সংস্কারের পরও নাজুক দশা

প্রকাশিত: ২২ আগস্ট, ২০২৬ ২৩:৪০

বিভাগীয় শহর সিলেট ও রাজধানী ঢাকার সাথে জগন্নাথপুর ও বিশ্বনাথ উপজেলাবাসীর সড়ক যোগাযোগের অন্যতম প্রধান সড়ক হচ্ছে  জগন্নাথপুর বিশ্বনাথ রশিদপুর আঞ্চলিক সড়ক। সড়কের জগন্নাথপুর উপজেলা পৌর পয়েন্টের সামনে থেকে ঢাকা—সিলেট মহাসড়ককের রশিদপুর পর্যন্ত দূরত্ব ২৯ কিলোমিটার। জগন্নাথপুর ও বিশ্বনাথ উপজেলা অংশের দূরত্ব ২৬ কিলোমিটার। যা স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর এলজিইডির আওতাধীন। বিশ্বনাথের জিসি পয়েন্ট থেকে রশিদপুর পর্যন্ত ৩ কিলো ৭০০ মিটার সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের আওতাধীন। দীর্ঘদিন ধরে সড়কের এলজিইডির আওতাধীন অংশে জগন্নাথপুরের ১৩ কিলোমিটার ও বিশ্বনাথ উপজেলা অংশের ১৩ কিলোমিটার অংশ গর্ত খান্দাখন্দসহ দুর্ভোগের অন্ত নেই। অভিযোগ রয়েছে, জগন্নাথপুর অংশ সংস্কার হলে বিশ্বনাথ অংশ ভাঙাচোরা থাকে আবার বিশ্বনাথ উপজেলা অংশ ভালো থাকলে জগন্নাথপুর অংশ ভেঙে যায়। এসব দুর্ভোগ থেকে রেহাই পেতে ২০১৮ সালে দুই উপজেলাবাসী দাবি তুলেন সড়কটি স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর থেকে স্থানান্তর করে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের হস্তান্তরের। এই দাবির প্রেক্ষিতে তৎকালীন সুনামগঞ্জ—৩ আসনের সংসদ সদস্য সাবেক পরিকল্পনা মন্ত্রী এম এ মান্নান উদ্যোগ গ্রহণ করলে এলজিইডির তৎকালীন প্রধান প্রকৌশলী তাঁর সঙ্গে দেখা করে দুই উপজেলার অংশের কাজ মানসম্মত করার প্রতিশ্রম্নতি দিয়ে সড়কটি এলজিইডির আওতাধীন রাখার অনুরোধ করেন। যার প্রেক্ষিতে অতীতের সংস্কার বরাদ্দের সকল রেকর্ডভঙ্গ করে তৎকালীন সংসদ সদস্য ও পরিকল্পনা মন্ত্রী এম এ মান্নানের সুপারিশে ২০ শতাংশ অতিরিক্ত দরে ২৬ কিলোমিটার অংশের সংস্কারের জন্য ৪৮ কোটি ৫৬ লাখ টাকা বরাদ্দ দিয়ে টেন্ডার করা হয়। এর আগে ২০১৭ সালে সড়কের জগন্নাথপুর উপজেলা অংশে ১৩ কিলোমিটারের সংস্কার বরাদ্দ ছিল দুই কোটি ২৬ লাখ টাকা।
২০১৯ সালে ৪৮ কোটি টাকা বরাদ্দের মধ্যে জগন্নাথপুর উপজেলার ১৩ কিলোমিটারের জন্য ২৫ কোটি ৮ লাখ ৩৬ হাজার টাকায় কাজ পান মাদারীপুরের ঠিকাদার হামীম সালেহ জেভি আর বিশ্বনাথ উপজেলার ১৩ কিলোমিটারের জন্য ২৩ কোটি ২৫ হাজার টাকা মজ্ঞুর হয়। কাজ পায় ঠিকাদার শাওন এন্টারপ্রাইজ। 

 


মানসম্মত কাজের অঙ্গীকার নিয়ে ডাকঢোল পিটিয়ে ২০১৯ সালে ডিসেম্বর মাসে সড়কের দুই উপজেলা অংশের সংস্কার কাজ শুরু করে এলজিইডি। কাজের শুরুতেই গর্ত করে মেশিন দিয়ে সড়কের সব পাথর তুলে নেয়া হয়। এরপর বালু ও কংক্রিট ইটের খোয়া মিশিয়ে সড়কে ফেলে কার্পেটিং করা হয়। ঠিকাদার ও এলজিইডির দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা যোগসাজসে টেকসই সড়ক সংস্কারের নামে চলে লুটপাট। কাজ চলাকালেই অনিয়মের অভিযোগ উঠলে এলজিইডি কতৃর্পক্ষ আমলে না নিয়ে ঠিকাদারের পক্ষে অবস্থান নেয়। ঠিকাদার ও এলজিইডির কর্মকর্তারা সড়ক সংস্কারের নামে লুটপাটে মেতে উঠেন। 

 


ফলশ্রুতিতে কিছুদিন যেতে না যেতেই সড়কে ভাঙন দেখা দেয়। ২০২৩ সালে সড়কের কাজ শেষ হয়। তিন বছর যেত না যেতেই সড়কের ২৬ কিলোমিটার অংশের বেহাল দশা। এরমধ্যে আরও এক কোটি টাকার জরুরি সংস্কার কাজ করা হয়েছে। জগন্নাথপুর উপজেলা অংশে ৪০ লাখ টাকার আরসিসি ঢালাই ও ইট ফেলার কাজ করা হয়। বিশ্বনাথ উপজেলা অংশে আরও ৪০ লাখ টাকার জরুরি রক্ষণাবেক্ষণ হিসেবে সংস্কার কাজ করা হলেও কাজের কাজ কিছুই হয়নি। নতুন করে ইট ফেলে আবারো সংস্কার কাজ চলছে। 
সড়ক দিয়ে নিয়মিত চলাচলকারী যাত্রী জগন্নাথপুর বাজারের ব্যবসায়ী রজত গোপ বলেন, প্রায়ই নানা জরুরি কাজে সিলেট শহরে যেতে হয়। ভাঙাচোরা সড়ক দিয়ে একবার গেলে আরেকবার ফিরতে মন চায় না। সুস্থ মানুষরা অসুস্থ হয়ে যান আর অসুস্থ বৃদ্ধ মানুষের অবস্থা নাজুক হয়। 

 


জগন্নাথপুর বাস মালিক সমিতির সাবেক সভাপতি নিজামুল করিম বলেন, ২০১৮ সালে সড়কটি সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের হস্তান্তরের জোর দাবি জানানো হলেও লুটপাটের জন্য এলজিইডি সড়কটি ধরে রেখেছে। তিন বছর যেতে না যেতেই সড়কটির সাড়ে ৪৮ কোটি টাকার বেহাল দশা দুঃখজনক। তিনি বলেন, বাস চালকরা এসড়ক দিয়ে বাস নিয়ে চলাচল করতে চান না।
বিশ্বনাথ যানবাহন মালিক শ্রমিক সংগঠনের নেতা নজরুল ইসলাম জানান, আমরা সম্প্রতি জরুরি সভা করে অবিলম্বে সড়ক সংস্কার কাজ না হলে কঠোর আন্দোলন কর্মসূচি গ্রহণ করব বলে জানিয়েছি।
জগন্নাথপুর উপজেলা নাগরিক অধিকার ফোরামের আহ্বায়ক এম এ কাদির বলেন, সিলেটের গুরুত্বপূর্ণ দুই উপজেলা জগন্নাথপুর ও বিশ্বনাথ উপজেলাবাসীর প্রধান সড়ক জগন্নাথপুর বিশ্বনাথ রশিদপর সড়ক। টেকসই সড়ক সংস্কারের নামে বিশাল বরাদ্দ এনে  লুটপাটের ঘটনায় আমরা ব্যথিত। 

