প্রকাশিত: ২৩ আগস্ট, ২০২৬ ২২:৪০
সুনামগঞ্জ—সাচনাবাজার ১৯ কিলোমিটারের পাকা সড়ক। সড়কের দুই পাশে স্থানে স্থানে বৃক্ষরাজির সবুজ মায়াময় দীর্ঘ সারি। কোনো কোনো জায়গায় গাছের সবুজ বেষ্টনি এতোটাই ঘন যে অনেক দূর পর্যন্ত ছায়াঢাকা মনোরম ও সুশীতল পথ তৈরি করেছে। এই ছায়ায় কৃষক, পথচারী ক্ষণিক বিশ্রাম নেন, প্রত্যূষে শরীরচর্চাকারীদের হাঁটার উপযুক্ত স্থান ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে এই সড়কে। গতকাল দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরের এক সংবাদ থেকে জানা যায়, এখন বনবিভাগ নির্বিচারে এই গাছগুলো কাটা শুরু করেছে। সড়কের ৪৪৬৮টি গাছ টেন্ডারপ্রক্রিয়ায় ৮৪ লাখ ৮০ হাজার টাকায় বিক্রি করেছে বনবিভাগ। এক একটি গাছ বিক্রি করা হয়েছে গড়ে ১ হাজার ৮ শত আটানব্বই টাকায়। কেন বিক্রি করা হচ্ছে এই গাছ, বিক্রির আগে যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসৃত হয়েছে কি—না, এর কোনো সদুত্তর নেই।
সড়ক বিভাগ জানাচ্ছে এই সড়ক প্রশস্তকরণের কোনো প্রকল্প নেই। তাহলে কেন গাছ কাটা ? বনবিভাগের তরফে আবছাভাবে যা জানা গেলো তা হলো— সামাজিক বনায়ন কর্মসূচির আওতায় রোপিত গাছগুলো বিক্রি করা হচ্ছে। সামাজিক বনায়ন কর্মসূচিতে স্থানীয় জনসাধারণের সরাসরি সম্পৃক্ততা থাকে। এই কর্মসূচির আওতায় বনবিভাগের লাগানো গাছের চারা রক্ষণাবেক্ষণ করেন সন্নিহিত এলাকার দরিদ্র লোকজন। ১০ বছরব্যাপী লালন—পালনের পর গাছ বড় হলে বিক্রি করে বিক্রয়লব্ধ অর্থের একটি নির্দিষ্ট অংশ ওই লোকজন পেয়ে থাকেন। কিন্তু এই সড়কের সামাজিক বনায়ন কর্মসূচির গাছ বিক্রির তথ্য সংশ্লিষ্ট উপকারভোগীরা আদৌ জানেন কি ? এই বিক্রি প্রক্রিয়ায় উপাকারভোগীদের সম্পৃক্ত করা হয়েছে কীভাবে ? স্থানীয় উপাকারভোগীরা জড়িত থাকলে এক একটি গাছ নামমাত্র মূল্যে বিক্রি করা কখনও সম্ভব হতো না। একটি গাছ বিক্রি করা হয়েছে দুই হাজারের কম টাকায় ? এটি বাস্তবসম্মত ? অন্যদিকে হাওর ও নদী রক্ষা আন্দোলন সুনামগঞ্জের সভাপতি রাজু আহমদ সুনামগঞ্জের খবরকে জানিয়েছেন, ২০২৫ সনে হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশ (এইচআরপিবি) এর করা রিটের পর রোপণ করা গাছ না কেটে গাছের বাজারমূল্য নির্ধারণ করে উপকারভোগীদের মধ্যে বিতরণের বিধান সামাজিক বনায়ন বিধিমালায় যুক্ত করার আদেশ দেওয়া হয়েছিলো। এই আদেশ বলে তো বনবিভাগ ওই কর্মসূচির কোনো গাছই বিক্রি করতে পারেন না। তারপরও এই বৃক্ষহত্যা কি কেবলই ভাগ—বাটোয়ারা এবং সরকারি সম্পদের যথেচ্ছ ব্যবহারের মাধ্যমে গোষ্ঠী বা ব্যক্তিবিশেষের লাভবান হওয়ার অভিপ্রায়ে ? স্থানীয়দের অভিমত টেন্ডারাধীন গাছের মূল্য প্রচলিত বাজারদরে কয়েক কোটি টাকা হবে।
