প্রকাশিত: ১১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ২৩:১২
সিল্টেশন (পলিভরাট), অপরিকল্পিত বাঁধ, অতিরিক্ত কীটনাশক ও সার ব্যবহার, মাছের আবাসস্থল ধ্বংস, অনিয়ন্ত্রিত পর্যটন এবং জনসংখ্যার চাপ—বিভিন্ন কারণে টাঙ্গুয়ার হাওরের জলাভূমি সম্পদ ও জীববৈচিত্র্য ক্রমেই হুমকির মুখে পড়ছে। এ অবস্থায় টাঙ্গুয়ার হাওর রক্ষায় সরকার, বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, জেলা ও উপজেলা প্রশাসন, স্থানীয় জনগোষ্ঠী, রাজনৈতিক এবং সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সমন্বিতভাবে কাজ করার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব ড. ফাহমিদা খানম।
তিনি বলেছেন, হাওরের সমস্যাগুলো একক কোনো প্রতিষ্ঠানের পক্ষে সমাধান করা সম্ভব নয়। খনন, পানি ব্যবস্থাপনা, মাছ ও কৃষি উৎপাদন, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং পর্যটন ব্যবস্থাপনাসহ বিভিন্ন বিষয় সমন্বিতভাবে মোকাবিলা করতে হবে। সবাই একসঙ্গে কাজ করলে টাঙ্গুয়ার হাওরকে পুনরুদ্ধার ও সুরক্ষার কাজ এগিয়ে নেওয়া সম্ভব। তিনি প্রকল্পের কাজ নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শেষ করার ওপরও গুরুত্ব দেন। বিদেশি অনুদানে পরিচালিত প্রকল্পের ক্ষেত্রে সময়মতো কাজ শেষ করে বাস্তব সুফল দেখাতে পারলে ভবিষ্যতে আরও আন্তর্জাতিক সহায়তা পাওয়ার সুযোগ তৈরি হবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
শুক্রবার সকাল ১০টায় সুনামগঞ্জ সার্কিট হাউজের সভা কক্ষে পরিবেশ অধিদপ্তর বাস্তবায়নাধীন ‘টাঙ্গুয়ার হাওর জলাভূমি বাস্তুতন্ত্রের সমাজভিত্তিক ব্যবস্থাপনা’ প্রকল্পের আওতায় আয়োজিত ‘জলাভূমি সম্পদের সঠিক ব্যবহার বিষয়ক মতবিনিময়’ কর্মশালায় তিনি এসব কথা বলেন। কর্মশালায় পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের উপসচিব (পরিবেশ—২ শাখা) মো. আমিরুল কায়ছার, প্রকল্প পরিচালক ও পরিবেশ অধিদপ্তরের উপপরিচালক (ঢাকা গবেষণাগার) শাহেদা বেগমসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। কর্মশালায় সভাপতিত্ব করেন জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মিনহাজুর রহমান।
ড. ফাহমিদা খানম বলেন, হাওরের যেসব জায়গায় খনন প্রয়োজন সেগুলোতে ব্যাপক সিল্টেশন হয়েছে। গত তিন—চার বছরে সিল্টেশন বেড়ে যাওয়ার কথা তিনি গ্রাম পর্যায়ে স্থানীয় মানুষের কাছ থেকেও শুনেছেন। স্থানীয় মানুষের বক্তব্যের উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি বলেন, ভারতের সীমান্তের ওপারে বোমা মেরে পাথর উত্তোলনের কারণে সিল্টেশন বাড়তে পারে— এমন কথাও স্থানীয়রা তাকে জানিয়েছেন। তবে এ বিষয়টি নিয়ে আরও যাচাই ও সংশ্লিষ্ট পর্যায়ে আলোচনা প্রয়োজন বলে তার বক্তব্যে উঠে আসে।
তিনি বলেন, সিল্টেশন সমস্যার সমাধানে দেশের ভেতরে পানি উন্নয়ন বোর্ডসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ ও সমন্বয় করতে হবে। একই সঙ্গে এটি আন্তঃসীমান্ত বা ‘ট্রান্সবাউন্ডারি’ বিষয় হওয়ায় প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়টিও বিবেচনায় নিতে হবে।
টাঙ্গুয়ার হাওরের পানি প্রবাহ ও মাছের বিচরণে বাঁধের প্রভাব নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন সচিব। তিনি বলেন, কিছু বাঁধ আসলে ডুবন্ত বাঁধ হিসেবে থাকার কথা থাকলেও সেগুলো উঁচু করে ফেলা হচ্ছে। সেজন্য বর্ষার স্বাভাবিক পানি চলাচলে বাধা সৃষ্টি হচ্ছে। এতে মানুষ ও গবাদিপশুর আশ্রয়ের জন্য ব্যবহৃত হাওরের বিভিন্ন কান্দা বা উঁচু আশ্রয়স্থল হারিয়ে যাচ্ছে। এসব কান্দা রক্ষা করা জরুরি। বাঁধ নির্মাণের ক্ষেত্রে প্রকৌশলগত নকশা অনুসরণ করা হয়। তাই বাঁধ নির্মাণ ও সংস্কারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে কান্দা ও পানি প্রবাহ রক্ষার বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে।
এছাড়া বাঁধের কারণে ফিশ পাস বন্ধ হয়ে যাওয়ার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে দেখার কথা বলেন তিনি। নতুন পানি প্রবেশের সঙ্গে মাছ যাতে হাওরে প্রবেশ করতে পারে, সে জন্য উপযুক্ত ফিশ পাসের ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন বলে তিনি উল্লেখ করেন।
এসময় হাওরের অর্থনীতি ও পরিবেশের সঙ্গে কৃষি ও মৎস্য খাতের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কথাও তুলে ধরেন ড. ফাহমিদা খামন। তিনি বলেন, শীত মৌসুমে দেশের ধান উৎপাদনে হাওর এলাকার গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। আবার বর্ষায় এ অঞ্চল থেকে বিপুল পরিমাণ মাছ উৎপাদিত হয়। ফলে কৃষি ও মৎস্য—দুই খাতের উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষা করাও জরুরি।
কৃষি উৎপাদন বাড়াতে কৃষকেরা কীটনাশক, হার্বিসাইড (আগাছানাশক) ও অতিরিক্ত সার ব্যবহার করছেন। এসব রাসায়নিক বৃষ্টির পানি ও অন্যান্য প্রবাহের মাধ্যমে হাওরে গিয়ে মাছের ওপর ক্ষতিকর প্রভাব ফেলতে পারে বলে তিনি উল্লেখ করেন। তার মতে, শীত মৌসুমে যেসব বিল ও জলাশয়ের নির্দিষ্ট পকেটে দেশীয় ছোট মাছ টিকে থাকে, সেসব এলাকা বিশেষভাবে সংরক্ষণ করতে হবে। একই সঙ্গে কৃষিজমি থেকে পেস্টিসাইড (কীটনাশক), হার্বিসাইড ও অতিরিক্ত সার যাতে হাওরের পানিতে না যায়, সে ব্যবস্থাও করতে হবে।
হাওর এলাকায় কীটনাশকের ব্যাপক ব্যবহারের বিষয়টি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি বলেন, গত বছর হাওর এলাকায় পেস্টিসাইডের ব্যাপক ব্যবহার বেড়েছে এবং এর কারণে মাছ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে— এমন বিষয় নিয়ে ঢাকায় মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়, কৃষি মন্ত্রণালয় এবং পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের মধ্যে একাধিকবার আলোচনা হয়েছে।
কীটনাশক বিক্রেতা বা ডিলারদের নিয়ন্ত্রণের ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, অনেক ক্ষেত্রে ডিলাররা কৃষকদের একাধিক পেস্টিসাইড একসঙ্গে ব্যবহার করার পরামর্শ দেন, যা জলজ প্রাণীর জন্য মারাত্মক ক্ষতির কারণ হতে পারে। এ অবস্থায় জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে কীটনাশকের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ, কৃষকদের সচেতন করা এবং কম কীটনাশক ব্যবহারের পদ্ধতি চালু করার উপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। প্রয়োজনে সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা বা আইপিএম পদ্ধতি ব্যবহারের কথাও তিনি বলেন।
টাঙ্গুয়ার হাওরের বিল পুনরুদ্ধারের পরিকল্পনা তুলে ধরে ড. ফাহমিদা খানম জানান, প্রকল্পের আওতায় প্রথমে রোয়া বিল পুনরুদ্ধার কার্যক্রম পাইলট হিসেবে নেওয়া হবে। এটি সফল হলে পর্যায়ক্রমে অন্যান্য বিলেও বিনিয়োগ করে পুনরুদ্ধারের কাজ করা হবে। তিনি বলেন, টাঙ্গুয়ার হাওরের উন্নয়ন বলতে শুধু একটি নির্দিষ্ট বিষয়কে বোঝালে হবে না। এর সঙ্গে জীববৈচিত্র্য, স্থানীয় মানুষের জীবিকা, কৃষি, মৎস্য, পর্যটন ও জনসংখ্যার চাহিদা—সবকিছু বিবেচনায় নিতে হবে।
তিনি আরও বলেন, টাঙ্গুয়ার হাওর রামসার সাইট ঘোষণার পর দীর্ঘ সময়ে প্রত্যাশিত উন্নয়ন হয়নি। এর মধ্যে জনসংখ্যা বেড়েছে, মানুষের খাদ্য ও আয়ের চাহিদা বেড়েছে এবং পর্যটনও বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে বর্তমান বাস্তবতা বিবেচনা করেই ভবিষ্যৎ ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা করতে হবে।
অনিয়ন্ত্রিত পর্যটন টাঙ্গুয়ার হাওরের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে উল্লেখ করে ড. ফাহমিদা খানম বলেন, পর্যটন বন্ধ করে দেওয়াই একমাত্র সমাধান নয়, বরং কোন এলাকায় পর্যটক যেতে পারবেন, কোন এলাকায় যেতে পারবেন না এবং কোন এলাকাগুলো সম্পূর্ণ সংরক্ষিত থাকবে— এসব নির্ধারণ করে নিয়ন্ত্রিত পর্যটনের ব্যবস্থা করতে হবে। প্রকল্পের আওতায় এ ধরনের পরিকল্পনা প্রণয়নের কথাও জানান তিনি।
টাঙ্গুয়ার হাওরের জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে আন্তর্জাতিক অর্থায়ন সম্পর্কে তিনি বলেন, প্রকল্পটি আন্তর্জাতিক গ্রান্ট হিসেবে গ্লোবাল এনভায়রনমেন্ট ফ্যাসিলিটি বা জিইএফের অর্থায়নে বাস্তবায়িত হচ্ছে। জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণসহ বৈশ্বিক পরিবেশগত সুবিধা নিশ্চিত করার লক্ষ্যেই এ ধরনের আন্তর্জাতিক তহবিল দেওয়া হয়। এই অর্থ মূলত জনগণের কল্যাণ ও এলাকার উন্নয়নের জন্য। তাই প্রকল্পের সুফল নিশ্চিত করতে স্থানীয় জনগণের সহযোগিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রকল্পটির মেয়াদ ২০২৯ সাল পর্যন্ত। এর মধ্যে অন্তত একটি বিল পুনরুজ্জীবিত করে সফল উদাহরণ তৈরি করা গেলে পরবর্তীতে অন্যান্য বিলেও একই ধরনের কার্যক্রম নেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।
প্রকল্প পরিচালক ও পরিবেশ অধিদপ্তরের উপপরিচালক শাহেদা বেগম বলেন, টাঙ্গুয়ার হাওরের ব্যবস্থাপনা কোনো একটি সরকারি প্রতিষ্ঠানের একক কাজ নয়। উপজেলা প্রশাসন, মৎস্য দপ্তর, হাওর অধিদপ্তর ও পরিবেশ অধিদপ্তরসহ বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। তিনি বলেন, মাছের পরিমাণ কমে যাওয়া ঠেকাতে ইতোমধ্যে বিভিন্ন এলাকায় মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হচ্ছে। তবে দীর্ঘমেয়াদে এ কাজকে টেকসই করতে সমন্বিত ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা প্রয়োজন।