 


স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর এলজিইডির জগন্নাথপুর উপজেলা প্রকৌশলী সোহরাব হোসেন জানান, গুরুত্বপূর্ণ এ সড়কের জগন্নাথপুর অংশ সংস্কার কাজের মাধ্যমে সচল রাখা হয়েছে। তিনি জানান, এলজিইডির জেলা কার্যালয় থেকে প্রাপ্ত ইট ফেলে ছোট ছোট গর্ত ভরাট করা হয়েছে। এরআগে ৪০ লাখ টাকার আরসিসি ঢালাই কাজ করা হয়। 
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর এলজিইডির বিশ্বনাথ উপজেলা প্রকৌশলী মো. আবু সাঈদ বলেন  সড়কের গর্ত ভরাটের জন্য স্থানীয় সংসদ সদস্য ও  এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলীর পক্ষ থেকে কিছু ইট পাঠানো হয়েছে। সেগুলো দিয়ে আমরা (মোবাইল ম্যান্টেনিজ) জরুরি সংস্কার কাজ করছি। তিনি বলেন, সড়কের ৪ কিলোমিটার অংশের বেহালদশা হওয়ায় ৩ কোটি ৮০ লাখ টাকা বরাদ্দ চেয়ে অনুমোদনের জন্য পাঠানো হয়েছে। 

 


স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর এলজিইডির সুনামগঞ্জের নির্বাহী প্রকৌশলী আনোয়ার হোসেন জানান, জরুরি রক্ষণাবেক্ষণের অর্থ থেকে ইট দিয়ে গর্ত ভরাট করে সড়কটি জগন্নাথপুর উপজেলা অংশ যান চলাচলের উপযোগী করা হয়েছে। তিন বছর পর পর সংস্কার করার কথা থাকলেও বরাদ্দ না থাকায় নতুন কোন সংস্কার কাজ করা যাচ্ছে না। এক প্রশ্নের জবাবে ২৫ কোটি টাকা বরাদ্দের কাজ কেন তিন বছর টেকেনি জানতে চাইলে তিনি কাজে কোন অনিয়ম হয়নি বলে দাবি করেন। তিনি বলেন, আমি এ সময় দায়িত্বে ছিলাম না। আমার মনে হয় অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত ও অতিরিক্ত ভারী যানবাহনের চাপে সড়কে গর্তের সৃষ্টি হয়েছে।

 


স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর এলজিইডির সিলেটের নির্বাহী প্রকৌশলী মামুন খান বলেন, জগন্নাথপুর বিশ্বনাথ সড়কের গর্তগুলো ভরাট করতে জরুরি রক্ষণাবেক্ষণ থেকে ইট ফেলা হচ্ছে। কেন তিন বছরের মধ্যে সড়কটি এভাবে ভেঙে গেল খতিয়ে দেখা হবে। তিনি বলেন, নতুন করে সংস্কার কাজ করতে বরাদ্দ চেয়ে অনুমোদনের জন্য পাঠানো হয়েছে।

উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন


সম্পাদক মণ্ডলীর উপদেষ্টা : স্বপন কুমার দেব, কুমার সৌরভ

সম্পাদক ও প্রকাশক : পঙ্কজ কান্তি দে

অনলাইন সম্পাদক : মাহবুবুল হাছান শাহীন

সম্পাদক কর্তৃক অক্ষর মুদ্রণ অফসেট প্রেস, জোয়াহের রাজা ট্রেড সেন্টার, পুরাতন বাসস্টেশন, সুনামগঞ্জ।

মোবাইল : ০১৭১৮৩৪৫৯৭৫

বিজ্ঞাপন : ০১৩২৫৪৬২৪৯৫

ই-মেইল : [email protected]

সুনামগঞ্জের খবর পরিবার