প্রকাশিত: ০৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ২২:৫১
জেলা শহরের নিয়ন্ত্রণহীন যানজট সমস্যা দূরিকরণে সোমবার দিনভর সুনামগঞ্জ পৌরসভা রাস্তার পাশের অবৈধ দোকানপাট উচ্ছেদ ও লাইসেন্সবিহীন ব্যাটারিচালিত ইজিবাইক ও রিক্সা আটকের অভিযান পরিচালনা করেছে। শহরবাসীর যানজট সংক্রান্ত অবর্ণনীয় দুর্ভোগ কমাতে পৌরসভার এই অভিযানকে আমরা স্বাগত জানাই। লক্ষ্য করার বিষয় হলো, মাঝেমধ্যেই এ রকম অভিযান পরিচালনার মাধ্যমে রাস্তা দখল করে রাখা দোকান ও ভাসমান ব্যবসায়ীদের উচ্ছেদ করা হয়, কিন্তু এতে স্থায়ী কোনো সুফল পাওয়া যাচ্ছে না। উচ্ছেদের অল্প পরেই যথারীতি সড়ক ও ফুটপাত দখল করে এইসব ভাসমান ব্যবসায়ীদের তৎপরতা শুরু হয়। এমনও দেখা যায়, সড়কের এক মাথায় অভিযান শুরু করা হলে পুরো বাজারের ভাসমান ব্যবসায়ীরা খবর পেয়ে যান এবং দ্রুতই তাঁদের ভ্যানগাড়ি ও দোকান নিরাপদ দূরত্বে সরিয়ে অভিযান শেষ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করেন। গতকাল বেশ ঘটা করে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালিত হলো, এতে অনেক ভাসমান ব্যবসায়ীর মালামাল ও উপকরণ জব্দ করা হয়েছে, তাতে এইসব ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা আর্থিক ক্ষতিরও সম্মুখীন হয়েছেন। কিন্তু তাতেও কি এমন অবৈধ দোকানদারির দৌরাত্ম্য থেকে শহরবাসী মুক্তি পাবেন ? যে ব্যবসায়ীরা সোমবার উচ্ছেদ হলেন, তাঁরা যদি বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে না পারেন তাহলে ঝঁুকি নিয়ে আবারও পথে দোকান সাজানোর চেষ্টা করবেন। পৌরকর্তৃপক্ষ বলেছেন, পুনর্বার যাতে এই উৎপাত সড়কে দেখা না দেয় সেজন্য কঠোর নজরদারি রাখা হবে। কেউই আসলে ঝঁুকি নিয়ে ব্যবসা বা অন্য কোনো কাজে নিয়োজিত হতে চায় না। সকলে নিরাপদ কর্মসংস্থানই প্রত্যাশা করেন। কিন্তু ওই ধরনের কর্মপরিবেশের অভাব থাকার কারণেই নিত্য দুর্ভোগ, অভিযানের আশঙ্কা এবং ঝঁুকি নিয়ে এরা রাস্তার পাশে দোকান সাজিয়ে বসেন। গ্রামে যথেষ্ট কর্মসংস্থান না থাকায় এখন মানুষের শহরমুখী ঢল বেড়েছে। শহরে কোনোকিছু একটা করে খাওয়া যায়— এমন এক ধারনার বশবর্তী হয়ে দলে দলে মানুষ নিজ নিজ গ্রাম ছেড়ে শহর এলাকায় চলে আসে। গ্রামীণ কর্মসংস্থানের উপযুক্ত সুযোগ থাকলে মানুষের বাস্তুচ্যুতির প্রবণতা কমে আসতো, তখন গ্রাম—শহর সর্বত্রই কাম্য স্থিতাবস্থা বজায় থাকতো। ওই ধরনের সামাজিক কাঠামো দাঁড় না করানো পর্যন্ত কোনো না কোনো আকারে ও প্রকারে শহরের পরিবেশ নষ্ট করার বাস্তবতা বিদ্যমান থাকবে। শহরের সড়কের অবৈধ দখলমুক্ত করার অভিযানকে টেকসই করতে চাইলে ভাসমান দোকানিদের বিকল্প কর্মসংস্থান ও ব্যবসার বিকল্প জায়গার ব্যবস্থা করে দিতে হবে। একইসাথে সবকিছু হাতের নাগালে পেয়ে যাওয়ার আমাদের নাগরিক অভ্যাসের পরিবর্তন ঘটানোও জরুরি। নির্দিষ্ট পণ্যের জন্য নির্দিষ্ট জায়গায় যাওয়ার অভ্যাস গড়ে উঠা জরুরি। পণ্যভিত্তিক নির্দিষ্ট বাজারের জন্য সুনামগঞ্জ পৌরসভাকে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।
লাইসেন্সবিহীন ব্যাটারিচালিত ইজিবাইক ও রিকসা উচ্ছেদের বিষয়টি কেবলমাত্র পৌরসভার একক তৎপরতায় বন্ধ হবে বলে আমাদের মনে হয় না। কারণ দেশের প্রচলিত বাজার ব্যবস্থা থেকেই এইসব অবৈধ যানবাহন সংগ্রহ করা হয়েছে। লাইসেন্স ছাড়াই চলা যায়— এমন একটি মনোস্তাত্ত্বিক পরিবেশও চালু হয়েছে, যে কারণে অনেকেই নিয়ম লংঘন করে এইসব যানবাহন রাস্তায় নামাচ্ছেন, চালকরা চালাচ্ছেন। যদি সর্বত্র আইন মানার সুসংস্কৃতি গড়ে তোলা সম্ভব হতো তাহলে রাস্তায় এতো বিপুল অবৈধ যানের উপস্থিতি হতো না। যেকোনো সমস্যা প্রকটাকার ধারণ করলেই কেবল আমাদের দেশে সেটি নিয়ে মাথা ঘামানো হয়। প্রতিষেধকধর্মী কাজে আগ্রহের অভাব লক্ষণীয়ভাবে অধিক। ব্যাটারিচালিত যানবাহন বিক্রির ক্ষেত্রেই সরকারের উপযুক্ত নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা দরকার ছিলো। যে অবৈধ যানবাহন অতি সহজেই বাজার থেকে ক্রয় করা যায়, সড়কে সেই যানকে নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন কাজই বটে। উপরে বর্ণিত নিরাপদ কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করার বিষয়টিও এখানে সমান প্রযোজ্য।
মানুষ কিছু করে খেতে চায়। কর্মক্ষম মানুষের এই চিরন্তন অভ্যাস বিকাশমানতার লক্ষণ। মানুষের এই কর্ম করার ইচ্ছাকে আইনসম্মত ও নিরাপদ রাখার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের বিশাল ভূমিকা। ‘ভাত দেয়ার মুরোদ নাই, কিল দেয়ার গোঁসাই’ ধরনের ইচ্ছা নিয়ে সমাজে বিরাজিত সমস্যার বহুমুখী চাপ সামাল দেয়া সাঁতরিয়ে উত্তাল সাগর পারি দেয়ার মতোই অবাস্তব কষ্টকল্পনা। এজন্য কাম্য সমাজ ও রাষ্ট্র বিনির্মাণের জায়গায় সরকারের প্রচুর কাজ করতে হবে। উচ্ছেদ সাময়িক সমাধান আনতে পারে হয়তো, কিন্তু সমাধানকে চিরস্থায়ী করতে হলে সমস্যার সকল ছিদ্রপথ বন্ধ করার দিকে মনোযোগী হতে হবে। অতিরিক্ত জনসংখ্যার ভারে আমাদের দেশটি খুব টালমাটাল। উপযুক্ত পরিচর্যা করলে এই জনসংখ্যা আমাদের মূল্যবান সম্পদে পরিণত হবে। সেদিকেই নজর দেয়া জরুরি।
সম্পাদকীয় থেকে আরো পড়ুন