যত্রতত্র সড়কের পাশ^র্বর্তী গাছ কর্তনের দৃশ্য আমাদের সভ্যতার প্রতি চরম পরিহাস। মানুষ হিসেবে আমরা চরম প্রকৃতিবিরোধী সত্ত্বারূপে নিজেদের পরিচয়ের লজ্জা প্রকট করছি। পৃথিবীর কোথাও এমন সড়কের ছায়াদানকারী বৃক্ষ কাটার দৃশ্য দেখা যাবে না। সুসভ্য রীতি হলো সড়কের গাছ যথাস্থানে রেখেই সড়কের উন্নয়ন সম্ভব কি—না তা খোঁজে বের করা। পারতপক্ষে গাছ কাটা হয় না। আমাদের দেশে উল্টোরীতি। কোড়াল হাতে যেন লোভী কাঠুৃরিয়া সদাসর্বদা প্রস্তুত রয়েছে গাছকে হত্যা করতে। নাগরিক হিসেবে আমরা খুব কষ্ট পেয়েছি সুনামগঞ্জ—সিলেট সড়কের কয়েক কিলোমিটার অংশ প্রশস্তকরণের নামে নতুন কোর্ট থেকে ওয়েজখালি বা আরও দূর পর্যন্ত ঘন বৃক্ষরাজি কাটার দৃশ্য দেখে। এই সড়কের উভয় পাশ একসময় সবুজে—ছায়ায়—শীতলতায় কমনীয় থাকতো, গাছগুলো কাটার পর এই এলাকা এখন ঊষর ন্যাড়া মরুভূমিতে পরিণত হয়েছে। সুনামগঞ্জ—সিলেট সড়কের এই অংশের ঐতিহ্যরূপ প্রতিষ্ঠিত গাছগুলো রেখে কি সড়ক উন্নয়ন করা যেতো না ? দোয়ারাবাজারের একটি সড়কের গাছ কাটার সংবাদও এরই মাঝে আমাদের উদ্বেগ বাড়িয়েছে। সরকার আগামী পাঁচ বছরে সারা দেশে নতুন করে ২৫ কোটি বৃক্ষ রোপণের কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। বৈশি^কভাবে জলবায়ুর অভিঘাত মোকাবিলা করতে বনায়ন কর্মসূচির ব্যাপ্তি বাড়ানোর উপর সারা পৃথিবীতে এখন গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। বিশ^ব্যাপী উষ্ণতা বৃদ্ধি পেয়ে উৎপাদন ও জীবন ধারণে যে নেতিবাচক প্রভাব তৈরির উদ্বেগ বিদ্যমান, তা থেকে বাঁচাতে বনায়ন কর্মসূচি অতিশয় গুরুত্বপূর্ণ। এমন পরিস্থিতিতে আমাদের বনবিভাগ নির্বিচারে বৃক্ষ হত্যায় মেতে উঠেছে। এমন হত্যাপ্রবণ বনবিভাগের প্রয়োজনীয় সংস্কার ও সংশোধন আবশ্যক।
সাচনা—সুনামগঞ্জ সড়কের পাশ^র্বর্তী বাসিন্দারা নির্বিচারে গাছ কাটার বিরোধিতা করছেন। স্থানীয় পরিবেশবাদী সংগঠনগুলো যথার্থই এর বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। বনবিভাগের রহস্যময় এই গাছ কাটার প্রকৃত কারণ উদঘাটন, নামমাত্র মূল্যে গাছ বিক্রির সিদ্ধান্ত গ্রহণের সাথে জড়িতদের শাস্তি বিধানসহ আর যাতে একটি গাছও কাটা না হয় তা নিশ্চিত করার অনুরোধ আমাদের।
সম্পাদকীয় থেকে আরো পড়ুন