প্রকাশিত: ৩০ আগস্ট, ২০২৬ ২৩:২৫
প্রকৃতিগতভাবে মানুষ বোধ—বুদ্ধি ও ব্যক্তিত্বসম্পন্ন প্রাণী। প্রতিটি ব্যক্তি আত্মসম্মানের প্রতি অতিমাত্রায় সংবেদনশীল। নিজের মর্যাদাবোধ ও আত্মসম্মানের জন্য নেতিবাচক যেকোনো প্রবণতা তাঁর মনোস্তাত্ত্বিক জগতে জটিল আলোড়ন তৈরি করে। মানুষের এই সংবেদনশীল সত্ত্বার কারণেই প্রাণী জগতের মধ্যে মানুষ নিজের শ্রেষ্ঠত্ব তৈরি করতে পেরেছে। তবে মানুষ যে সমাজে বসবাস করে সেই সমাজের নানা উপসর্গের কারণে মানুষ স্বাধীনভাবে নিজের মতো করে বেড়ে উঠতে পারে না। প্রতি পদে পদে সমাজ, আইন, কানুন, প্রথা, বিধি—বিধান, অর্থনৈতিক অবস্থা, রাজনৈতিক বাস্তবতা ব্যক্তির এই স্বাধীন বেড়ে উঠার পিছনে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। তাই বলা হয়, জন্মগতভাবে মানুষ স্বাধীন, কিন্তু সমাজ তাঁর পায়ে শিকল পড়িয়ে রেখেছে। চরমভাবে শ্রেণিবিভাজিত ও অসাম্যপীড়িত দেশীয় ও বৈশি^ক সমাজ বাস্তবতায় প্রান্তিক শ্রেণির মানুষ এখন সর্বাবস্থায় হীন অবস্থানকে মেনে নিতে বাধ্য হয়। সমাজের প্রচলিত অসঙ্গতি ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর মানবিক তাড়নাও আজ একেবারেই স্থিমিত। ফলে সুবিধাবঞ্চিত মানুষরা প্রবল ও প্রতাপশালীদের নানাবিধ শাসন, অনুশাসন ও আধিপত্যের শিকার হয়ে টিকে থাকতে বাধ্য হচ্ছে। মাঝে—মধ্যে আমাদের চারপাশে এমন কিছু ঘটনার খবর পাওয়া যায় যা মানুষের মূল মানবিক সত্ত্বার আর্তনাদ হয়ে সকলের গালে চপেটাঘাত করে। এমনই একটি সংবাদ গতকাল দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে প্রকাশিত হয়েছে। সদর উপজেলার গৌরারং ইউনিয়নের বেড়াজালি গ্রামের এমরান হোসেন (২৩) নামের এক তরুণ চুরির অপবাদ সহ্য করতে না পেরে আত্মহননের পথ বেছে নিতে বাধ্য হয়।
শনিবার সকালে নিজ বাড়ির বারান্দা থেকে তাঁর ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। সংবাদভাষ্য অনুসারে বেড়াজালি বাজারের চান মিয়া নামক জনৈক ব্যক্তির মোটর ও কিছু বৈদ্যুতিক তার চুরি হয় দিন পনেরো আগে। চান মিয়ার ছেলে আবুল ফজল এই চুরির জন্য এমরান ও নিলু মিয়া নামের আরেক তরুণকে দায়ী করেন। গত শুক্রবার বেড়াজালি বাজারে গৌরারং ইউপি চেয়ারম্যানের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত সালিশে এমরানের উপর চুরির দায় চাপানো হয়। সালিশে এমরান চুরির অভিযোগ অস্বীকার করলেও দুর্দান্ত প্রতাপশালী সালিশ তা মানতে নারাজ। রীতিমতো কোনো প্রমাণ ও স্বাক্ষী—সাবুদ ছাড়াই এমরানকে