প্রকাশিত: ১০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ২২:২৩
জেলার অন্যতম বালু পাথর মহালে ধোপাজানে লুট ঠেকাতে এবার সিসি ক্যামেরায় নজরদারী করছে পুলিশ। বালু পাথর মহাল সিসি ক্যামেরায় নজরদারী দেশে এটাই প্রথম। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পটপরিবর্তনের ইজারাবিহীন এই বালু মহাল কয়েকদফায় লুটপাট হয়। তাতে কয়েকশ কোটি টাকার রাজস্ব বঞ্চিত হয় সরকার।
দেশের উত্তর—পূর্বাঞ্চলের শেষ সীমানা ভারতের মেঘালয় পাহাড় থেকে নেমেছে সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার ডলুরা চলতি নদী, এর প্রবেশ মুখেই জেলার একমাত্র বালুমিশ্রিত পাথর কোয়ারি ধোপাজান। স্থানীয়দের জীবন—জীবিকা আর পরিবেশ বিপর্যয় ঠেকাতে ২০১৮ সালে কোয়ারি থেকে বালু উত্তোলন বন্ধে আদেশ দেন আদালত। দীর্ঘবছর বালু উত্তোলন বন্ধ থাকার পর ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর শুরু হয় হরিলুট। লুট বন্ধ না করে উল্টো বিভিন্ন অভিযোগে প্রত্যাহার হন তৎকালীন এসপি আনোয়ার হোসেন। এরপর প্রশাসন তৎপর হলে ফের বন্ধ হয় বালু উত্তোলন।
বালুমহালে উত্তোলন বন্ধ থাকলেও সরকারি সিদ্ধান্তে গেল বছরের অক্টোবর মাসে সরকারি সিদ্ধান্তে নদীতে চলে বালু উত্তোলন। ঢাকা—সিলেট মহাসড়ক উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য মাত্র এক কোটি টাকা রাজস্বের বিপরীতে ১ কোটি ২১ লাখ ঘনফুট বালু উত্তোলনের অনুমতি পায় বিআইডব্লিউটিএ। এরপর থেকেই নদীর একাধিক স্থানে পরিবেশ বিধ্বংসী ড্রেজার আর বোমা মেশিনের তাণ্ডব চালায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান লিমপিড ইঞ্জিনিয়ারিং। অনুমতি দেয়ার পর থেকেই নদীরপাড়ের বসত ভিটা, ফসলি জমি, বাঁধ, কবরস্থান, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, মসজিদসহ নানা স্থাপনা হুমকির মুখে পড়ে। স্থানীয়রা নিজেদের বাঁচাতে আন্দোলন ও প্রতিবাদ শুরু করেন। এরপর লিমপেডের উত্তোলন বন্ধ হয়। কিন্তু বন্ধ হয়নি রাতের অঁাধারে ড্রেজার মেশিন দিয়ে বালু লুটের তাণ্ডব। সমালোচনার মুখে পড়ে পুলিশ। ধোপাজান নদীর মুখে পুলিশের চেকপোস্ট বসিয়েও বন্ধ হচ্ছিল না বালু লুট।
স¤প্রতি সুনামগঞ্জ সদর থানার উদ্যোগে ধোপাজানে লুট ঠেকাতে পুলিশ চৌকির পাশাপাশি সিসি ক্যামেরার মাধ্যমে নজরদারি শুরু হয়েছে। বালু লুটেরা চক্র তাতেও থামে নি। তারা এবার গ্রামীণ বিভিন্ন সড়ক পথে ছোট ছোট যানবাহন দিয়ে বালু নেবার চেষ্টা করে। তবে বেশি প্রশ্রয় না দিলে এখন আর বেশি পরিমাণের বালু লুট সম্ভব নয়।
স্থানীয়রা বলছেন, আগে রাতের আঁধারে কিংবা বিভিন্নভাবে ম্যানেজ করে নৌকায় করে বালু নিয়ে যাওয়ার সুযোগ ছিল। কিন্তু পুলিশ চৌকিতে সিসি ক্যামেরা স্থাপনের পর নজরদারি বেড়েছে। ফলে অবৈধভাবে বালু পরিবহনে জড়িতদের মধ্যে তৈরি হয়েছে আতঙ্ক।
নদীর পাড়ের বাদেরটেক গ্রামের আবু সাঈদ বলেন, রাতে চুরি করে অনেকে বালু নিয়ে যেতেন। এজন্য পুলিশ ক্যাম্পে সিসি ক্যামেরা লাগানো হয়েছে। এখন কেউ যাওয়ার সাহস করে না। পুলিশ ধরলে নৌকাসহ থানায় নিয়ে যায়।
একই গ্রামের মহিনুর মিয়া বলেন, আগে চুপচাপে ম্যানেজ করে নৌকা দিয়ে বালু নিয়ে যাওয়া হতো। এখন সিসি ক্যামেরা লাগানোর কারণে সেই সুযোগ বন্ধ হয়ে গেছে। ম্যানেজ করা এবং ম্যানেজ হওয়া দুটিই বন্ধ হয়েছে।
এই গ্রামের এক তরুণ নাম গোপন রাখার শর্ত দিয়ে বলেন, এখনও মসজিদ, হাসপাতাল এসব প্রতিষ্ঠানের কথা বলে ১০ হাজার বালুর অনুমতিপত্র নিয়ে এক লাখ নেবার চেষ্টা হয়।
স্থানীয় শ্রমিকদের দাবি, প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষার পাশাপাশি বৈধভাবে শ্রমিকদের কর্মসংস্থানের সুযোগও নিশ্চিত করতে হবে।
সবুজ মিয়া বললেন, নদী বন্ধ হওয়ার পর ২০২৪ সালের পাঁচ আগস্টের পর লুটেরাচক্র হাজার হাজার নৌকায় অবৈধভাবে বালু নিয়ে গেছে। এখন সিসি ক্যামেরা লাগানোর পর নজরদারি অনেক বেড়েছে। তারা চান, এই প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষা করা হোক এবং সনাতন পদ্ধতিতে বৈধভাবে বালু পাথর উত্তোলনের সুযোগ আবার চালু করা হোক, যাতে স্থানীয় শ্রমিকরা সকাল—সন্ধ্যা হাতে—বেলচায় কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করতে পারেন।
সুনামগঞ্জ সচেতন নাগরিক কমিটি (সনাক) সহ—সভাপতি খলিল রহমান বলেন, সরকারি সম্পত্তি রক্ষায় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে লোক দেখানো নয়, আন্তরিকভাবে কাজ করতে হবে। সুনামগঞ্জের বালু—পাথর নিয়ে নানা ধরনের আলোচনা রয়েছে এবং সম্পদ রক্ষায় দায়িত্বশীলদের প্রতি মানুষের আস্থাহীনতাও রয়েছে। প্রশাসনের দায়িত্ব হলো সেই আস্থাহীনতার জায়গায় আস্থা ফিরিয়ে আনা। কারণ এই সম্পদের সঙ্গে প্রকৃতি, পরিবেশ এবং মানুষের জীবন—জীবিকা জড়িত।
ধোপাজান নদীর পুলিশ চৌকিতে বুধবার দায়িত্ব পালনকারী এএসআই জহিরুল বলেন, কোনো নৌকা যদি তাদের নজরদারি এড়িয়ে চলে যায়, সিসি ক্যামেরার ফুটেজের মাধ্যমে নৌকাটি শনাক্ত করে ধরা সম্ভব। নৌকাটি কেমন ছিল বা সেখানে কারা ছিল, সেই ছবি ফুটেজ দেখিয়ে আশপাশের মানুষের কাছ থেকেও তথ্য নেওয়া যাবে।
সুনামগঞ্জ সদর থানার ওসি রতন সেখ বললেন, ধোপাজান নদীর মুখে লাগানো অত্যাধুনিক ক্যামেরা আমার মোবাইলের সঙ্গে কানেক্টিং রয়েছে। ওখান দিয়ে কোন কিছু আসলেই আমার মোবাইলে পাঁচ সেকেন্ডের ভিডিও চলে আসে। এসপি সাহেবও এই বিষয়টি মনিটরিং করেন। বিদ্যুৎ না থাকলেও ক্যামেরা চলবে। ওখান থেকে ফুটেজ আসবে। পুলিশ চৌখিতে কেউ অপকর্ম করারও সুযোগ নেই। ইতিমধ্যে ওখানকার একজন কনস্টেবলকে ক্লোজ করা হয়েছে।
পুলিশ সুপার এ বি এম জাকির হোসেন বললেন, এই মনিটরিং যথেষ্ট নয়। ইজারাবিহিন বালু মহাল থেকে বালু লুট, ইজারা দেওয়া মহালে আইন না মেনে সকাল সন্ধ্যা হাতে বেলচায় বালু উত্তোলনের বদলে ড্রেজার চালানো, পাড়কাটা এবং সড়ক, মসজিদ ও হাসপাতালের দোহাই দিয়ে যে পরিমাণ বালু তোলার কথা, বাস্তবে এর চাইতে শতগুণ বেশি বালু লুট ঠেকাতে হলে আরও কঠোর হতে হবে। সুনামগঞ্জে পুলিশ সম্প্রতি বালু লুটের ঘটনায় ৬৬ টি মামলায় ৭৪১ জনকে আসামি করেছে। ৬০ জনকে হাতে—নাতে ধরেছে। কোন আসামিই হাজতবাস করে নি। আইনের ফাঁক—ফোকরে এরা বেরিয়ে গেছে। এই অবস্থায় কার্যকর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে হলে ট্রাস্কফোর্স গঠন করে ধারাবাহিকভাবে অভিযান পরিচালনা করতে হবে। বেআইনি কাজ যারা করবে তাদের শাস্তিও তখন সঙ্গে সঙ্গেই কার্যকর হবে।
উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন