববন্ধন করে ক্ষুব্ধ মানুষের সঙ্গে একাত্মতা পোষন করা হয়েছে। মানববন্ধনকারীরা বলেছেন, সড়কের ছায়বৃক্ষের মূল্য টাকার অংকে নির্ধারণ করাও যৌক্তিক নয়। মানুষের জীবন রক্ষায় এগুলো টিকে থাকা জরুরি। অথচ ৮৪ লাখ ৮০ হাজার টাকায় চার হাজার চারশ ৬৮ টি গাছ বিক্রয় করা হয়েছে। আমরা যদি টাকার অংকেও গাছের মূল্য বিবেচনা করি, তাতে কয়েক কোটি টাকার কাঠ হবে এসব গাছে। এখানেও সরকারকে ঠকানো হয়েছে।
সংগঠনের সভাপতি রাজু আহমেদ ও সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল হক বলেছেন, ২৪ ঘণ্টার মধ্যে বৃক্ষ নিধন বন্ধ না হলে বন অফিস ঘেরাও করা হবে।


স্থানীয়রা জানান, এই সড়কে ২০০৪ সালে সামাজিক বনায়নের আওতায় প্রায় ২০ হাজার গাছ লাগানো হয়। স্থানীয় উপকারভোগীরা দীর্ঘদিন এগুলো পরিচর্যা করেছেন। ২০২৪ সালে বন বিভাগ ওই সড়কের প্রায় তিন হাজার গাছ কাটার দরপত্র আহ্বান করেছিল। স্থানীয়দের প্রতিবাদে ওইসময় গাছগুলো কাটা হয় নি।

 

 


হাওর ও নদীরক্ষা আন্দোলনের সভাপতি রাজু আহমেদ বললেন, আমরা যেটুকু জানি ২০২৫ সালে হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশ (এইচআরপিবি) এর করা রিটের পর হাইকোর্ট ডিবিশনের একটি বেঞ্চ, সামাজিক বনায়ন বিধিমালা ২০০৪ এর আওতায় রোপণ করা গাছ না কেটে গাছের বাজারমূল্য নির্ধারণ করে নির্বাচিত উপকারভোগীদের অর্থ দেওয়ার বিধান বিধিমালায় যুক্ত করার নির্দেশ দেন। একই রায়ে সামাজিক বনায়নের গাছ কাটার ক্ষেত্রে জেলা প্রশাসকের নেতৃত্বাধীন সাত সদস্যের কমিটির অনুমোদনের বিষয়টিও এসেছিল।

 


সুনামগঞ্জ জেলা বন কর্মকর্তা রিয়াজ উদ্দিন শনিবার এই প্রতিবেদককে গাছ কাটার অনুমোদন জেলা কমিটিতে হয়েছিল বলে দাবি করেন। অন্যদিকে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মতিউর রহমান খান বলেছেন, বর্তমান জেলা প্রশাসকের সময়কালে অর্থাৎ গেল তিন চারমাসের মধ্যে এধরণের কোন অনুমোদন হয় নি। এর আগে হয়ে থাকলে কাগজ—ফাইল খুঁজে দেখতে হবে।
সড়ক ও জনপথ বিভাগের উপ—বিভাগীয় প্রকৌশলী সাজেদুর রহমান বললেন, ওই সড়ক প্রশস্তকরণের কোন প্রকল্প গ্রহণ করা হয় নি। গাছ কাটার বিষয়ে সড়ক বিভাগের কিছুই জানা নেই। বন বিভাগ থেকে ওখানে গাছ কাটার একটি দরপত্রের কপি কেবল তাদেরকে পাঠানো হয়েছে।

 

 


সিলেট বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মোহাম্মদ আবদুর রহমান বলেন, এই সড়কের পাশে সামাজিক বনায়নের আওতায় প্রায় সাড়ে চার হাজার গাছ রয়েছে। সামাজিক বনায়নের নিয়ম অনুযায়ী বাগানের বয়স ১০ বছর পূর্ণ হলে গাছ কর্তন করে সদস্যদের মধ্যে লভ্যাংশ বিতরণ এবং পরবর্তীতে পুনরায় বনায়ন করার বিধান রয়েছে। তিনি বলেন, সামাজিক বনায়নের সদস্যদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে গাছগুলো কর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে জাতীয় এবং স্থানীয় পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পাশাপাশি বিভাগীয় কমিশনার ও জেলা প্রশাসকের কার্যালয়সহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন স্থানে টেন্ডার প্রক্রিয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। সড়কের পাশে আকাশমণিসহ বিভিন্ন বিদেশি প্রজাতির গাছ রয়েছে। বন সংরক্ষণ আইন, ২০২৬ অনুযায়ী এসব গাছের পরিবর্তে নতুন করে দেশীয় প্রজাতির গাছ রোপণের উদ্যোগ নেওয়া হবে। 

 

 


ওই এলাকায় দেশীয় গাছও রয়েছে এবং সেগুলোও কাটা হচ্ছে, প্রতিবেদকের এমন প্রশ্নের জবাবে ওই কর্মকর্তা বললেন, দেশীয় প্রজাতির গাছ কাটা হবে না। 
সামাজিক বনায়নের গাছ না কেটে উপকারভোগীদের সরকার ক্ষতিপূরণ দেবে আদালতের এমন রায় প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বিষয়টি অন্ত:বর্তী সরকারের সময় আলোচনায় থাকলেও এখনো এই বিষয়ে সরকারের কোনো গেজেট বা চূড়ান্ত নির্দেশনা বনবিভাগ পায় নি। সরকার এধরনের কোনো নির্দেশনা দিলে বন বিভাগ তা অনুসরণ করবে।

উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন


সম্পাদক মণ্ডলীর উপদেষ্টা : স্বপন কুমার দেব, কুমার সৌরভ

সম্পাদক ও প্রকাশক : পঙ্কজ কান্তি দে

অনলাইন সম্পাদক : মাহবুবুল হাছান শাহীন

সম্পাদক কর্তৃক অক্ষর মুদ্রণ অফসেট প্রেস, জোয়াহের রাজা ট্রেড সেন্টার, পুরাতন বাসস্টেশন, সুনামগঞ্জ।

মোবাইল : ০১৭১৮৩৪৫৯৭৫

বিজ্ঞাপন : ০১৩২৫৪৬২৪৯৫

ই-মেইল : [email protected]

সুনামগঞ্জের খবর পরিবার