প্রকাশিত: ২৯ আগস্ট, ২০২৬ ২৩:২৯
গত শুক্রবারের (২৮ আগস্ট) দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে প্রকাশিত শান্তিগঞ্জ উপজেলার পশ্চিম বীরগাঁও ইউনিয়নের শান্তিগঞ্জ—রজনীগঞ্জ সড়কের বসিয়াখাউরি সেতুর নির্মাণ কাজ সমাপ্তি এবং হস্তান্তরের আগেই যে নির্মাণত্রুটির বিবরণ পাওয়া গেছে তা এ দেশের ঠিকাদারি কাজের অন্তঃসারশূন্যতা এবং দুর্নীতিপ্রবণ চরিত্রকে পুনরায় উন্মোচিত করেছে। ৮ কোটি ৫২ লাখ টাকা ব্যয়ে এই সেতু নির্মাণের কার্যাদেশ পায় ঠিকাদার। ২০২২ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিলো। নির্ধারিত মেয়াদের পর সাড়ে চার বছর অতিক্রান্ত হলেও এখন পর্যন্ত ঠিকাদার সেতুটি এলজিইডিকে বুঝিয়ে দিতে সক্ষম হয়নি। এলজিইডি ওই সেতুর কাজে মারাত্মক ত্রুটি পাওয়ায় সেতুটি বুঝে নিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। অন্যদিকে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান দুই বছর আগে কাজ শেষ হওয়ার কথা বলে সেতুটি বুঝে না নেয়ার দায় এলজিইডি’র ঘাড়ে চাপানোর অপচেষ্টা করছে। কার্যাদেশের শর্ত অনুসারে যথাযথ মানে কাজ না করা হলে এবং নির্মাণ কাজ শেষ হওয়ার আগেই নানা ধরনের বিচ্যুতি তৈরি হলে এলজিইডি কেন এই ত্রুটিপূর্ণ কাজ বুঝে নিবে ? তবে আমাদের কথা হলো, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান যখন কাজ করছিলেন তখন এলজিইডি কী করছিলো ? কাজের প্রতিটি ধাপই তো তাদের নজরদারি ও তদারকিতে থাকে। এলজিইডি’র প্রকৌশলীগণের আপত্তি থাকলে কাজের গুণগত মানের বিষয়টি ওই সময়ই উত্থাপিত হওয়ার কথা ছিলো। কিন্তু আদৌ তা হয় নি। এখন হয়তো বলার চেষ্টা করা হবে তখন অন্য কর্মকর্তারা দায়িত্বে অবহেলা করেছেন। কিন্তু সারা দেশেই ঠিকাদারি প্রথায় যে কাজ করানো হয় তার মান রক্ষিত না হওয়া, সময়ক্ষেপণ, পুনঃপ্রাক্কলনের মাধ্যমে ব্যয় বৃদ্ধি এবং দুর্নীতির মহোৎসব দেখে দেখে আমাদের অভ্যাস হয়ে গেছে। এখন যে সবকিছু একেবারে সাফসুতরো হয়ে গেছে তা বলার মতো পরিবেশ তৈরি হয়নি। তবে কাজের নির্মাণত্রুটি দেখা দেয়ায় এরজিইডি যে সেতুর হস্তান্তর প্রক্রিয়া আটকে দিয়েছে তা কিছুটা স্বস্তির। ঠিকাদার হয়তো এখন ত্রুটি সারিয়ে তোলার ‘যতটুকু না হলে নয়’ ততটুকু কাজ করেই সেতুর দায়িত্ব বুঝিয়ে চূড়ান্ত বিল উঠিয়ে নেয়ার চেষ্টা করবেন।
সংবাদ বিবরণী অনুসারে বসিয়াখাউরি সেতুর এপ্রোচের একাধিক স্থানে ধস তৈরি হওয়া, ব্লক খসে পড়া এবং কিছু জায়গায় ব্লক না বসানোর মতো গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। সেতুর দক্ষিণ পাশে জেবিবি উচ্চ বিদ্যালয়ের সামনে হাঁসকুড়ি—করেরগাঁও সংযোগ সড়ক অংশে নাকি কোনো ব্লকই বসানো হয়নি। বর্ষাকালে হাওরের ঢেউয়ে ্ওই এপ্রোচ সড়ক আরও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, শুরু থেকেই কাজের মান নিয়ে প্রশ্ন ছিলো। বলাবাহুল্য এরকম প্রশ্ন সারা দেশের সর্বত্রই উঠে এবং আরও অবাক বিস্ময়ের বিষয় হলো— এসব অভিযোগকে কখনও পাত্তা দেয়া হয় না। একটি গ্রামীণ সড়কের সেতুর নির্মাণ ব্যয় সাড়ে আট কোটি টাকা কম কিছু নয়। উপযুক্তভাবে পর্যালোচনা করা হলে দেখা যাবে সেতুর নির্মাণ খরচ নির্ধারণে বহু বেশি অর্থের সংস্থান রাখা হয়েছে। হয়তো সঠিক ব্যয়ের তুলনায় তা দ্বিগুণ বা তার চাইতেও বেশি হতে পারে। অবকাঠামো নির্মাণে আমাদের দেশের ব্যয়কে অন্যান্য দেশের তুলনায় অনেক বেশি বলা হয়। মুখ্যত দুর্নীতির মাধ্যমে সরকারি অর্থ লোপাট করাকেই প্রাক্কলিত ব্যয় মাত্রাতিরিক্ত পর্যায়ে নিয়ে যেতে ভূমিকা রাখে বলে বিভিন্ন মহল থেকে জোরালো অভিযোগ করা হয়। বাংলাদেশে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি পেয়ে যাওয়া এই পুকুর চুরির প্রবণতাটিও তেমন আলোড়ন তৈরি করতো না যদি সংশ্লিষ্ট কাজের মান ভালো হয়। কিন্তু দেখা যায় আমলা—ঠিকাদার—রাজনীতিক দুষ্টচক্র গাছেরটি যেমন খেয়ে ফেলতে ওস্তাদ তেমনি তলেরটাও না কুঁড়িয়ে থাকার সংযম দেখাতে পারে না। বসিয়াখাউরি সেতুতেও এমন প্রবণতার অনুমান করা যায়। না হলে সেতু নির্মাণ শেষ হওয়ার আগেই কেন এপ্রোচ সড়কের মাটি ধসে পড়বে আর বড় একটি অংশে আদৌ কোনো আরসিসি ব্লক না বসিয়ে পার পাওয়া সম্ভব ? আমরা মনে করি কেবল দৃশ্যমান এই ত্রুটিগুলো নয়, পুরো সেতুর কাঠামোগত নির্মাণপ্রক্রিয়াই নিরপেক্ষ প্রাযুক্তিক দক্ষতাসম্পন্ন দল দিয়ে পুনরায় পরীক্ষা করানো উচিৎ।
শাসন ক্ষমতার দাপটে দেশে যে মহালুৃটপাটতন্ত্র কায়েম হয়েছিলো, পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং তীব্র গণজাগরণ ও গণঅভ্যুত্থানের পর ওই লুটপাটতন্ত্রের অবসান ঘটার আকাক্সক্ষা ছিলো। বাস্তবে কোথায় কতটুকু পরিবর্তন হয়েছে তা নিয়ে বিস্তর প্রশ্ন থাকলেও আকাক্সক্ষার ওই জায়গা থেকে বসিয়াখাউরি সেতুতে যে কারিগরি ও নির্মাণত্রুটির সন্ধান দেখা গেছে; তার সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য সমাধান প্রত্যাশিত।
সম্পাদকীয় থেকে আরো পড়ুন