প্রকাশিত: ১০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ২১:৩৯
মধ্যনগর উপজেলার গলহা উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে নানা ধরনের দুর্নীতিগ্রস্ততার যে অভিযোগ উঠেছে তা হতাশা ও লজ্জাজনক। শিক্ষকরা সরাসরি জাতি গঠনের কাজে জড়িত। তাঁদের হাত ধরেই আমাদের নতুন প্রজন্ম শিক্ষা লাভ করে, পরে এরাই জাতির নেতৃত্ব প্রদান করে। উন্নত নাগরিক তৈরির জায়গা— শিক্ষা প্রতিষ্ঠান যখন দুর্নীতির অভয়াশ্রমে পরিণত হয় তখন আমরা সুনাগরিক পাব কোত্থেকে ? গতকাল দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে প্রকাশিত একটি সংবাদ থেকে জানা যায়, ওই বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে অনিয়ম, দুর্নীতি, স্বেচ্ছাচারিতা, অর্থ আত্মসাৎ, শিক্ষার্থীর বৃত্তির টাকা আত্মসাৎ, টেস্ট পরীক্ষায় অংশ না নিয়েও টাকার বিনিময়ে এসএসসি পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগ দেয়া ইত্যাদি অভিযোগ আনা হয়েছে। গলহা গ্রামের বাসিন্দা মো. ওয়াসিম মিয়া মধ্যনগরের উপজেলা নির্বাহী অফিসারের নিকট প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। যমুনা দেবী ও লাকী রানী শীল নামের দুই অভিভাবকের পৃথক অভিযোগ থেকে আরেকটি গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ অনুসারে তাঁদের সন্তানরা বৃত্তিপ্রাপ্ত হলেও সরকারি বৃত্তির টাকা দেয়া হয়নি। প্রধান শিক্ষক নানা অজুহাত ও টালবাহানা করে বৃত্তির অর্থ আটকে রেখেছেন অথবা অসৎ অভিপ্রায়ী হয়েছেন।
একজন প্রতিষ্ঠান প্রধানের বিরুদ্ধে একটি অভিযোগ উঠা মানেই তাঁকে দুর্নীতিবাজ বলার অবকাশ নেই। উপযুক্ত তদন্তের মাধ্যমে প্রমাণিত হলেই কেবল কাউকে দুর্নীতিবাজ সাব্যস্ত করা যায়। আমাদের দেশে সাধারণত অভিযুক্তরা সদর্পে অভিযোগ অস্বীকার করেন। কিন্তু গলহা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক তাঁর বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগ বিষয়ে গণমাধ্যমকর্মীর সাথে কোনো কথা বলতে রাজি হননি। বারংবার চেষ্টা করেও প্রতিবেদক প্রধান শিক্ষকের বক্তব্য প্রচার করতে পারেননি। এতে প্রধান শিক্ষক নিজেকে নির্দোষ দাবির একটি মোক্ষম সুযোগ হারালেন। সংবাদকর্মীকে তিনি নিজের পক্ষের কথাগুলো তোলে ধরতে পারতেন। এতে সকলেই মূল বিষয়ে কিছু ধারণা করতে সক্ষম হতেন। প্রধান শিক্ষক গণমাধ্যমকে এড়িয়ে যাওয়ায় অভিযোগের বিষয়বস্তু একতরফা হয়ে যায়। প্রধান শিক্ষকের এমন পলায়নপরায়ণতার কারণে উত্থাপিত অভিযোগের মধ্যে যে বেশকিছু সত্যতা থাকতে পারে সে বিষয়েও ধারণা জন্মগ্রহণ করে। উপজেলা নির্বাহী অফিসার, মধ্যনগর অভিযোগ পাওয়ার বিষয় স্বীকার করে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের কথা জানিয়েছেন। উপর্যুক্ত বিদ্যালয় ও প্রধান শিক্ষকের ভাবমূর্তির স্বার্থে আনীত অভিযোগের দ্রুত নিরপেক্ষ তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনা এবং তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করা দরকার। যদি তিনি সত্যিকার অর্থে দোষী হয়ে থাকেন তাহলে বিধি—বিধানের আলোকে অপরাধীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ বাঞ্ছনীয়। অভিযোগ প্রমাণ না হলে অভিযোগকারীকে আইনের কাঠগড়ায় তুলতে হবে।
দুর্নীতি—অনিয়ম আমাদের সমাজের গভীরে শিকড় গেঁড়ে বসে গেছে। যেখানেই যাঁর সুযোগ আছে সেখানেই তিনি দুর্নীতির মাধ্যমে ব্যক্তিগতভাবে লাভবান হওয়া থেকে বিরত থাকতে পারেন না। উদ্বেগের বিষয় হলো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোও এখন নানা ধরনের দুর্নীতিগ্রস্ততার মধ্যে ঢুকে গেছে। মাঝে—মধ্যেই বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে এরূপ অভিযোগ উঠে।
আরও পরিতাপের বিষয় হলো, উত্থাপিত এসব অভিযোগ কী প্রক্রিয়ায় নিষ্পত্তি হয়, অভিযুক্ত কখনও সাজার সম্মুখীন হন কি—না; সে—সব খবর পরে আর পাওয়া যায় না। ‘ম্যানেজ’ নামক প্রচণ্ড শক্তিধর এক প্রপঞ্চের স্পর্শে যাবতীয় অভিযোগ হাওয়া হয়ে যায়। দেশ ও জাতির স্বার্থে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে সামাজিক এই ভয়ানক ব্যাধির উর্দ্ধে তুলে আনাকে অগ্রাধিকার দেয়া উচিৎ। নতুবা শিক্ষার্থীরা পুঁথিগত বিদ্যা অর্জনের ঘাটতিসহ অনৈতিকতা, বিশৃঙ্খল মনোবৃত্তি অর্জন প্রভৃতি নানা অনাচারের দীক্ষাও গ্রহণ করবে। সাধারণ দুর্নীতির চাইতেও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের দুর্নীতি ভয়ানক ও সুদূরপ্রসারী। কারণ এতে একটি গোটা প্রজন্ম ভুল শিক্ষা নিয়ে গড়ে উঠে। এই শিক্ষার্থীরা যখন দেখবে তাঁদের শ্রদ্ধাস্পদ শিক্ষক দুর্নীতি করেও বুক ফুলিয়ে হাঁটেন, তখন ওই দুনীতিকেই তাঁরা আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করার মনোস্তাত্ত্বিক ভিত্তিভূমি পেয়ে যায়। শিক্ষকরা এক একটি এলাকার প্রজন্মকে যোগ্যতা—দক্ষতায় সুনাগরিক হিসেবে তৈরির মহান দায়িত্ব পালন করেন। শিক্ষক সকল শিক্ষার্থীর নিকট অনুকরণীয়—অনুসরণীয় আদর্শ। আদর্শিক এই ভিত্তিপ্রস্তরকে যেকোনো মূল্যে আমাদের রক্ষা করতে হবে। নতুবা অবক্ষয়ের চলমান নিম্নমুখী প্রবণতার ে¯্রাতের মুখে বাঁধ দেয়া কখনও সম্ভব হবে না। আমরা আশা করি গলহা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে উঠা অভিযোগের সত্য—মিথ্যা দ্রুত যাচাই করে ওই প্রতিষ্ঠানের সামনের দিনের চলার পথ সুন্দর ও মসৃন করার ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। নির্দোষ ব্যক্তিকে দুর্নীতিবাজ বলে যেমন কলঙ্কিত করা কাম্য নয় তেমনি দোষী ব্যক্তির উপযুক্ত শাস্তি নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
সম্পাদকীয় থেকে আরো পড়ুন