বিলুপ্তির পথে মাটির ‘ছিকর’

প্রকাশিত: ০৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ২৩:২৭

আগে বাজারে গেলে এক টাকা দিয়া ছিকর আনতাম আমার ঘরের লাগি। বাজারের হকল দোকানে ছিকর পাইতাম। এখন আর ছিকর দেখি না। ৮০ বছর বয়সী তারিফ উল্লার কণ্ঠে আক্ষেপ। কয়েক দশক আগেও দিরাইয়ের হাট—বাজারে মাটির তৈরি ‘ছিকর’ ছিল পরিচিত একটি খাবার। একসময় এক টাকায় পাওয়া যেত এটি। ঘরের নারী, শিশু ও নববধূদের জন্য মানুষ বাজার থেকে ছিকর কিনে বাড়ি ফিরতেন। অনেক সময় চালের বিনিময়েও মিলত।
দিরাই উপজেলার গ্রামীণ জনপদে একসময় ছিকরের বেশ কদর ছিল। দোকানের পাশাপাশি ফেরিওয়ালারা গ্রামে গ্রামে ঘুরে ছিকর বিক্রি করতেন। তাঁদের হাঁক শুনে বাড়ির নারী—শিশুরা ছুটে আসতেন।


৬৫ বছর বয়সী সখিনা বিবি বলেন, ছিকর আছিল আমরার পছন্দের জিনিস। বাজার থেইকা আনাইয়া খাইতাম। ফেরিওয়ালারা বাড়ি বাড়ি আইতো। এক ফট চাল দিয়াও ছিকর কিনে রাখতাম।

 

 

 

 

 


৫২ বছর বয়সী মনিরা বেগমও ছোটবেলার স্মৃতি টেনে বলেন, আগে বাজারে সহজেই ছিকর পাওয়া যেত। এখন অনেক দিন ধরে তিনি আর আগের মতো ছিকর দেখেননি।
দিরাই পৌরসভার মধ্যবাজারের ব্যবসায়ী বিনয় লালা প্রায় ৪০ বছর ধরে ছিকর ও চুন বিক্রি করছেন। তাঁর চোখের সামনেই কমেছে ছিকরের চাহিদা। বিনয় লালা বলেন, ৪০ বছর ধরে ছিকর ও চুন বিক্রি করছি। একসময় দাম কম আছিল, কিন্তু বিক্রি হইতো প্রচুর। এখন এগুলো কেউ খায় না। নতুন প্রজন্ম তো ছিকর চিনেই না।

 


তিনি বলেন, এখন ২০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি করি। কিন্তু সারাদিনে এক কেজিও বিক্রি করতে পারি না। ছিকর সংগ্রহ করাও এখন অনেক কষ্টের।
স্থানীয় বাসিন্দা মিত্রা পুরকায়স্থ বলেন, ছোটবেলায় ছিকর অনেক খেতাম। তখন বাজারে সহজেই পাওয়া যেত। এখন তো এগুলো দেখাই যায় না। আগে গর্ভবতী মহিলারাও ছিকর খাইতেন।
স্থানীয় প্রবীণদের ভাষ্য অনুযায়ী, মিহি এঁটেল মাটি সংগ্রহ করে পরিষ্কার ও প্রক্রিয়াজাত করার পর ছোট ছোট টুকরো বা বিস্কুটের মতো আকার দেওয়া হতো। পরে রোদে শুকিয়ে আগুনে পুড়িয়ে তৈরি করা হতো ছিকর। পোড়ানোর পর এর রং হতো লালচে বা কালচে। কোথাও কোথাও গোলাপজল, আদার রস ও সামান্য চিনি ব্যবহারের কথাও জানা যায়।
স্থানীয়রা বলেন, আধুনিক খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন, প্যাকেটজাত খাবারের বিস্তার, ছিকর তৈরির কারিগর কমে যাওয়া এবং কাঁচামাল সংগ্রহের জটিলতায় সংকুচিত হয়েছে এর বাজার। একসময় যে ছিকর বাজারের প্রায় দোকানে পাওয়া যেত, এখন তা হাতে গোনা এক/দুইটা দোকানে মেলে।

 


প্রবীণদের স্মৃতিতে ছিকর শুধু একটি খাবার নয়—এটি হাটের দিন, ফেরিওয়ালার হাঁক আর গ্রামীণ জীবনের এক টুকরো স্মৃতি। একসময় এক টাকায় পাওয়া সেই ছিকর আজ ২০০ টাকা কেজি হলেও ক্রেতা নেই। নতুন প্রজন্মের কাছে অচেনা হয়ে পড়া এই খাবারের সঙ্গে হারিয়ে যাচ্ছে দিরাইয়ের লোকজ খাদ্যসংস্কৃতির একটি অধ্যায়।

উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন


সম্পাদক মণ্ডলীর উপদেষ্টা : স্বপন কুমার দেব, কুমার সৌরভ

সম্পাদক ও প্রকাশক : পঙ্কজ কান্তি দে

অনলাইন সম্পাদক : মাহবুবুল হাছান শাহীন

সম্পাদক কর্তৃক অক্ষর মুদ্রণ অফসেট প্রেস, জোয়াহের রাজা ট্রেড সেন্টার, পুরাতন বাসস্টেশন, সুনামগঞ্জ।

মোবাইল : ০১৭১৮৩৪৫৯৭৫

বিজ্ঞাপন : ০১৩২৫৪৬২৪৯৫

ই-মেইল : [email protected]

সুনামগঞ্জের খবর পরিবার