প্রকাশিত: ২৮ আগস্ট, ২০২৬ ২৩:৫৩
ব্যাংকের প্রথাগত শাখা নেই এমন এলাকার মানুষকে ব্যাংকিং সেবা দিতে এজেন্ট নিয়োগের মাধ্যমে কিছু ব্যাংক এজেন্ট ব্যাংকিং সেবার প্রসার ঘটিয়েছে। ব্যাংক কর্তৃক নিয়োগকৃত এজেন্ট সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের হয়ে নির্দিষ্ট ধরনের গ্রাহকসেবা দিয়ে থাকে। এজেন্ট ব্যাংকিংয়ে গ্রাহকদের সকল লেনদেনই সংশ্লিষ্ট ব্যংকের নামে হয়। সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন জায়গায় এজেন্ট ব্যাংকিং ব্যবস্থায় গ্রাহক ঠকানো ও প্রতারণার বেশ কিছু সংবাদ পাওয়া যাচ্ছে যা প্রচলিত ব্যাংকিং ব্যবস্থার দুর্বলতাকে প্রকটিত করছে।
গতকাল দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে প্রকাশিত একটি সংবাদ থেকে জানা যায়, জেলার দোয়ারাবাজার উপজেলার নরসিংপুর ইউনিয়নের ইসলামী ব্যাংকের এজেন্ট ব্যাংকিং শাখায় গ্রাহক প্রতারণার একটি বড় ও চাঞ্চল্যকর ঘটনা ঘটেছে। গত কয়েক মাস ধরে ইসলামী ব্যাংকসহ আরও কিছু ব্যাংক গ্রাহকদের জমানো টাকা চাহিদামাফিক ফেরৎ দিতে পারছে না বলে জনমনে গভীর উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা তৈরি করেছে। ব্যাংকের এই তারল্য সংকট দূর করতে বাংলাদেশ ব্যাংক নানবিধ উদ্যোগ গ্রহণ করে গ্রাহকস্বার্থ সংরক্ষণের ব্যবস্থা করছে। এই সময়ে এজেন্ট ব্যাংকিং প্রতারণা নতুন করে আবারও গ্রাহকদের আতঙ্কগ্রস্ত করে তোলল। নরসিংপুর ইউনিয়নের ইসলামী ব্যাংক এজেন্ট শাখায় সংঘটিত প্রতারণার ঘটনাগুলো সুপরিকল্পিত, অভিনব এবং পূর্বপ্রস্তুতি গ্রহণের মাধ্যমে ইচ্ছাকৃত অপরাধকাণ্ড। এমন কি এই প্রতারণায় অমানবিকতার চূড়ান্ত নিদর্শনের দেখাও মিলে। সংবাদভাষ্য অনুসারে ওই এজেন্ট শাখায় অস্বচ্ছল বৃদ্ধা সায়েদা বেগম ছেলের চিকিৎসার জন্য মানুষের নিকট থেকে সাহায্য হিসেবে তোলা ৬০ হাজার টাকা থেকে ৪০ হাজার টাকা জমা করেছিলেন উপযুক্ত সময়ে চিকিৎসাব্যয় মিটানোর জন্য। টাকা তুলতে গিয়ে এই অসহায় মহিলা জানতে পারেন তাঁর ব্যাংক হিসাবে কোনো স্থিতি নেই। উঠিয়ে নেয়া হয়েছে জমানো টাকা। ক্রন্দনরত এই বৃদ্ধা এখন জানতে চাচ্ছেন— জমানো টাকা ফেরৎ না পেলে অসুস্থ ছেলেকে বাঁচাবেন কী করে ? এই শাখা থেকে লক্ষ লক্ষ টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে বলে অভিযোগ করছেন গ্রাহকরা। গত বৃহস্পতিবার প্রতারিত গ্রাহকরা ব্যাংক শাখায় উপস্থিত হয়ে ভিড় করেন এবং অনেকেই নিজের হিসাব বিবরণী (স্টেটম্যান্ট) তোলে প্রতারণার মাধ্যমে টাকা উঠিয়ে নেয়ার বিষয় অবহিত হয়ে হতবাক হয়ে পড়েন। প্রতারণার ধরণ সম্পর্কে প্রতারিত এক নারী গ্রাহকের অভিজ্ঞতা বেশ চমকপ্রদ। তিনি বলছিলেন, লেনদেন করার সময় বারবার গ্রাহকের ফিঙ্গারপ্রিন্ট নেয়া হয়। ফিঙ্গারপ্রিন্ট ম্যাচ করছে না বলে অজুহাত দেয়া হয়। তিনি দু’টি ডিপিএস একাউন্টে তিন লাখ টাকা জমিয়েছিলেন, কিন্তু ওই একাউন্টে এখন মাত্র ৭ হাজার টাকা পড়ে আছে। ওই নারীর অভিজ্ঞতা থেকে বুঝা যায়, ‘আগেরটি হয়নি’ বলে একাধিকবার যে ফিঙ্গারপ্রিন্ট নেয়া হয় তার প্রতিটিই অর্থ উত্তোলনের প্রতারণায় কাজে লাগানো হয়। প্রতিটি লেনদেনের মাধ্যমে মোবাইলে এসএমএস আসার প্রক্রিয়াটিও বন্ধ করে দেয়া হয় যাতে প্রতারিত গ্রাহকরা প্রতারণার বিষয়টি তাৎক্ষণিকভাবে বুঝতে না পারেন। সাধারণ গ্রাহকদের পক্ষে ব্যাংকের এই সুচতুর প্রতারণা সম্পর্কে পূর্ব অনুমান করা একান্তই অসম্ভব। ধারণা করা যায় এই ধরনের একাধিক ফিঙ্গারপ্রিন্ট গ্রহণসহ নানাবিধ কারসাজির মাধ্যমেই প্রতারণা সংঘটিত হয়েছে। এই দায় মূল ব্যাংকের। কারণ এজেন্ট তাঁদের দ্বারাই নিয়োগকৃত এবং সাধারণ গ্রাহকরা ইসলামী ব্যাংকেই টাকা জমাচ্ছিলেন।
এখন ওই এজেন্ট ব্যাংকিং আউটলেটে কোনো দায়িত্বশীল ব্যক্তিকে পাওয়া যাচ্ছে না বলে জানা গেছে। ইসলামী ব্যাংক ছাতক শাখার ব্যবস্থাপক মোহাম্মদ এনামুর রহমান তদন্ত ও ক্ষতিগ্রস্ত গ্রাহকদের নিকট থেকে লিখিত অভিযোগ গ্রহণের প্রক্রিয়া শুরুর কথা জানিয়েছেন। এই প্রক্রিয়া তরান্বিত করে দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত গ্রাহকদের মনে আস্থা ফিরিয়ে আনার পরিবেশ তৈরি করতে হবে। মনে রাখতে হবে এই এজেন্ট শাখার প্রতারক দায়িত্বশীলরা অপরাধপ্রবণ মন—মানসিকতা নিয়ে অজ্ঞ গ্রাহকদের ডিজিটাল প্রতারণার শিকারে পরিণত করেছেন এবং এই প্রতারণা হয়েছে ইসলামী ব্যাংকের সাইনোবোর্ডের নীচে। এখন সমুদয় ব্যাংকিং লেনদেন ডিজিটাল প্রক্রিয়ায় সংঘটিত হয়। সুতরাং ডিজিটাল প্রক্রিয়ায় সংঘটিত অপরাধ নির্ধারণ ও প্রমাণের জন্য প্রয়োজনীয় যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। কোনো অবস্থাতেই অর্ধশিক্ষিত ও অশিক্ষিত গ্রামীণ গ্রাহকদের সরলতা ও অজ্ঞতাকে ব্যবহার করে প্রতারণার দায় এড়ানোর সুযোগ নেই। একদা বাংলাদেশের স্বনামখ্যাত ও বৃহত্তম একটি ব্যাংকের ক্ষেত্রে তো এই অবস্থা কল্পনার বাইরে থাকার কথা ছিলো। ধারণা করা যায় এজেন্ট নিয়োগে তাঁরা যথাযথ প্রাজ্ঞতা ও দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিতে পারেননি।
ওই এজেন্ট ব্যাংকিং শাখার সকল প্রতারণাপূর্ণ কর্মকাণ্ডের সাথে জড়িতদের বিচার ও নিরপরাধ গ্রাহকদের সঞ্চিত টাকা দ্রুত ফেরত দেয়ার জন্য আমরা ইসলামী ব্যাংকের দৃষ্টি আকর্ষণ করি।
সম্পাদকীয় থেকে আরো পড়ুন