প্রকাশিত: ২২ আগস্ট, ২০২৬ ২৩:৩৮
একপাশে মেঘালয়ের পাহাড়, অন্যপাশে হিজল—করচের বন আর দিগন্তজোড়া স্বচ্ছ জলরাশি—প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে্যর অপরূপ আধার টাঙ্গুয়ার হাওর। দেশের দ্বিতীয় রামসার সাইট ও ইসিএ (প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা) ঘোষিত এই হাওর আজ মানবসৃষ্ট নানা সংকটে বিপন্ন। কেবল পরিবেশ বা জীববৈচিত্র্যই নয়, অনিয়ন্ত্রিত পর্যটন ও নৌযান চলাচলের কারণে হাওর এখন মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়েছে। শুক্রবার (২১ আগস্ট শুক্রবার) চলন্ত হাউসবোট থেকে নদীতে পড়ে রুকাইয়া নূর নামে ১০ বছরের এক শিশুর নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা হাওরের নিরাপত্তা ও ব্যবস্থাপনার ভঙ্গুর চিত্রটি আবারও নগ্নভাবে প্রকাশ্যে এনেছে।
পরিসংখ্যান বলছে, এটি কোনো বিচ্ছিন্ন দুর্ঘটনা নয়। চলতি বছরেই হাওরে অগ্নিকাণ্ড, মুখোমুখি সংঘর্ষ, ইঞ্জিনে কাটা পড়ে ও পানিতে ডুবে শিশুসহ বহু মানুষের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। একদিকে হাউসবোটের অনিয়ন্ত্রিত বৃদ্ধি, উচ্চশব্দে গান—বাজনা, যত্রতত্র প্লাস্টিক ও সেপটিক ট্যাংকের বর্জ্য ফেলা—অন্যদিকে নির্ধারিত নৌপথ না মেনে নৌযান চালানো, সব মিলিয়ে টাঙ্গুয়ার হাওরের ইসিএ নীতিমালা চরমভাবে লঙ্ঘিত হচ্ছে। প্রশাসন গত ২ আগস্ট হাওরের পরিবেশ ও পর্যটক নিরাপত্তায় ১৩ দফা নির্দেশনা জারি করলেও বাস্তবে কতটুকু কার্যকর তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
এছাড়াও সবচেয়ে আশঙ্কাজনক বিষয় হলো জরুরি উদ্ধার তৎপরতার অভাব। হাওরবেষ্টিত তাহিরপুর উপজেলায় ফায়ার সার্ভিস স্টেশন ও জনবল থাকলেও সেখানে কোনো ডুবুরি নেই। সুনামগঞ্জ জেলা সদর থেকে ডুবুরি দল পৌঁছাতে অন্তত তিন থেকে চার ঘণ্টা সময় লেগে যায়—যা একটি ডুবে যাওয়া জীবনের জন্য জীবন—মৃত্যুর ব্যবধান গড়ে দেওয়ার পক্ষে যথেষ্ট।
শুক্রবার রুকাইয়া নুর (১০) সহ প্রায় ২০ জন পর্যটক সাফিনা এ লাক্সারী ওয়াটার ভিলা হাউজবোটে করে মধ্যনগর থেকে যাদুকাটার উদ্দেশ্যে রওনা দেন। বিকাল ৩টায় পথে দক্ষিণকুল গোদারাঘাট এলাকায় বৌলাই নদীতে চলন্ত হাউসবোট থেকে হঠাৎ নদীতে পড়ে যায় রুকাইয়া নুর। এরপর থেকে তার কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি। নিখোঁজ রুকাইয়া নুর ফরিদপুরের কোতোয়ালি থানার গল চামোট ২ নম্বর সড়ক এলাকার ডা. শাহনুর রহমানের মেয়ে। শনিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত নিখোঁজ শিশুর সন্ধান পাওয়া যায় নি।
