প্রকাশিত: ২৫ আগস্ট, ২০২৬ ২৩:১৪
টাঙ্গুয়ার হাওরকেন্দ্রিক পর্যটনের কারণে যে উৎপাদনশীল এই হাওরের পরিবেশই দূষণ হচ্ছে তা নয়, এটি এখন পর্যটকদের অনিরাপদ জায়গায়ও পরিণত হয়েছে। ২৩ আগস্ট (শনিবার) দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে গত ৮ মাসে এই হাওরে ৪ পর্যটকসহ ১১ জনের মৃত্যুর যে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে তা অতীব উদ্বেগ জাগানিয়া। গত শুক্রবার ‘সাফিনা এ লাক্সারি ওয়াটার ভিলা’ নামক হাউসবোট থেকে পানিতে পড়ে মারা যায় রুকাইয়া নূর নামের ১০ বছর বয়সী এক শিশু। এর আগে বিভিন্ন সময়ে হাউসবোটের ইঞ্জিনে কাটা পড়ে ও পানিতে ডুবে মৃত্যুর মতো ঘটনা ঘটেছে। মৃত্যুর এই পরিসংখ্যান থেকে বুঝা যায়, যান্ত্রিক নৌযানগুলো বর্জ্য ফেলে, হাওরের পানিতে রাসায়ানিক বিক্রিয়া ঘটিয়ে, শব্দ দূষণ করে কেবল পরিবেশ ও পাণবৈচিত্রের ক্ষতিই করছে না; একইসাথে পর্যটকদের নিরাপদ আনন্দভ্রমণ নিশ্চিত করতেও নিদারুণ ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছে। সম্প্রতি এই হাওরে ‘দ্য হাইসবোট’ নামের পর্যটকবাহী নৌযানের বর্জ্য হাওরে ফেলার একটি ভিডিও ভাইরাল এবং এ নিয়ে সংবাদ প্রকাশের ফলে পরিবেশ অধিদপ্তর ওই হাউসবোটকে ৩৬ হাজার টাকা আর্থিক জরিমানা করেছে বলে গতকাল দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে প্রকাশিত সংবাদ থেকে জানা যায়। অতিরিক্ত সময় ক্ষেপণ না করে পরিবেশ অধিদপ্তরের এই ব্যবস্থা গ্রহণের সংবাদ স্বস্তিদায়ক। আইন অমান্য করার জন্য দ্রুত শান্তির বিধান করতে পারলেই আইন মানার অভ্যাস তৈরি হয়। তবে টাঙ্গুয়ার হাওরভিত্তিক পর্যটনে প্রতিদিন যে পরিমাণ আইন ভঙ্গের ঘটনা ঘটছে তার তুলনায় আইন প্রয়োগের দৃষ্টান্ত যে নিতান্তই অপ্রতুল তা বলার অপেক্ষা রাখে না। বিশাল টাঙ্গুয়ার হাওরে পর্যটন নীতিমালা পরিপালন তদারকির কাঠামো অত্যন্ত দুর্বল ও অপর্যাপ্ত ।
হাওরে তদারকি প্রতিষ্ঠানের স্থায়ী কাঠামোর অনুপস্থিতি এবং পর্যাপ্ত জনবল না থাকার কারণে প্রতিদিন আইন ভঙ্গ করেও পার পেয়ে যায় হাউসবোটসহ বিভিন্ন অপরাধী। কেবল যে পর্যটকবাহী নৌযানের কারণেই হাওর দূষিত হচ্ছে তা নয়, এই হাওরে নানাবিধ অপরাধকর্ম নিয়মিত পরিচালিত হয়। সামনে আসে কেবল পর্যটনের বিষয়টি। এই হাওরে চুরিসহ নিষিদ্ধ জাল ব্যবহারের মাধ্যমে মৎস্যসম্পদ লুণ্ঠনের প্রক্রিয়া গত কয়েক দশক ধরে চলমান। এর ফলে একদা দেশি জাতের বিভিন্ন প্রজাতির মাছের জন্য বিখ্যাত এই হাওর ও হাওরমধ্যস্ত জলমহালগুলো এখন মৎস্যশূন্য। নির্বিচারে অতিথি পাখি মারার সর্বনাশা প্রক্রিয়ার টুঁটি চেপে ধরা যায়নি। শীত মৌসুমে পাখি মারার মহোৎসব শুরু হয়। হাওর জনপদের রক্ষাকবচ হিজল—করসসহ সকল প্রকার গাছ কেটে নেয়া হয়েছে। নতুন লাগানো গাছগুলো এখন লোপাট হচ্ছে। কৃষি জমিতে ব্যবহৃত রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের যথেচ্ছ ব্যবহারের মাধ্যমে সবচাইতে বেশি দূষিত হয় হাওরের উৎপাদন ব্যবস্থা। এই মহাসর্বনাশের বিষয়টি একেবারেই উপেক্ষিত।
টাঙ্গুয়ার হাওর সুরক্ষা ও এর উৎপাদনশীলতা ফিরিয়ে আনার জন্য বারংবার বিভিন্ন মহল থেকে দাবিনামা উচ্চারিত হয়। অতীতে এরকম বহু সরকারি—বেসরকারি পরিকল্পনা দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনা ও সঠিক কর্মকৌশলের অভাবে ভেস্তে গেছে। হাওরটি সম্পদহারা সর্বহারায় পরিণত হয়েছে। এখনও হাওর সুরক্ষার বাগাড়ম্বর চলমান আছে। কিন্তু কার্যকর পরিকল্পনা ও কৌশলের দেখা মিলে না। হাওর ও জলাভূমি উন্নয়ন বোর্ডকে প্রায় অকার্যকর করে রাখা হয়েছে। হাওরের সার্বিক ও পরিকল্পিত উন্নয়নের জন্যই সরকারি এই প্রতিষ্ঠানটি গঠন করা হয়েছিলো। কিন্তু বোর্ডকে হাওরে কাজ করতে দেয়া হচ্ছে না। কী কারণে হাওর ও জলাভূমি উন্নয়ন বোর্ডকে নিষ্ক্রিয় করে রাখা হয়েছে তার কোনো সদুত্তর পাওয়া যাবে না। অথচ টাঙ্গুয়ার হাওরসহ দেশের বৃহত্তর হাওর এলাকার জন্য দীর্ঘমেয়াদী বৈজ্ঞানিক পরিকল্পনার আওতায় নিবিড়ভাবে কাজ করা দরকার, যা হাওর ও জলাভূমি উন্নয়ন বোর্ডেরই সমন্বয় করার কথা। বিগত আওয়ামী লীগ সরকার ও অন্তবর্তী সরকারের সময়ে পৃথক দু’টি হাওর মহাপরিকল্পনা প্রণয়ন করা হয়েছে। মহাপরিকল্পনা তৈরি করার সহজ কাজটি করলেও বাস্তবায়নের দুরুহ কাজ করার বিষয়ে নেই সামান্য দৃশ্যমান অগ্রগতি। এদিকে ক্রমবর্ধমান পর্যটক—আগ্রহের কারণে টাঙ্গুয়ার হাওরকে বাংলাদেশ পর্যটন কর্পোরেশনের আওতায় তালিকাভুক্ত করাসহ অপরিকল্পিত পর্যটন নিয়ন্ত্রন, পরিবেশ দূষণ বন্ধ ও পর্যটন বিকাশের কোনো কার্যক্রম নেই। সুতরাং পর্যটন ও অন্যান্য অনিষ্টকর কাজের দ্বারা টাঙ্গুয়ার হাওর অতীতে যেমন অপহৃত—ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ভবিষ্যতেও তা অব্যাহত থাকবে, এই ললাটলিখনই কি মেনে নিতে হবে ? আমাদের ভিতরকার খণ্ডিত, সীমিত এবং বিচ্ছিন্ন চিন্তা—চেতনার অবসান ঘটিয়ে কবে সার্বিক, সুদূরপ্রসারী ও দীর্ঘমেয়াদী দৃষ্টিভঙ্গির আগমন ঘটবে ?
সম্পাদকীয় থেকে আরো পড়ুন