ইশারা ভাষায় ভালাবাসার সংসার

প্রকাশিত: ০৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ২৩:২১

মধ্যনগর উপজেলার সুস্থ—সবল যুবক টিটু মিয়া বাক ও শ্রবণ প্রতিবন্ধী হাওয়া আক্তারকে বিয়ে করে এলাকায় ব্যাপক প্রশংসা কুড়াচ্ছেন। মাত্র তিন দিনের পরিচয়ে গড়ে উঠা এই প্রেম ও যৌতুকবিহীন বিয়ে এখন আশেপাশের মানুষের মুখে মুখে। কথায় নয়, মনের টানে যে ভালোবাসার সৃষ্টি হয়— তারই এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন মধ্যনগর উপজেলার দিনমজুর টিটু মিয়া (৩০)।

 


চামরদানী ইউনিয়নের টেপিরকোনা গ্রামের দিনমজুর টিটু মিয়া (৩০)। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে খালার বাড়ি মীর্জাপুর গ্রামে বেড়াতে গিয়ে পাশের বাড়ির হাওয়া আক্তারের (২৭) সঙ্গে পরিচিত হন। দক্ষিণ বংশীকূন্ডা ইউনিয়নের মীর্জাপুর গ্রামের মৃত মৌলা মিয়া ও রাশিদা আক্তারের বড় মেয়ে হাওয়া জন্মগতভাবে বাক ও শ্রবণ প্রতিবন্ধী। কিন্তু মাত্র তিন দিনের দেখা—সাক্ষাতেই টিটু হাওয়াকে ভালোবাসার কথা জানান। নিরক্ষর হাওয়া আক্তার হাত ও চোখের ইশারায় সেই প্রস্তাবে সম্মতি জানান এবং শেষ দিনেই হয় তাদের বিয়ে। কাজী সিরাজুল হক আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেন। বিয়েতে কোনো দাবিদাওয়া বা যৌতুক নেই।

 


হাওয়া আক্তারের জরাজীর্ণ বসতঘরের বারান্দায় বসে যখন টিটু কথা বলেন, হাওয়া উত্তর দেন চোখ আর হাতের ইশারায়। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সুযোগ না পেলেও নিজস্ব বুদ্ধিমত্তায় গড়ে তোলা এই ইশারা ভাষাই তাদের যোগাযোগের মাধ্যম। টিটুও অনায়াসে বুঝে নেন স্ত্রীর না বলা কথা।

 


হাওয়ার সকাল শুরু হয় বাড়ি ঝাড়ু দেওয়া থেকে। হাওরের পানিতে হাঁড়িপাতিল ধোয়া, গবাদিপশুকে খড় খাওয়ানো, পাশের বাড়ি থেকে খাবার পানি সংগ্রহ, গোবর ও বাঁশের কঞ্চি দিয়ে জ্বালানি ‘মুইট্টা’ তৈরি, দুপুরে মা মেয়ে ও স্বজনের সাথে হাওর থেকে নিয়ে আসা কলমিশাক কাটাকুটি সহ সব কাজ তিনি একাই সামলান। টিটুর বাবা ছাড়া পরিবারের কেউ এই বিয়েতে রাজি হননি। সেজন্য সাত মাস হলেও টিটু নববধূকে নিজের বাড়িতে নিয়ে যেতে পারেননি। তারা দুজন এখন হাওয়ার মায়ের বাড়িতেই থাকছেন। স্বজনদের শর্ত— হাওয়ার সন্তান হলে তবেই তাকে ঘরে তোলা হবে।

 


টিটুর মা কাছনা আক্তার বলেন, মেয়েটি বোবা ও কানে কম শোনে, তাই ছোট ভাইবোন ও স্বজনদের পছন্দ হয়নি। তবে পুত্রবধূকে বাড়ি আনার চেষ্টা করব।
বাবা কাছা মিয়া বলেন, বিয়ে আল্লাহর দান। টিটুর মেয়েটিকে ভালো লেগেছে তাই বিয়ে করেছে। কিছুদিন পর পরিস্থিতি শান্ত হলে বাড়ি নিয়ে আসব। তিনি আরও বলেন, আমাদের দুটো পরিবার হতদরিদ্র, সহায় সম্বল নেই। এমনকি ভালো একটি ঘরও নেই। এজন্য তিনি সরকারি বেসরকারি সংস্থার সাহায্য কামনা করেন।  

 


হাওয়ার মা রাশিদা আক্তার কখনো ভাবতে পারেননি কোনো সুস্থ—সবল যুবক তাঁর মেয়েকে বিয়ে করবেন। গ্রামের ছেলে—মেয়েদের ২০—২৫ বছরের মধ্যে বিয়ে হলেও হাওয়ার শারীরিক সমস্যার কারণে তাঁর বিয়ে নিয়ে মায়ের দুশ্চিন্তার শেষ ছিল না।

 


রাশিদা আক্তার জানান, পরিবারে ছয়জন সদস্য, যার মধ্যে হাওয়াসহ দুজন প্রতিবন্ধী। একজনের আয়ে সংসার চলে না, খেয়ে—না—খেয়ে দিন কাটে। তিনি সরকার ও সমাজের বিত্তবানদের সহায়তা চান।
মীর্জাপুর গ্রামের বাসিন্দা ফুলবানু বলেন, আজকাল টাকাপয়সা ছাড়া ভালো মেয়ে বিয়ে দেওয়া যায় না। টিটু কোনো দাবি ছাড়াই বিয়ে করেছে— এলাকায় এটা প্রথম।

 


তিনি আরও বলেন, আগে অন্ধ ছেলের সাথে অন্ধ মেয়ে বা খুড়া ছেলে খুড়া মেয়ের বিয়ে হতে দেখতাম। কিন্তু টিটু ভালো ছেলে হয়ে একটি বোবা, কানে শুনে না এমন মেয়ে বিয়ে করছে— তাকে সবার সাহায্য করা উচিত।  
আলীম উদ্দিন বলেন, দুনিয়ায় যে ভালো মানুষ আছে, টিটু তার প্রমাণ। আজকাল ভালো মেয়ে বিয়ে দিতে বাবা মায়ের কত হয়রানি হতে হয়। কিন্তু টিটু জেনে শুনে হাওয়াকে বিয়ে করে ভালো মানুষের পরিচয় দিয়েছে।
প্রতিবেশী খালেদা আক্তার ও হারিছ মিয়া দুই পরিবারের জন্য সরকারি বিশেষ সহায়তার দাবি জানিয়ে বলেন, টিটু ও হাওয়া দুইজনের পরিবার হতদরিদ্র, এলাকাতে তাদের জায়গা—সম্পদ নেই। 
দক্ষিণ বংশীকূন্ডা ইউনিয়নের সাত নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য দেলোয়ার হোসেন বলেন, হাওয়া আক্তার ও তার ভাই প্রতিবন্ধী ভাতা পাচ্ছেন। ভবিষ্যতে আরও কোনো সুযোগ এলে তাদের সহায়তার প্রতিশ্রম্নতি দেন তিনি।
প্রসঙ্গত, ইউনিয়ন পরিষদের সমাজসেবা অফিসের তথ্য অনুযায়ী, মীর্জাপুর গ্রামে মোট সাতজন প্রতিবন্ধী ব্যক্তি রয়েছেন।

উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন


সম্পাদক মণ্ডলীর উপদেষ্টা : স্বপন কুমার দেব, কুমার সৌরভ

সম্পাদক ও প্রকাশক : পঙ্কজ কান্তি দে

অনলাইন সম্পাদক : মাহবুবুল হাছান শাহীন

সম্পাদক কর্তৃক অক্ষর মুদ্রণ অফসেট প্রেস, জোয়াহের রাজা ট্রেড সেন্টার, পুরাতন বাসস্টেশন, সুনামগঞ্জ।

মোবাইল : ০১৭১৮৩৪৫৯৭৫

বিজ্ঞাপন : ০১৩২৫৪৬২৪৯৫

ই-মেইল : [email protected]

সুনামগঞ্জের খবর পরিবার