প্রকাশিত: ০৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ২২:২৮
১১—২০তম গ্রেডের সরকারি চাকুরির প্রার্থী বাছাই ও নিয়োগ পদ্ধতিতে লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষার মানবণ্টনে সরকার নতুন বিধি প্রণয়ন করতে যাচ্ছে বলে গতকাল দৈনিক সমকালে প্রকাশিত একটি সংবাদ থেকে জানা যায়। এ সংক্রান্ত বিধিমালা অনুমোদন করেছে প্রশাসনিক উন্নয়ন সংক্রান্ত সচিব কমিটি। এই বিধিমালা সরকারের চূড়ান্ত অনুমোদন পেলে মৌখিক পরীক্ষায় স্তরভেদে সর্বোচ্চ ৪০০ শতাংশ নম্বর বৃদ্ধি ও লিখিত পরীক্ষায় পাস নম্বর ১৫ শতাংশ পর্যন্ত কমার তথ্য দিয়েছে ওই সংবাদ প্রতিবেদন।
লিখিত পরীক্ষায় নম্বর কমানো ও মৌখিক পরীক্ষায় নম্বর বাড়ানোর এই পদক্ষেপের ফলে নিয়োগ পরীক্ষায় ‘প্রক্সি’ ঠেকানো সম্ভব হবে বলে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে। অন্যদিকে এর বিপরীত মত হচ্ছে— মৌখিক পরীক্ষায় নম্বর বাড়ানোর মাধ্যমে সরকারের পছন্দের প্রার্থীকে নিয়োগ দেয়ার প্রবণতা তৈরিসহ নিয়োগসংক্রান্ত অনিয়ম ও দুর্নীতি বাড়বে। নতুন এই বিধিমালার খবর প্রকাশ হলে ঢাকা ও রাজশাহী বিশ^বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা মঙ্গলবার এই পরিবর্তনের বিরোধিতা করে বিক্ষোভ করেছেন। শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে এই ব্যবস্থাকে ‘নব্যকোটা’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। মঙ্গলবার জাতীয় সংসদের চলমান অধিবেশনে বিষয়টি পয়েন্ট অব অর্ডার আকারে উত্থাপন করেন জামায়াত দলীয় সংসদ সদস্য শফিকুল ইসলাম মাসুদ। তিনি বলেন, ‘সরকারি চাকুরির ১১তম থেকে ২০তম গ্রেডের নিয়োগে মৌখিক পরীক্ষার নম্বর বৃদ্ধি এবং লিখিত পরীক্ষায় পাসনম্বর কমানো মেধার পরিবর্তে কোটার দিকে ধাবিত হওয়া’। অবশ্য স্পিকার রুলিং দিয়ে পয়েন্ট অব অর্ডার নাকচ করে দিয়েছেন। এনসিপি নেতা ও সংসদ সদস্য হাসনাত আব্দুল্লাহ এতে মুখ চিনে নম্বর বাড়িয়ে দেয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। হঠাৎ করে নন—ক্যাডার পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে সরকারের নতুন মানবণ্টন পদ্ধতির কেন প্রয়োজন হলো, তা নিয়ে যথেষ্ট প্রশ্ন তোলার অবকাশ রয়েছে। ‘প্রক্সি’ ক্যান্ডিডেট কমানোর যে বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে তা ঠেকাতে বহুবিধ প্রাযুক্তিক ব্যবস্থা ও সতর্কতা অবলম্বনের সুযোগ ছিলো। প্রচলিত পদ্ধতিতে প্রশ্নপত্র ফাঁস, প্রক্সি পরীক্ষার্থী, উত্তরপত্র মূল্যায়নে অসাধু উপায় অবলম্বন, মৌখিক পরীক্ষায় নমনীয়তা, দুর্নীতি; প্রভৃতি নানা ধরনের অভিযোগ ব্যাপকভাবে বিদ্যমান। দরকার ছিলো, ব্যবস্থার এইসব গলদ, অসঙ্গতি, অস্বচ্ছতা দূর করা। এর পরিবর্তে মৌখিক পরীক্ষায় নম্বর বাড়ানোসহ লিখিত পরীক্ষার পাসনম্বর কমানোর এই উদ্যোগ বিভিন্ন নিয়োগ কমিটিকে অতিরিক্ত ক্ষমতা প্রদান করবে বলে মনে করা অসঙ্গত নয়। বিষয়টি পুনর্বিবেচনার অবকাশ রয়েছে বলে আমাদের মনে হয়। লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষার ভারসাম্যপূর্ণ মূল্যায়নের মাধ্যমে প্রার্থীর মেধাগত অবস্থান ও অন্যান্য উৎকর্ষতা নিরূপণ সম্ভব হয়। যখনই এই ভারসাম্য লংঘিত হয় তখনই বিপত্তির আশঙ্কা প্রবল হয়।
মৌখিক পরীক্ষায় নম্বর বাড়ানোর নেতিবাচক প্রভাব স্বীকার করে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা ডা. জাহিদ উর রহমান বলেছেন, ‘ভাইবা যেহেতু সাবজেক্টিভ, তাই সেখানে কারসাজি বা পছন্দের কাউকে সুবিধা দেয়ার সুযোগ তুলনামূলকভাবে বেশি। এ বিষয়ে দ্বিমত করছি না’। সরকারের একজন দায়িত্বশীল উপদেষ্টাই যেখানে সংশয় প্রকাশ করেছেন সেখানে নবপ্রবর্তিত ব্যবস্থাটি সরকারি নিয়োগে মেধার মূল্যায়ন বাড়ানো ও অস্বচ্ছতা—দুর্নীতি ঠেকানোয় কেমন ভূমিকা রাখবে তা সহজেই অনুমেয়। প্রকৃত মেধাবীদের শিক্ষা জীবন শেষে উপযুক্ত চাকুরি পাওয়ার অধিকার রয়েছে। দেশে সরকারি চাকুরির সংখ্যা একেবারেই কম। বিশেষ করে প্রতিবছর দেশ থেকে যে পরিমাণ শিক্ষিত জনবল তৈরি হচ্ছে সে তুলনায় সরকারি চাকুরির সুযোগ অত্যন্ত সীমিত। অথচ বহু শিক্ষার্থীর স্বপ্ন থাকে একটি সরকারি চাকুরি লাভের। মেধা থাকা সত্ত্বেও যখন কেউ অসঙ্গত ব্যবস্থার কারণে বঞ্চিত হন তখন সেটি জাতীয় লজ্জার বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। এমন অবস্থায় যদি সরকারি চাকুরির একটি অংশকে এমন ব্যক্তি বা কমিটি বিশেষের ‘পছন্দ—নির্ভর’ করে তোলা হয় তাতে দেশের অপূরণীয় ক্ষতি সাধিত হবে। তখন সরকারি খাত মেধা শূন্যতায় পতিত হবে। নতুৃন বিধিমালা নিয়ে ইতোমধ্যে শিক্ষার্থীসহ যেসব পক্ষ বিরোধিতা করছেন, তা সরকারের আমলে নেয়া দরকার। নতুবা এই বিষয়টি নতুন বৈষম্যের জন্ম দিতে পারে। তাই একটি বিতর্কহীন নিয়োগ কাঠামো দাঁড় করানোর জন্য সরকারের দৃষ্টি নিবদ্ধ করা দরকার।
সম্পাদকীয় থেকে আরো পড়ুন