প্রকাশিত: ০৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ২৩:১৩
সুনামগঞ্জ পৌর শহরে লাইসেন্সবিহীন ইজিবাইক ও ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার অবাধ দৌরাত্ম্যে জনজীবন চরম বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। শহরের প্রধান সড়ক ও ফুটপাত দখল করে যত্রতত্র অবৈধ স্ট্যান্ড গড়ে তোলায় প্রতিদিনই তীব্র যানজটের কবলে পড়ছেন শহরবাসী।
সড়কে ট্রাফিক পুলিশ উপস্থিত থাকলেও তাদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। চোখের সামনেই ট্রাফিক আইন অমান্য করে অবৈধ গাড়ি চলাচল করলেও রহস্যজনক কারণে নীরব ভূমিকা পালন করছে প্রশাসন। এ কারণে মাত্র ১০ মিনিটের পথ পাড়ি দিতে সময় লাগছে এক ঘণ্টারও বেশি।
.jpg)
পৌরসভা ও ইজিবাইক সমিতি সূত্রে জানা যায়, শহরে চলাচলের জন্য ১ হাজার ৩০০টি ইজিবাইক এবং ১ হাজারটি ব্যাটারিচালিত রিকশার বৈধ অনুমোদন রয়েছে। বাস্তবে দৈনিক ৩ থেকে ৪ হাজার বৈধ—অবৈধ যানবাহন দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। অনুমোদনহীন এসব যানবাহনের একটি বড় অংশ চালাচ্ছে ১৪ থেকে ১৬ বছরের অপ্রাপ্তবয়স্ক কিশোরেরা। অদক্ষ চালক ও বেপরোয়া গতির কারণে প্রতিদিনই ছোট—বড় দুর্ঘটনা ঘটছে, আহত হচ্ছেন সাধারণ পথচারী ও শিক্ষার্থীরা।
অনুসন্ধানে ও স্থানীয়দের অভিযোগ থেকে জানা যায়, ইজিবাইক সমিতির প্রভাবশালী সদস্য ও ট্রাফিক পুলিশের এক শ্রেণির কর্মকর্তা—কর্মচারীকে মাসিক চাঁদা দিয়েই অবৈধ গাড়িগুলো রাস্তায় নামছে। লাইসেন্সবিহীন এক চালক জানান, লাইসেন্স না থাকলেও মাসে ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা চাঁদা দিলে পুলিশ বা সমিতি থেকে কেউ কিছু বলে না। টাকা দিয়ে ‘ম্যানেজ’ করেই আমরা গাড়ি চালাই।
প্রতি বছর ৭ থেকে ৮ হাজার টাকা পৌরকর দিয়ে লাইসেন্স নেওয়া বৈধ চালকেরা ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, অবৈধ যানবাহনের ভিড়ে তারা এখন চরম লোকসানের মুখে। চাঁদা দিয়েই সড়ক দখল করে তৈরি করা হয়েছে অবৈধ স্ট্যান্ড।
.jpg)
প্রতিদিন সকাল ৯টার পর থেকে জেলা শহরমুখী মানুষের চাপ বাড়ে। কালীবাড়ি, পুরাতন বাসস্ট্যান্ড, ওয়েজখালী, নতুন বাসস্ট্যান্ড, মল্লিকপুর, কাজীর পয়েন্ট ও ষোলঘর এলাকায় যানজট এখন নিত্যদিনের রূপ নিয়েছে। আলফাত স্কয়ার, পৌর মার্কেট ও কোর্ট পয়েন্টের মূল সড়ক ও ফুটপাত দখল করে গাড়ি থামিয়ে যাত্রী উঠানো—নামানো হয়। এতে ফুটপাত হাতছাড়া হওয়ায় পথচারীরা বাধ্য হয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মূল সড়ক দিয়ে হাঁটছেন। স্কুল—কলেজের শিক্ষার্থী, অফিসগামী মানুষ এমনকি জরুরি সেবার অ্যাম্বুলেন্সও ঘণ্টার পর ঘণ্টা জ্যামে আটকে থাকছে।
হতাশ শহরবাসীর স্পষ্ট দাবি—অবিলম্বে লাইসেন্সবিহীন ইজিবাইক উচ্ছেদ, সড়কের অবৈধ স্ট্যান্ড বন্ধ এবং কঠোরভাবে ট্রাফিক আইন প্রয়োগ করে সড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে হবে। দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে শহর রক্ষায় রাজপথে আন্দোলনে নামার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন ভুক্তভোগী সাধারণ জনগণ।
জেলা ইজিবাইক সমিতির সভাপতি সোহেল আহমদ চাঁদাবাজির অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, আমাদের কোনো সদস্য চাঁদাবাজিতে জড়িত নয়। তবে অবৈধ গাড়ির বিষয়ে আমরা আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় বারবার পদক্ষেপ নিতে বলেছি। ১,৩০০ ইজিবাইক ও ১,০০০ ব্যাটারিচালিত রিকশার বাইরে বাকি সবই অবৈধ। পৌরসভা ও পুলিশ চাইলে একদিনেই এগুলো বন্ধ করতে পারে। আমরা প্রশাসনকে সব ধরনের সহযোগিতা করতে প্রস্তুত।
ট্রাফিক পুলিশের টিআই সুশান্ত চাকমা সিন্ডিকেটের চাপের কথা স্বীকার করে নিজের অসহায়ত্ব প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, ছোট শহরে অতিরিক্ত গাড়ির কারণে আমরাও অতিষ্ঠ। নিয়মিত মোবাইল কোর্ট বা অভিযান চালিয়ে অবৈধ গাড়ি আটক করলেই ওপরের মহল থেকে ফোন আসে ছেড়ে দেওয়ার জন্য। ‘এসব গাড়ি ধরা যাবে না’—এমন চাপে ট্রাফিক পুলিশ বলতে গেলে ইজিবাইক সিন্ডিকেটের কাছে অসহায়।
সুনামগঞ্জ পৌরসভার প্রশাসক অসীম চন্দ্র বণিক জানান, পৌর শহরের বিভিন্ন জায়গায় সিএনজি, ইজিবাইক যততত্র স্ট্যান্ড গড়ে উঠেছে। এসব বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ও স্থানীয় সংসদ সদস্যকে অবহহিত করে শহরবাসীর চালাচলের জন্য সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করতে হবে। অবৈধ লাইসেন্স বিহীন ইজিবাইকের কারণে প্রতিদিন শহরে যানজট তৈরি হচ্ছে। এছাড়াও অনেক পয়েন্ট অবৈধভাবে ফুটপাত দখল করায় সড়কে তীব্র যানজট দেখা যাচ্ছে। অভিযান পরিচালনা করে মাঝে মধ্যে জরিমানা করা হলে ও পরবর্তীতে তাড়া আবার এসে জায়গা দখল করছে। কয়েকদিনের ভেতরে শহরে মাইকিং করে জানানো হবে অবৈধ লাইসেন্স বিহীন গাড়ির বিষয়ে। এরপর আমরা অভিযানে নামবো অবৈধ লাইসেন্সবিহীন গাড়ির বিরুদ্ধে আইনগতভাবে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন