প্রকাশিত: ২২ আগস্ট, ২০২৬ ২০:২৫
সরকারের সকল স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান ও হাসপাতালে শতভাগ হাজিরা নিশ্চিত করার নির্দেশ দিয়েছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, গতকাল দৈনিক যুগান্তরের এক সংবাদ থেকে এ তথ্য পাওয়া যায়। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক সরকারের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ পরিদর্শনকালে প্রদত্ত অনুশাসন বাস্তবায়নের বিষয়ে স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় গত ১৬ আগস্ট যে সভা করে সেই সভার নির্দেশনা অনুসারেই শতভাগ হাজিরা নিশ্চিতের এই নির্দেশনা এলো। এছাড়া সকল কর্মকর্তা—কর্মচারির ফেস রিকগনিশন বায়োমেট্টিক হাজিরা ব্যবস্থা প্রচলনের সিদ্ধান্তও নিয়েছে মন্ত্রণালয়। শতভাগ হাজিরা নিশ্চিত হয়ে সংশ্লিষ্টদের বেতন বিল অনুমোদনের জন্য আয়ন—ব্যয়ন কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। দেশের স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানগুলোতে মন্ত্রণালয়ের এই নির্দেশনার প্রভাব পড়লে সেবা ব্যবস্থার উল্লেখযোগ্য অগ্রগতির সম্ভাবনা আছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় যে নির্দেশনা দিয়েছে তা নতুন, অভিনব বা বিশেষ কোনোকিছু নয়। বিদ্যমান সরকারি প্রতিষ্ঠান ও কর্মচারি পরিচালনার বিভিন্ন আইন, বিধি—বিধানে এসব বিষয় পরিষ্কারভাবে উল্লেখ আছে। কোথাও এমন কোনো কথা নেই যা ব্যবহার করে কেউ অননুমোদিতভাবে অনুপস্থিত থেকে বেতন নিতে পারেন। তারপরেও নতুন করে পুরনো নিয়মের কথা বলতে হয় কেন ? এর কারণ আমাদের সংস্কৃতিতে আইন বা নিয়ম না মানার যে অভ্যাস তৈরি হয়েছে তাতে হরহামেশা নিয়মের ব্যত্যয় এবং নিয়ম না মেনে পার পেয়ে যাওয়ার হাজারটা ঘটনা ঘটতে দেখা যায়। সুনামগঞ্জ সদর ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতাল বা উপজেলা হাসপাতালগুলোতে অহরহ চিকিৎসক অনুপস্থিত থাকার ঘটনা ঘটে। পালাক্রমে সপ্তাহে দুইদিন করে দায়িত্ব পালনের খবরও পাওয়া যায়। সকলের শতভাগ উপস্থিতি প্রতি মাসে থাকে, এমন বাস্তবতার কথা কখনও কেউ বলতে পারবেন না। কিন্তু অনুপস্থিত থাকার কারণে কারও বিরুদ্ধে কোনোরূপ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে বলে জানা যায় না। অর্থাৎ অনিয়মই কিছু কিছু জায়গায় নিয়মে পরিণত হয়েছে। তাই সরকারি কর্মকর্তাদের শতভাগ উপস্থিতি নিশ্চিত করতে প্রধানমন্ত্রীর পৃথক অনুশাসন দিতে হয়, এজন্য মন্ত্রণালয়ের আলাদা সভা করে নির্দেশ জারি করতে হয়। এতেও যদি বিদ্যমান হতাশাজনক অবস্থার উন্নতি ঘটে তবেই সার্থকতা। আসলেই কি অবস্থার উন্নতি ঘটবে ?
বাংলাদেশের কোনো হাসপাতালই জনবলের দিক থেকে স্বয়ংসম্পূর্ণ নয়। সর্বত্র প্রচুর চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যসেবাকর্মীর সংকট রয়েছে। এর উপর হাসপাতালগুলোকে ধারণ ক্ষমতার অতিরিক্ত রোগীকে চিকিৎসা দেওয়ার দৈনন্দিন বাস্তবতা মোকাবিলা করতে হয়। কোনো কোনোদিন কোনো কোনো হাসপাতলে ধারণ ক্ষমতার দুই বা তিন গুণ অতিরিক্ত রোগীও ভর্তি থাকেন। এইসব রোগীর সুচিকিৎসা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় চিকিৎসক ও অন্যান্য জনবল না থাকায় এমনিতেই হিমশিম খাওয়ার অবস্থা। এর উপর যদি চিকিৎসক বা স্বাস্থ্যকর্মী অননুমোদিতভাবে অনুপস্থিত থাকেন তাহলে সংকট কোথায় গিয়ে পৌঁছে তা সহজেই অনুমেয়। যেখানে যতজন কর্মরত আছেন তাঁরা যদি সেবাধর্মী মনোভাব নিয়ে কাজ করতেন তাহলে আরোগ্য লাভের আশায় আগত রোগীরা কিছুটা ভরসা পেতেন। চিকিৎসা পেশাকে আর দশটা সাধারণ বৃত্তি ভাবার কোনো অবকাশ নেই। এখানে চিকিৎসককে রোগীরা জীবন বাঁচানোর অবলম্বন মনে করেন। যে পেশার সাথে অন্য বহু জনের জীবন ও সুস্থতার প্রশ্ন জড়িত সেখানে সেই পেশাকে ভিন্নতর মানবিক দিক থেকে গ্রহণ করতে হয়। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য আমাদের অনেক স্বাস্থ্যকর্মীই এমন সেবাধর্মী মনোভাব অর্জন করতে পারেননি।
হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে সকল কর্মকর্তা—কর্মচারির শতভাগ উপস্থিতি নিশ্চিত করার জন্য মন্ত্রণালয় যে নির্দেশনা জারি করেছে সেই শুভ উদ্যোগকে আমরা অভিনন্দন জানাই । এই নির্দেশনা কেবল একটি কাগজে সারিবদ্ধভাবে সাজানো কয়েকটি শব্দ বা বাক্যে সীমাবদ্ধ না থেকে যাতে অনুসরণ ও মেনে চলার দৃষ্টান্তে মহিমাময় হয়ে উঠে তাই আমাদের কাম্য। মনের ভিতর থেকে দেশ ও জাতির জন্য কিছু করার তাগিদ তৈরি করতে সরকারের প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে কাজ করতে হবে। প্রত্যেককে দেশ ও নাগরিকের প্রতি অঙ্গীকারাবদ্ধ করতে পারলে নুতন করে কোনো নির্দশনার প্রয়োজন হয় না। যে যার অবস্থান থেকে দেশ ও দশের জন্য কাজ করছেন আমরা ওই ধরনের বাংলাদেশ দেখতে চাই।
সম্পাদকীয় থেকে আরো পড়ুন