প্রকাশিত: ০৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ২৩:০৫
বিএনপি সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর একজন অ-চিকিৎসক ব্যক্তিকে স্বাস্থ্যমন্ত্রী করায় অনেক চিকিৎসক নাখোশ হলেও আমি নিরপেক্ষই ছিলাম। স্বাস্থ্যখাত অনেক বড় একটি খাত। স্বাস্থ্যমন্ত্রী হতে হলে চিকিৎসকই হতে হবে এমন কোনো কথা নেই। মন্ত্রীর কাজ রোগী দেখা কিংবা টেকনিক্যাল সাপোর্ট দেওয়া নয়; মন্ত্রীর মূল কাজ স্ট্র্যাটেজিক সাপোর্ট দেওয়া এবং নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ে কাজ করা।
সরকারি হাসপাতালগুলোতে যথাসময়ে চিকিৎসক-নার্সদের উপস্থিত না থাকা আমাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার অন্যতম বড় সমস্যা—এটা স্বীকার করতেই হবে। এই সমস্যা দূরীকরণে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী সরদার মোঃ সাখাওয়াত হোসেন সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে যেভাবে আকস্মিক পরিদর্শন শুরু করেছিলেন এবং চিকিৎসক, নার্সসহ সংশ্লিষ্ট স্বাস্থ্যকর্মীদের যথাসময়ে হাসপাতালে উপস্থিত থাকার তাগিদ দিয়ে আসছিলেন, তাতে যারপরনাই খুশি হয়েছিলাম। একইসাথে আমরা দেখতে পেলাম স্বাস্থ্যমন্ত্রীর দেখাদেখি সরকারের সাথে সংশ্লিষ্ট আরও অনেকেই হাসপাতাল পরিদর্শনে মনোযোগী হলেন।
৩১ আগস্ট ২০২৬ তারিখ পটুয়াখালী-৩ (গলাচিপা-দশমিনা) আসনের সংসদ সদস্য এবং প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নুরের (ভিপি নুর) স্ত্রী গলাচিপা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স পরিদর্শনে যান। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, তিনি সেখানে কর্তব্যরত নার্সকে কী যেন নির্দেশনা দিচ্ছেন। ভদ্রমহিলা কোনো চিকিৎসক নন, স্বাস্থ্যকর্মী নন, রাজনৈতিক কর্মীও নন; তিনি একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষিকা। তিনি বিদ্যালয় ছেড়ে কেন হাসপাতালে পরিদর্শনে এলেন, তা নিয়ে কারও কোনো প্রশ্ন নেই
বাংলাদেশের প্রশাসনিক কাঠামো অনুযায়ী, রাষ্ট্রপ্রধান বা সরকারপ্রধানের সহধর্মিণী ছাড়া অন্য কোনো মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রীর পরিবারের সদস্যের জন্য বিশেষ রাষ্ট্রীয় প্রটোকল বা অফিশিয়াল পরিদর্শনের সুযোগ নেই। করের টাকায় পরিচালিত সরকারি হাসপাতাল পরিদর্শনের আইনি এক্তিয়ার কেবল সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা বা জনপ্রতিনিধিদেরই থাকে।
১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখ কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল পরিদর্শনে গিয়ে হাসপাতালের সার্বিক পরিবেশ, শৌচাগার ও অন্যান্য অব্যবস্থাপনা দেখে ক্ষোভ প্রকাশ করেন কৃষিমন্ত্রী আমিন উর রশিদ ইয়াছিন। এ সময় তিনি হাসপাতালের পরিচালককে উদ্দেশ করে বলেন, ‘সুইপার আর হারপিক নিয়ে আসেন, আমি ক্লিন করি। যদি আমি পারি, তাহলে আপনার কাছে জানতে চাইব—আপনি কেন পারলেন না?’ মন্ত্রী মহোদয়কে সবিনয়ে বলতে চাই, আপনার কাজ টয়লেট পরিষ্কার করা নয়, কেন টয়লেট পরিষ্কার হচ্ছে না সেটা খুঁজে বের করা। এই দায়িত্ব যদি পরিচালককে নিজ হস্তে করতে হয়, তাহলে এটি রাষ্ট্রের জন্য একটি বিরাট অর্থনৈতিক ক্ষতির কারণ হবে। একটি পাঁচশত শয্যার হাসপাতালের পরিচালক হতে হলে যে অভিজ্ঞতা লাগে এবং তিনি তাঁর কাজের জন্য যে বেতন পান, তা দিয়ে টয়লেট পরিষ্কার করতে গেলে এর খরচ অত্যধিক হবে। রাষ্ট্র তা বহন করতে পারবে না।
আগ্রহোদ্দীপক বিষয় হলো, এসকল ব্যক্তিবর্গ হাসপাতাল পরিদর্শনের সময় সাথে অনেক ভুঁইফোড় সাংবাদিক, অনলাইন নিউজ পোর্টাল ও ইউটিউবার নিয়ে আসেন। এইসব ইউটিউবাররা চিকিৎসক-নার্সদের খণ্ডিত বক্তব্য নিয়ে রিলস বানায়, নিজেদের পেজে আপলোড করে, এবং তারা ভালো ভিউ পান। আমাদের জনগণও চিকিৎসকদের নাজেহাল হতে দেখলে কেন যেন একধরনের পৈশাচিক আনন্দ পান।
আপনি রাজনীতিবিদ মানুষ; রাজনীতির জন্য, বাহবা পাওয়ার জন্য অনেক কিছুই বলতে পারেন, কিন্তু এতে স্বাস্থ্য ব্যবস্থার কোনো পরিবর্তন হবে না। মন্ত্রণালয়ে বসে কখন কোন জায়গায় চিকিৎসক বদলি করতে হবে, নিয়োগ দিতে হবে—এই সুশাসন যদি প্রতিষ্ঠা করতে না পারেন, তাহলে রাজনীতি করে দেশের কী উন্নতি করবেন? আপনি হিউম্যান রিসোর্স ঠিক করবেন, ঠিক আছে। আপনার একজনকে দিয়ে দশজনের কাজ করিয়ে দেশের প্রভুত উন্নতি করার ইচ্ছে হলো, ভালো কথা। কিন্তু খালি কথায় তো চিঁড়ে ভেজে না। ভালো সেবা দেওয়ার জন্য নুন্যতম লজিস্টিক সাপোর্টও লাগবে, তাই না?
গত ১৬ আগস্ট দৈনিক প্রথম আলোয় প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালে ২৫০ শয্যার বিপরীতে রোগী ভর্তি ছিল ৮৯১ জন। আর হাসপাতালে চিকিৎসকের পদ আছে ৭৪টি, কর্মরত আছেন ২৩ জন; অর্থাৎ ৫১টি পদ শূন্য। নার্সের পদ আছে ২৬৩টি, কর্মরত আছেন ১৯৩ জন, শূন্য পদ ৭০টি। মেডিকেল টেকনোলজিস্টসহ অন্যান্য পদ আছে ১৩৬টি, এর মধ্যে ৮৮টিই শূন্য। এমন সংকটের মধ্যেই সুনামগঞ্জ মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে গত মাসে পাঁচজন চিকিৎসককে সেখানে বদলি করা হয়। অথচ সেখানে এখনো হাসপাতালই চালু হয়নি। এটা শুধু সুনামগঞ্জের চিত্র নয়, বাংলাদেশের জেলা শহরে অবস্থিত প্রতিটি ২৫০ শয্যার হাসপাতালের প্রতিদিনের চিত্র।
গতকাল (৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬) স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের একজন উপসচিব জনাব আব্দুল খালেক ভোলা সদর হাসপাতালে জরুরি বিভাগে চিকিৎসকদের উদ্দেশ্যে যে বয়ান দিয়েছেন, তাতে আমি সন্দিহান বর্তমান সরকার স্বাস্থ্য খাতে আদৌ কোনো পরিবর্তন করতে পারবে কিনা। অনেকদিন থেকেই আমলারা বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাতকে গিলে খাওয়ার পায়তারা করছে; এটি তার একটি ছোট্ট উদাহরণ মাত্র। ভদ্রলোক একজন কর্তব্যরত চিকিৎসকের কক্ষে প্রবেশ করে তাঁর টেবিলে বই পেয়ে ক্ষুব্ধ হয়েছেন। মৌখিক নির্দেশ দিয়ে এসেছেন কর্তব্যরত অবস্থায় টেবিলে কোনো বইপ্ত্র রাখা যাবে না। এদের মতো অদক্ষ আমলারা এখনও কীভাবে দেশ পরিচালনার কাজে যুক্ত আছেন, এটাই বুঝে আসছে না।
আদালতে আর্গুমেন্ট করার সময় একজন আইনজীবী যদি বিচারকের সামনে সংবিধান বা দণ্ডবিধি খুলে পড়েন, তাহলে কি বিচারক রাগ করেন? মোটেও নয়। একজন সরকারি কর্মকর্তার টেবিলে সার্ভিস রুলস, চাকরির বিধানাবলী বই থাকবে এবং সময় সময় তিনি এটি খুলে পড়বেন—এটাই স্বাভাবিক। একজন চিকিৎসকের টেবিলে Davidson, Harrison, Bailey & Love, Parveen Kumar-এর বই থাকবে; থাকতেই হবে। তাই দেশের আইন-কানুন ও মেডিকেল ইথিক্সের বিরুদ্ধে কেউ কোনো ফতোয়া দিলে সেটি গ্রহণযোগ্য নয়।
একটি জবাবদিহিতামূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তুলতে হলে ক্ষমতার প্রতিটি স্তরে প্রটোকলের কঠোর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা অত্যন্ত প্রয়োজন। ব্যক্তিগত বা পারিবারিক প্রভাবের ঊর্ধ্বে উঠে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর পেশাদারিত্ব রক্ষা করার মাধ্যমেই কেবল স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়ন ও জনগণের আস্থা ধরে রাখা সম্ভব।
লেখকঃ জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও জেনারেল প্র্যাকটিশনার, গ্রীন লাইফ ডায়াগনস্টিক সেন্টার, সুনামগঞ্জ।
উপসম্পাদকীয় থেকে আরো পড়ুন