শিক্ষার মানোন্নয়নে ধারাবাহিক প্রচেষ্টা বজায় রাখতে হবে

প্রকাশিত: ০১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ২২:৩৬

এ বছরের এসএসসি পরীক্ষার ফলাফল বিপর্যয়ের কারণ অনুসন্ধান ও উত্তরণের উপায় উদ্ভাবন বিষয়ে সোমবার শহরের উচ্চ বালিকা বিদ্যালয় মিলনায়তনে জেলার মাধ্যমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধানগণের উপস্থিতিতে যে মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে তাকে আমরা ইতিবাচক ভাবতে চাই। বলা হয়, এ বছর পরীক্ষার খাতা মূল্যায়নে অতীতের মতো নমনীয় না থেকে যার যত নম্বর পাওয়ার কথা তাঁকে সেই নম্বর দেয়ার কারণে বাহ্যত ফলাফলের হার হ্রাস পেয়েছে। তবে আশঙ্কার কথা হলো, নমনীয় খাতা মূল্যায়নের সময় থেকেই সুনামগঞ্জ জেলার এসএসসি’র ফলাফলের অবনতি শুরু করেছে। অবনতির এই ধারা এবার আরও বেড়েছে। গত কয়েক বছরের ফলাফল বিশ্লেষণ ও ক্রমাগত নিম্নমুখী সফলতার হার বিশ্লেষণ করলে শিক্ষাদান ব্যবস্থায় গলদ থাকার বিষয়টি অস্বীকার করার উপায় নেই। ব্যবস্থায় গলদ থাকলে তা থেকে উত্তরণের উপায় খোঁজতে হয়। এই উপায় খোঁজার ব্যবস্থা হিসেবে সোমবারের মতবিনিময় সভাটি তাৎপর্যপূর্ণ। এখানে খারাপ ফলাফলের জন্য দায়ী অনেকগুলো কারণ যেমন উঠে এসেছে তেমনি সামনের দিনে ভালো ফলাফল অর্জনের কিছু সুনির্দিষ্ট সুপারিশও পাওয়া গেছে। শিক্ষার মানোন্নয়নে এই ধরনের প্রচেষ্টার ধারাবাহিকতা থাকলে অবস্থার ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটতে বাধ্য। তবে সেই ধারাবাহিকতা কতটুকু বজায় থাকে তা দেখার জন্য আমাদের সামনের এসএসসি পরীক্ষা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। মতবিনিময় সভায় শিক্ষা ব্যবস্থার কিছু মৌলিক সমস্যার কথা উঠে এসেছে। এর মধ্যে প্রধান হলো— গ্রাম ও শহরের মধ্যে শিক্ষাক্ষেত্রে বিরাজিত বৈষম্য। গ্রামের বিদ্যালয়ে যেমন পর্যাপ্ত উপযুক্ত ও দক্ষ শিক্ষকের অভাব রয়েছে তেমনি অভিভাবকরা আর্থিক অভাবগ্রস্ততার কারণে সন্তানদের জন্য কাক্সিক্ষত মনোযোগ ও অতিরিক্ত খরচেও অপারগ। এই সমস্যাটি রাষ্ট্রীয় আর্থ—রাজনৈতিক ব্যবস্থার সাথে সরাসরি সম্পর্কিত। প্রচলিত বৈষম্যমূলক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা জারি রেখে এই বৈষম্য কমানো কখনও সম্ভব হবে না। এর বাইরে গণিত ও ইংরেজির মতো মৌলিক বিষয়ে শিক্ষার্থীর মাত্রাতিরিক্ত ভীতি, অভিভাবকদের অসচেতনতা, শিক্ষকস্বল্পতা, অতিরিক্ত মোবাইল—আসক্তি, রাজনৈতিক অস্থিরতার মতো বিষয়গুলোও উঠে এসেছে। বিদ্যমান সমস্যা কাটিয়ে সহসা চমকপ্রদ উন্নয়ন আশা করা যাবে না। তবে এখন থেকেই যদি শিক্ষাক্ষেত্রে নিয়োজিত সকলে সমাধানমূলক তৎপরতায় আন্তরিকভাবে যুক্ত হন তাহলে প্রতিবছরই একটু একটু করে উন্নতির ছাপ অবশ্যই লক্ষ্য করা যাবে। 

 


প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থা, বিশেষ করে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত; সাংঘাতিক বাণিজ্যিক চরিত্র ধারণ করে ফেলেছে। এক এক জন শিক্ষার্থীর জন্য ভর্তিফিস, পরীক্ষাফিস, নোট—গাইড, সহায়ক গ্রন্থ, সাজেশন, কোচিং, প্রাইভেট টিউশন প্রভৃতি খাতে যে বিশাল টাকা খরচ করতে হয় তা বহন করার সক্ষমতা রাখেন না আমাদের দেশের অধিকাংশ অভিভাবক। সরকার বিনামূল্যে পাঠ্যবই বিতরণ, অবৈতনিক শিক্ষা ব্যবস্থা, মিড—ডে মিল, বেসরকারি শিক্ষকদের আর্থিক সহায়তাসহ নানাবিধ শিক্ষাবান্ধব কর্মসূচি গ্রহণ করলেও উপর্যুক্ত অনুপ্রবিষ্ট প্রপঞ্চগুলোর কারণে তা ভেস্তে গিয়েছে। এখন অবস্থা এমন হয়েছে, যার টাকা নেই তার শিক্ষাও নেই, ব্যবস্থার দিকে যেন আমরা ধাবমান আছি। শ্রেণিকক্ষে যথাযথ পাঠদান হয় না বলে বিস্তর অভিযোগ। এমন বাস্তবতায় আলাদিনের জাদুর চেরাগ দিয়ে সবকিছুর রাতারাতি পরিবর্তন আশা করা বোকামি। সবার আগে আমাদের শিক্ষা কাঠামোর গণমুখী সংস্কারের দিকে নজর দিতে হবে। প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত শিক্ষাখাতে রাষ্ট্রীয় বাজেটের বরাদ্দ বাড়াতে হবে। চলতি বছরের বাজেটে শিক্ষা খাতে যে বরাদ্দ দেয়া হয়েছে তা মোট জিডিপি’র মাত্র ২ শতাংশ। এই বরাদ্দ যেমন আরও বাড়াতে হবে তেমনি বরাদ্দকৃত অর্থের যথাযথ ব্যয়—সংস্কৃতিও উন্নত করতে হবে। উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান তৈরি ও পরিচালনার নামে আমাদের দেশে অহেতুক টাকা খরচের বাড়াবাড়ি লক্ষ্য করা যায়। উচ্চমাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত শিক্ষার মানোন্নয়ন না ঘটলে উচ্চশিক্ষায় অগ্রগতি আশা করা বাতুলতা। দেশে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা এখনও পর্যাপ্ত নয়, শিক্ষক সংখ্যাও অপ্রতুল। এই জায়গাগুলোতে অনেক কাজ করতে হবে। কেবল কথার ফুলঝুরি দিয়ে কিছুই অর্জন করা যায় না। দরকার উপযুক্ত পরিকল্পনা ও স্বচ্ছতার সাথে তা বাস্তবায়ন করা। 

 

 


শিক্ষকদের শ্রেণিকক্ষে পাঠদানে আরও বেশি মনোযোগী করতে হবে। শিক্ষার্থীর পিঠে ভারবাহী গাধার মতো বই ও আনুষাঙ্গিক  ভারী বোঝা চাপিয়ে দিয়ে নিজেদের দায় এড়ানোর সংস্কৃতি পরিত্যাগ করে প্রকৃত অর্থে জাতি গড়ার কারিগর রূপে ভূমিকা রাখতে পারলে শিক্ষায় কিছুটা অগ্রগতি যে হবে তা নিশ্চিত। সোমবারের মতবিনিময় সভা জেলার প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে উদ্বুদ্ধ করুক এই আমাদের কামনা।

সম্পাদকীয় থেকে আরো পড়ুন


সম্পাদক মণ্ডলীর উপদেষ্টা : স্বপন কুমার দেব, কুমার সৌরভ

সম্পাদক ও প্রকাশক : পঙ্কজ কান্তি দে

অনলাইন সম্পাদক : মাহবুবুল হাছান শাহীন

সম্পাদক কর্তৃক অক্ষর মুদ্রণ অফসেট প্রেস, জোয়াহের রাজা ট্রেড সেন্টার, পুরাতন বাসস্টেশন, সুনামগঞ্জ।

মোবাইল : ০১৭১৮৩৪৫৯৭৫

বিজ্ঞাপন : ০১৩২৫৪৬২৪৯৫

ই-মেইল : [email protected]

সুনামগঞ্জের খবর পরিবার