প্রকাশিত: ০৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ২২:২৫
সম্প্রতি সুনামগঞ্জের জনপ্রিয় পত্রিকা দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে জেলার বিভিন্ন বাজারে এলপিজি মূল্য নিয়ে একটি সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। খবরে বলা হয়েছে, সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে অন্তত ১০০—২০০ টাকা বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে এলপিজি সিলিন্ডারসমূহ। যদিও এই পত্রিকাসহ আরো অনেক গণমাধ্যম এর পূর্বেও দামের বিষয় নিয়ে একাধিক সংবাদ প্রকাশ করেছে। এসব সংবাদের প্রেক্ষিতে জেলা প্রশাসন ও ভোক্তা অধিদপ্তর বিভিন্ন সময় বিভন্ন বাজারে মোবাইলকোর্ট ও অভিযান পরিচালনা করেছে, করছে। তারপরও নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে না এলপিজির সরকার নির্ধারিত দাম, যা খুবই উদ্বেগের বিষয়। কেননা জ্বালানীর মত অপরিহার্য একটি পণ্য যদি নিয়মিত বেশি দামে কিনতে হয় তবে তা ভোক্তার পকেটের উপর যেমন নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে তেমনি সরকার ও আইনের প্রতিও তৈরি হবে তাদের নেতিবাচক ধারণা।
সমস্যাটি অত্যন্ত ব্যাপক ও অতীব গুরুত্বপূর্ণ হলেও এর আশু সমাধান যে সম্ভব হচ্ছে না এটি মোটামোটি নিশ্চিত। কেননা অন্যান্য নিত্য পণ্যের মত কেবল ডিলার বা দোকানিকে আইনের আওতায় আনলেই এলপিজির দাম নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হবে না। এলপিজির ক্ষেত্রে সাপ্লাই চেইন ও প্রফিট মার্জিন সম্পূর্ণ ভিন্নভাবে পরিচালিত ও নির্ধারিত হয়। যেমন আমাদের সুনামগঞ্জের স্থানীয় পর্যায়ে যদি সাপ্লাই চেইন বিশ্লেষন করি তাহলে দেখা যায়, কোম্পানি থেকে ডিলার, ডিলার থেকে খুচরা/স্থানীয় ব্যবসায়ী, সর্বশেষে আবার খুচরা বা স্থানীয় ব্যবসায়ী থেকে নিচ্ছে মৌসুমী বা পার্টটাইম সিলেন্ডার বিক্রেতারা। যেহেতু তারা সবাই ব্যবসার উদ্দ্যেশেই সিলেন্ডার নিচ্ছেন তাই অপরাপর পণ্যের মত তারাও প্রফিট মার্জিন বা লভ্যাংশ বাহির করতে চান। বিপত্তিটা ঘটে এখানেই। ধরুন সরকারবাহাদুর নির্ধারণ করে দিলেন একটি ১২ লিটারের এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ১৫০০ টাকা। এখন কোম্পানি সেটি তার ডিলারকে পরিবহন খরচসহ ৫০ টাকা মার্জিন দিয়ে ১৪৫০ টাকায় দিল। এতে কোম্পানি কিন্তু সরকারের নির্দেশ অমান্য করছে না, এবং তাকে আইনের আওতায় আনার সুযোগ নেই। ডিলারও যেহেতু সরকারের আদেশ মানতে বাধ্য সে তাই তার খুচরা ব্যবসায়ীকে দিবে ১৪৮০ টাকা দামে যেন ওই ব্যবসায়ী ১৫০০ টাকায় বিক্রি করতে পারে এবং ২০ টাকা লাভ করতে পারে। এপর্যন্ত সব ঠিক ছিল এবং সরকার নির্ধারিত দাম নিয়ন্ত্রণও সম্ভব ছিল।
কিন্তু এর পরের পর্যায়েই ঘটে আসল ঘটনা। ওই ব্যবসায়ীর কাছ থেকে যখন মৌসুমী ব্যবসায়ী বা পার্টটাইম বিক্রেতারা ৩—১০ টি সিলেন্ডার কিনে নিচ্ছেন, তখন তাকে সিলিন্ডার প্রতি ১৫০০ টাকা দিয়েই কিনতে হচ্ছে, এবং সিলেন্ডার যেহেতু ভারি পণ্য তাই এর পরিবহন খরচও বেশি হয়। আবার যেহেতু কম সংখ্যক সিলিন্ডার নিচ্ছেন গড়ে পরিবহন খরচ বেশি পড়ছে। আবার একদিকে তিনি যেহেতু নিয়মত সিলেন্ডার বিক্রি করেন না তাই তার উদ্দেশ্য থাকে সর্বোচ্চ মুনাফা অন্যদিকে তিনি যেহেতু আইন ভঙ্গ করে বেশি দামেই বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন তাই তিনি চান যতটুকো বেশি নেয়া যায়। ফলে একধাপেই ১৫০০ টাকার সিলেন্ডার স্থানভেদে ১৮০০ টাকা পর্যন্তও হচ্ছে। আর এসব মৌসুমী বা অস্থায়ী বিক্রেতারা বেশিরভাগক্ষেত্রেই রেস্টুরেন্ট, পানের দোকান, ফার্মেসি বা চালের দোকানসহ অন্য কোন পণ্যের বিক্রেতা হয়ে থাকেন। তাদের সিলেন্ডার বিক্রির জন্য নেই কোন ফায়ার লাইসেন্স বা বিস্ফোরক লাইসেন্স, নেই কোন নিরাপত্তা জ্ঞান। আবার তাদের সংখ্যা অগণিত ও তারা জ্ঞাতসারে অপরাধী হওয়ায় কোন এক বাজারে অভিযান পরিচালনার সাথে সাথেই তারা তাদের দোকান বন্ধ করে চলে যান অথবা সিলিন্ডারগুলো অন্যত্র সরিয়ে ফেলেন। তাদের কোন লাইসেন্স না থাকায় বেশি দাম নেয়ার অপরাধে লাইসেন্স বাতিলের কোন ভয়ও তাদের থাকে না। ফলে বলা যায় তারা একপ্রকার ধরােঁছায়ার বাহিরে। এমন পরিস্থিতিতে কেবল অভিযান আর মনিটরিং কখনই যে সিলন্ডারের দাম নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে না সেটি মোটামুটি নিশ্চিত করেই বলা যাচ্ছে। এর জন্য প্রয়োজন সকল ভোক্তাদের সচেতন হওয়া। ভোক্তা পর্যায়ে প্রতিরোধ গড়ে তোলা ছাড়া আপাদত আর কোন সমাধান নাই বললেই চলে। আর ভোক্তাদের এই প্রতিরোধের সবচেয়ে বড় অস্ত্র হলো ভোক্তা অধিদপ্তর। যখনই কোন দোকান বেশি দামে সিলেন্ডার বিক্রি করবে সাথে সাথে মেমো নিতে হবে অথবা ভিডিও বা অডিও রেকর্ডিং করে রাখতে হবে। পরবর্তিতে যথাযথ নিয়মে ভোক্তা অধিদপ্তরে অভিযোগ করতে হবে। যখন প্রতিটি বাজার থেকে যদি এমন অভিযোগ আসবে কেবল তখনই এসব ব্যবসায়ীদের আইনের আওতায় আনা সম্ভব। এ তো গেলো দাম নিয়ে আলোচনা, এর বাহিরেও প্রতিটি এলপিজি সিলান্ডারে সাধারণ ভোক্তারা কোন না কোনভাবে প্রতারিত হচ্ছেন। যেমন, প্রতিটি সিলিন্ডারের গায়ে খুদাই করে খালি সিলিন্ডারের ওজন লেখা থাকে। যেমন যদি কোন ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের গায়ে ওজন লেখা থাকে ১২.৭ কেজি তাহলে গ্যাস ভর্তি সিলিন্ডারের ওজন হবে ২৪.৭ কেজি। কেনার সময় ওজন দিলেই বুঝা যাবে যে ওজনে ঠকানো হচ্ছে কি না। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ওজনে ২০০—৫০০ গ্রাম কম হয়। এছাড়া খুদাই করে লেখা ওজনকে ঘষামাজা করে বাড়িয়ে লেখা হয়। যেমন ১২ কেজি ওজন লেখা সিলিন্ডারকে ঘষামাজা করে ১২.৮ বা ১২.৫ কেজি লেখা হয়। এটিও ভোক্তাদের সাথে বড় ধরনের প্রতারণা। এছাড়াও আপনি যে সিলিন্ডারটি টাকা দিয়ে কিনে বাসায় নিয়ে ব্যবহার করছেন তার মধ্যে ঢুকিয়ে দেয়া হচ্ছে পানি আর বালি। পাশাপাশি তো মেয়াদউত্তীর্ণ ও টেম্পারবিহীন সিলিন্ডার আছেই। ঘটতে পারো যে কোন ধরণের দূর্ঘটনা। সব মিলিয়ে সুনামগঞ্জে এলপিজি সিলিন্ডার বিক্রির ক্ষেত্রে চলছে এক মহা আরজকতা। এটি নিয়ন্ত্রণে এখন পর্যন্ত যথাযথ কোন পন্থা বা কার্যপদ্ধতি খুজে পায়নি সরকারের কোন দপ্তর। তাই, এই মহা প্রতারণা আর দুর্ঘটনার ঝঁুকি থেকে বাঁচতে একমাত্র উপায়ে ভোক্তা পর্যায়ে সচেতনতা আর ভোক্তা অধিদপ্তরের হস্তক্ষেপ।
লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট, সুনামগঞ্জ
সম্পাদকীয় থেকে আরো পড়ুন