এরপর আবারও আলোচনায় হাউসবোটে নিরাপত্তার ইস্যু। প্রতিবছর হাজার হাজার পর্যটক এখানে ঘুরতে এলেও অনিয়ন্ত্রিত পর্যটন এখন এই জলাভূমির জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। অপরিকল্পিতভাবে হাউজবোট বৃদ্ধি, তীব্র শব্দদূষণ, প্লাস্টিক ও মানববর্জ্যের যথেচ্ছ ফেলা এবং দিন—রাত জেনারেটরের ব্যবহারে হাওরের পরিবেশ ও চরম জীববৈচিত্র্য সংকটে পড়েছে।
হাওরে ২০০টির বেশি হাউজবোট রয়েছে। পর্যটন মৌসুমে দেখা যায়, হাওরের বিভিন্ন অংশে সারি সারি হাউজবোট অবস্থান করছে। টাঙ্গুয়ার হাওরে পর্যটকদের নিয়ে যেতে নির্ধারিত নৌ—পথ ব্যবহার না করে অনেক সময় মাটিয়ান হাওরের বুক চিরে চলে একের পর এক বিলাসবহুল হাউসবোট। তাহিরপুর উপজেলার বড়দল গ্রামের মেশিনবাড়ি এলাকা দিয়ে এসব হাউসবোট মাটিয়ান হাওরে প্রবেশ করে, যায় টাঙ্গুয়ার হাওরের ওয়াচ টাওয়ারের দিকে। এতে হাওরের পরিবেশ, জলজ জীববৈচিত্র্য ও কৃষিজমি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
এর আগে চলতি বছর পর্যটন মৌসুমের শুরুতে গত ২৫ ফেব্রুয়ারি তাহিরপুর উপজেলার টাঙ্গুয়া হাওরগামী পর্যটকবাহী হাউসবোট ‘মাছরাঙা’য় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এ সময় হাউসবোটে কোনো পর্যটক না থাকায় প্রাণহানির ঘটনা ঘটেনি।
চলতি বছরের ৬ ফেব্রুয়ারি তাহিরপুরে নৌকাডুবিতে মানিক মিয়া (২১) নামে এক যুবক নিহত হন। ২৪ এপ্রিল উপজেলার বাদাঘাট ইউনিয়নের দশঘর গ্রামের রবি মিয়ার ছেলে আবু সুফিয়ান (১৪) যাদুকাটা নদীতে পানিতে ডুবে মারা যায়। ২৯ মে উপজেলার পাটলাই নদীতে বালিয়াঘাট গ্রামের তৌহিদ নূরের ছেলে ওবায়দুল (৬) পানিতে ডুবে মারা যায়। ৩১ মে পাঠলাই নদীতে ধর্মপাশা উপজেলা থেকে ৬০ জনের পর্যটকের দল টাঙ্গুয়ায় আসে, এসময় নৌকা থেকে পড়ে সুখাইর রাজাপুর ইউনিয়নের ঘলুয়া গ্রামের মুজিবুরের ছেলে তামিম ইসলাম (১৫) পানিতে ডুবে মারা যায়। ৯ জুন তাহিরপুর সদর ইউনিয়নের ধুতমা গ্রামের আবুল বাশারের স্ত্রী সুলতানা বেগম (২৪) মারা যায়। ৫ জুন টাঙ্গুয়ার হাওরে বেড়াতে গিয়ে প্রিমিয়াম ভ্রমণশৈলী হাউসবোটের মেশিনে পড়ে সৌম্যতা সরকার নিঝুম (৮) নামে এক শিশুর মর্মান্তিক মৃত্যু হয়। মেশিনের আঘাতে তার শরীর গুরুতরভাবে ক্ষতবিক্ষত হয় এবং ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু ঘটে। ১০ জুন তাহিরপুরে রক্তি নদীতে মালামালবাহী নৌকার সাথে হাউজবোটে ধাক্কাকে কেন্দ্র করে নৌকাতে থাকা দুইপক্ষের সংঘর্ষের ঘটনায় আমিন মিয়া (২৩) নামে এক নৌ—শ্রমিক নিহত হন। ২২ জুন তাহিরপুর উপজেলার বড়দল গ্রামের মাঝের খাল ভাঙনে ঘর ধসে রুবেল মিয়া (৩০) নামে এক মানসিক ভারসাম্যহীন যুবকের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। ৭ আগস্ট টাঙ্গুয়ার হাওরে গোসল করতে নেমে পানিতে ডুবে আলী আকবর খান (৭২) নামে এক পর্যটকের মৃত্যু হয়। নিহত আলী আকবর খান সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার মৃত আহম্মদ আলী খানের বড় ছেলে। ২১ আগস্ট তাহিরপুরে পানিতে পড়ে মানসিক প্রতিবন্ধি কাশেম মিয়া (৫৫) নামে এক ব্যক্তি নিখোঁজ হন। নিখোঁজ কাশেম মিয়া উপজেলার ৩নং বড়দল দক্ষিন ইউনিয়নের মাটিকাটা গ্রামের মিরু মিয়ার ছেলে।
প্রসঙ্গত, তাহিরপুর ও মধ্যনগর উপজেলায় প্রায় ১২ হাজার ৬৫৫ হেক্টর এলাকা নিয়ে বিস্তৃত টাঙ্গুয়ার হাওর। ২০০০ সালের ১০ জুলাই আন্তর্জাতিক গুরুত্বসম্পন্ন জলাভূমি হিসেবে এটি রামসার সাইটের স্বীকৃতি পায়। হাওরটি মিঠাপানির মাছ, জলজ উদ্ভিদ ও দেশি—বিদেশি পাখির গুরুত্বপূর্ণ আবাসস্থল। তবে বর্তমানে নিয়ন্ত্রণহীন পর্যটন ও পরিবেশ দূষণ এই জলাভূমির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। গত ২ আগস্ট ২য় দফায় জেলা প্রশাসন টাঙ্গুয়ার হাওরের পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য, প্রতিবেশগত ভারসাম্য ও পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে হাউসবোটের নিবন্ধনসহ ১৩ দফা নির্দেশনা জারি করে। এসব নির্দেশনা লঙ্ঘিত হলে আইনানুগ কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানানো হয়। এগুলো হলো— পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত টাঙ্গুয়ার হাওরের ইকোলজিক্যালি ক্রিটিক্যাল এরিয়া ঘোষিত সীমানায় সকল প্রকার হাউসবোট ও পর্যটকবাহী নৌযানের প্রবেশ ও চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ থাকবে। হাউসবোটে উচ্চস্বরে গান—বাজনা, মাইক বাজানো বা পার্টির আয়োজন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক বহন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। নৌযানে পানি বিশুদ্ধকারী ফিল্টার রাখতে হবে। এছাড়া হাউসবোটে বাধ্যতামূলকভাবে সেপটিক ট্যাংক ও অন্তত দুটি ডাস্টবিন স্থাপন করতে হবে; হাওর বা জলাশয়ে কোনো ধরনের বর্জ্য ফেলা যাবে না। হাউসবোটের দৈর্ঘ্য সর্বোচ্চ ১০০ ফুটের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে হবে। পর্যাপ্ত লাইফ জ্যাকেট, লাইফবয় রিং, অগ্নি—নির্বাপক যন্ত্র রাখা এবং গ্যাস সিলিন্ডারের নিরাপদ ব্যবহার নিশ্চিত করা বাধ্যতামূলক। পর্যটকদের জন্য আচরণবিধি দৃশ্যমান স্থানে প্রদর্শন করতে হবে এবং ট্যুর শুরুর আগেই তা পর্যটকদের অবহিত করতে হবে। এছাড়া জরুরি প্রয়োজনে যোগাযোগের জন্য জেলা/উপজেলা প্রশাসন, পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস ও হাসপাতালের নম্বর দৃশ্যমান স্থানে ঝুলিয়ে রাখতে হবে। প্রতিটি ট্যুরে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ায় পর্যটক পরিবহন সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ থাকবে। আকস্মিক ঝড়, প্রবল বৃষ্টিপাত বা বজ্রপাতের আশঙ্কাকালীন পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।
উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন