প্রকাশিত: ০১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ০০:০৭
সুনামগঞ্জের বিভিন্ন সীমান্ত স্পট দিয়ে ভারতীয় পণ্য চোরাচালানের পরিমাণ বাড়ছে বলে গতকাল দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে প্রকাশিত একটি সংবাদ থেকে জানা যায়। জেলার ভারত—বাংলাদেশ সীমান্ত দিয়ে চলতি বছর বিজিবি ও পুলিশের অভিযানে ১৪ কোটি ৭০ লাখ টাকার চোরাচালানকৃত পণ্য জব্দ করা হয়। গত জানুয়ারি থেকে জুলাই মাস পর্যন্ত পুলিশ চোরাচালানের ৫৯৫টি মামলায় ৭৮৪ জনকে গ্রেফতার করে। পরিসংখ্যানগত এই দিকটিকে চোরাচালান বাড়ার বা কমার কারণ ভাবার কোনো অবকাশ নেই। বরং বলা যেতে পারে চোরাচালানের বিরুদ্ধে আভিযানিক সংখ্যা বেড়েছে। সরকার চোরাচালানের বিরুদ্ধে শূন্য—সহনশীলতা প্রদর্শনের ঘোষণা দেয়ার পর কাক্সিক্ষতভাবেই এর বিরুদ্ধে আইন—শৃঙ্খলা বাহিনী ও সীমান্তরক্ষী বাহিনীর তৎপরতা বাড়ার কথা। প্রায় প্রতিদিনই জেলার কোনো না কোনো জায়গায় চোরাচালানি পণ্য জব্দের খবর পাওয়া যায়। এতো অভিযান এবং মালামাল জব্দ করার পরও এ কথা বলার অবকাশ নেই যে, চোরাচালান একেবারে বন্ধ হয়ে গেছে। চোরাচালান শতভাগ বন্ধ করা বোধ করি অতিশয় কঠিন কাজ। অর্থনীতির দুষ্ট—নিয়ম, অসাধু ব্যবসায়িক মনোবৃত্তি, শুল্ক ফাঁকির প্রবণতা, সীমান্তবর্তী এলাকার মানুষের সহজ লাভজনক ব্যবসা এবং অভ্যন্তরীণ বাজারে বিপুল চাহিদার প্রেক্ষিতে চোরাচালান শূন্যে নামিয়ে আনা কঠিন।
তবে সীমান্তরক্ষী ও পুলিশের চোরাচালানবিরোধী তীব্র মনোভাব বজায় রাখা না হলে এই সর্বনাশা কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণে রাখাও দুরূহ বটে। গতকাল দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরের এই প্রধান সংবাদের পাশাপাশি জেলার শান্তিগঞ্জ উপজেলা থেকে চোরাচালানকৃত বিপুল পরিমাণ শাড়িসহ একটি পরিত্যক্ত কাবার্ড ভ্যান বিজিবি কর্তৃক উদ্ধারের খবর রয়েছে। জব্দ শাড়ি ও কাভার্ড ভ্যানের সিজার মূল্য হিসাব করা হয়েছে ৩ কোটি ৫৮ লাখ ১৯ হাজার টাকা। এই বিপুল শাড়ি উদ্ধার করা থেকে বুঝা যায়, ক্রমাগত আভিযানিক সফলতা প্রদর্শন সত্ত্বেও চোরাচালান বন্ধ করা যায়নি। শাড়ির এই চালানটি হয়তো ধরা গেছে, কিন্তু ধরা পড়েনি এমন শাড়ির চালানের সংখ্যা কতো তা বলা মুশকিল। দেশে ভারতীয় শাড়ির প্রচুর চাহিদা রয়েছে। অধিক মুনাফা লাভের আশায় অসাধু ব্যবসায়ীরা সরকারের রাজস্ব ও শুল্ক ফাঁকি দেয়ার অসৎ উদ্দেশ্যেই চোরাচালানকে পৃষ্ঠপোষকতা দান করে। কেবল শাড়ি নয়, সুনামগঞ্জের খবরের সংবাদ থেকে জানা যায়— মাদক, ফুচকা, জিড়া, কয়লা, চিনি, কিসমিস, ভুট্টা, ঔষধ, কম্বল, শাল চাদর, শাড়ি, ওড়না, স্যুটের কাপড়, লেহেঙ্গা, ব্লেড, বিস্কুট, বাদাম, চাল, আগ্নেয়াস্ত্র, কার্তুজ, গরু, প্রসাধনী সামগ্রী প্রভৃতি ভারত থেকে চোরাচালান হয়ে আসে। ভয়ানক তথ্য হলো বিপুল মাদক ও আগ্নেয়াস্ত্রের অবৈধ অনুপ্রবেশ। বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক ‘ক’ ক্যাটাগরির সর্বনাশা মাদক হিসেবে চিহ্নিত ইয়াবা এই জেলায় আসে ভারত থেকে অবৈধপথে। মাদকের কারণে দেশের তরুণ—যুব সমাজ অবক্ষয়ের সর্বনাশা স্তরে পৌঁছে দেশ ও জাতির বোঝা হয়ে উঠেছে। অথচ ভয়ঙ্কর মাদকের সবই আসে বিদেশ থেকে অবৈধপথে। সরকার ও সীমান্তরক্ষীরা জাতিবিধ্বংসী মাদকের অনুপ্রবেশ বন্ধ করতে পারে না কেন ?
জেলার ১২ উপজেলার ৬টির সাথেই রয়েছে ভারতের সীমান্ত। এই সীমান্তের ব্যাপ্তি ১২০ কিলোমিটার। এই স্থল সীমান্ত দিয়ে অবৈধ অনুপবেশ ও বহির্গমন রোধ করা বিজিবি’র দায়িত্ব। বহুলশ্রম্নত অভিযোগ হলো— হাত বাড়ালেই যেকোনো ধরনের মাদকসহ ভারতীয় পণ্য দেশের ভিতর সহজেই পাওয়া যায়, কেবল জানতে হবে যথার্থ ঠিকানা। হাত বাড়ালেই যদি মাদকসহ ভারতীয় পণ্য সহজলভ্য হয়; তাহলে চোরাচালান বন্ধ বা নিয়ন্ত্রণে আসার দাবি করা যাবে কি ? অন্যদিকে যেসব পণ্য বৈধপথে আমদানি করা যায় সে—সব পণ্যের চোরাচালান আমাদের জাতীয় অর্থনীতিকে পঙ্গু করে রেখেছে। পৃষ্ঠপোষকতা ও প্রশ্রয় ছাড়া কখনও কোনো অপকর্ম, অপরাধ, চোরাচালান; কিছুই দীর্ঘদিন চলতে পারে না। আমাদের দেশে চোরাই মালামাল আনা—নেয়ার কাজে কারা যুগ যুগ ধরে প্রত্যক্ষ—পরোক্ষ সহায়তা দিয়ে আসছেন তা সকলের জানা। এখন ঘুরে দাঁড়ানোর সময় এসেছে। জাতীয় স্বার্থ বিরোধী এই কর্মকাণ্ডকে নিয়ন্ত্রণে আনতে সকল দায়িত্বশীলদের মনোস্তাত্ত্বিক পরিবর্তন ঘটিয়ে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হতে হবে। দুর্জনরা বলে থাকেন, মাঝেমধ্যে চোরাই মাল আটকের যে সংবাদ আসে তা আসলে সাজানো নাটক। দুর্জনদের এই ধরনের কটু মন্তব্য বন্ধ করতে হলে দেশের ভিতর অবৈধ পণ্যের প্রাপ্যতাকে সাংঘাতিকভাবে কঠিন করে তোলতে হবে। আটক করতে হবে পালের গোদাদের। নিম্নপর্যায়ের খুচরা ব্যবসায়ী বা বহনকারী শ্রমজীবীকে আটকে আখেরে কোনো ফলোদয় হবে না। চোরাচালানের সাথে জড়িত মাথাগুলো ধরা পড়ে শক্ত সাজার সম্মুখীন হলেই কেবল চোরাচালান নামক দুঃসাহসী দরোজার অর্গল বন্ধ করা সম্ভব হবে।
সম্পাদকীয় থেকে আরো পড়ুন