চোর বানিয়ে দেয় এবং সোমবারের মধ্যে চুরি যাওয়া মালামাল ফেরৎ দেয়ার ‘ডিক্রি’ জারি করে। তরুণ এমরান এই তথাকথিত সালিশ বিচারে প্রচণ্ডভাবে অপমান বোধ করেন। তাঁর আত্মসম্মানকে ওই সালিশ ভীষণভাবে নাড়িয়ে দেয়। অপমান সইতে না পেরে সালিশ শেষ হওয়ার রাতেই তিনি গলায় ফাঁস লাগিয়ে জাগতিক অপমান থেকে নিজেকে রক্ষা করেন। কী আশ্চর্য আমাদের সামাজিক কাঠামো। যে কাঠামোয় অবলীলায় ব্যক্তিবিশেষকে অপরাধী বানিয়ে দেয়া যায়। একবারও ওই কাঠামোর নিয়ন্ত্রক ব্যক্তিরা ভাবেন না, তাঁদের একটি ভুল কিংবা ক্ষমতার দম্ভ প্রকাশের কারণে কতো বড় সর্বনাশ ঘটে যেতে পারে। তরুণ এমরান নিজের জীবন বিসর্জন দিয়ে আমাদের সমাজে প্রচলিত এই চরম অন্যায্য বাস্তবতার বিষয়টি সামনে নিয়ে আসলেন।
গ্রামীণ সালিশের কাউকে অপরাধী সাব্যস্ত করা, দণ্ড দান কিংবা কাউকে চরমভাবে অপদস্ত করার ন্যূনতম আইনি ভিত্তি নেই। অপরাধ প্রমাণ ও অপরাধীকে সাজা দেয়ার একমাত্র এক্তিয়ার রাষ্ট্রের বিচার ব্যবস্থার। তারপরেও গ্রামীণ সমাজে সালিশ একটি স্বীকৃত বিরোধ নিষ্পত্তি ব্যবস্থা। এই ব্যবস্থায় মূলত উভয় পক্ষের সম্মতির ভিত্তিতে একটি সমাধানে পৌঁছা হয় যা উভয় পক্ষই সন্তুষ্টচিত্তে মেনে নেন। এরকম না হলে প্রচলিত বিচারিক কাঠামোর কাছেই বিচার চাইতে হয়। কিন্তু এখন এই গ্রামীণ সালিশগুলো ক্ষমতাবানদের স্বার্থ রক্ষার হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। সালিশি ব্যক্তিগণের চরম নৈতিক অধঃপতন ও নির্লজ্জভাবে পক্ষ বিশেষের প্রতি পক্ষপাতিত্বের ঘটনা অহরহ ঘটতে শোনা যায়। বেড়াজালি গ্রামে এমরানকে চোর সাব্যস্ত করার এই বেআইনি সালিশটিও এমন পক্ষপাতদুষ্ট বলে আমরা অনুমান করি। যে সালিশে একজন ইউপি চেয়ারম্যান উপস্থিত ছিলেন সেখানে এমন বেআইনি ও অমানবিক বিচার কীভাবে চলে তা ভেবে আমরা আশ্চর্য হই। একজন চেয়ারম্যান হিসেবে গ্রামীণ সালিশের ব্যাপ্তি, ক্ষমতা ও পরিধি বিষয়ে তো তাঁর জানা আছে। তাঁর উপস্থিতিতে এমন বিচারবহির্ভূত কর্মকাণ্ড ঘটতে পারলো কী করে ?
আত্মহননকারী এমরানের পিতা আব্দুল হাসিম সুনামগঞ্জের খবরকে ছেলেকে নির্দোষ উল্লেখ করে সালিশের নামে অপমানের হাত থেকে বাঁচতে এমরানের আত্মহত্যার বিচার দাবি করেছেন। কিন্তু এই শোকগ্রস্ত ছেলেহারা পিতার চাওয়া বিচার কে করবে ? রাষ্ট্র তথা রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানবিশেষ কি এই দায়িত্ব নিয়ে মানুষের মানবিক সত্ত্বার প্রতি সামান্য সম্মান দেখাবেন ?
সম্পাদকীয় থেকে আরো পড়ুন