প্রকল্পের উল্লেখযোগ্য কার্যক্রমের মধ্যে রয়েছে— কমিউনিটিভিত্তিক জলাভূমি ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করা, সংশ্লিষ্ট কমিউনিটি ও সরকারি কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ দেওয়া এবং স্থানীয় সম্প্রদায়ের ৩৮০টি পরিবারের বিকল্প আয় বৃদ্ধির জন্য ক্ষুদ্র উদ্যোগ ও গ্রামীণ জীবিকায় সহায়তা দেওয়া। এছাড়াও কমিউনিটির অংশগ্রহণে ২৪ কিলোমিটার কান্দায় জলাভূমি বাগান এবং ৪০০ হেক্টর এলাকায় জলাভূমি বাগান সৃজনের পরিকল্পনা রয়েছে। ২০ হেক্টর এলাকায় পলি অপসারণ, মাছ ও অন্যান্য জলজ জীববৈচিত্র্যের জন্য অভয়ারণ্য তৈরি এবং নলখাগড়ার প্রতিবেশ পুনরুদ্ধারের উদ্যোগও রয়েছে। পরিযায়ী পাখির নিরাপদ আবাসস্থল নিশ্চিত করতে ৮০০ হেক্টর জলজ আবাসস্থল পুনরুদ্ধারের পরিকল্পনাও প্রকল্পে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
হাওরে পর্যটন পরিচালনায় হাউজবোটের পরিবেশগত ও নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনার বিষয়েও শাহেদা বেগম বলেন, টাঙ্গুয়ার হাওরকে সিঙ্গেল ইউজ প্লাস্টিকমুক্ত রাখার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। হাউজবোট মালিকদের সিঙ্গেল ইউজ প্লাস্টিকের বিকল্প ব্যবহারে সচেতন করা হচ্ছে এবং বর্জ্য নির্দিষ্টভাবে ব্যবস্থাপনার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, নৌপরিবহন অধিদপ্তর হাউজবোটের ডিজাইন অনুমোদন করে। তাই প্রতিটি হাউজবোটকে নিবন্ধন এবং ডিজাইন অনুমোদন নেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে।
ডিজেলচালিত হাউজবোটে অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি বিবেচনায় ফায়ার এক্সটিংগুইশার রাখার ওপরও গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, যেসব নৌযানের নিবন্ধন বা ডিজাইন অনুমোদন নেই, সেগুলো পর্যটকদের জন্য নিরাপদ নয়। তাই স্থানীয় পর্যায়ে বিষয়টি ব্যাপকভাবে প্রচার করা দরকার।
জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মিনহাজুর রহমান বলেন, কর্মশালায় অংশীজনদের মূল্যবান মতামত ও সুপারিশ ভবিষ্যতের নীতি ও পরিকল্পনা প্রণয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। ২০২৫ সালের সরকারি হাওর সুরক্ষা আদেশ বাস্তবায়নে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। হাউজবোট সংক্রান্ত নির্দেশনা গণবিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে প্রচার করা হয়েছে। আইন লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে জেলা ও উপজেলা প্রশাসন, পরিবেশ অধিদপ্তর এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহায়তায় মোবাইল কোর্ট ও অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। ৪ দশমিক ৫ ইঞ্চির নিচে ছিদ্রযুক্ত জাল, চায়না দুয়ারিসহ নিষিদ্ধ সব ধরনের জাল ধ্বংসের পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে কয়েক টন নিষিদ্ধ জাল পুড়িয়ে ধ্বংস করা হয়েছে। এছাড়া ইসিএ কমিটি ও পর্যটন উন্নয়ন কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী যান্ত্রিক নৌকা কেবল গোলাবাড়ী পয়েন্ট পর্যন্ত চলাচলের অনুমতি পাবে। এরপর থেকে শুধু হস্তচালিত ডিঙি বা নৌকা চলাচল করতে পারবে। হাওরের পরিবেশ রক্ষায় বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। প্রতিটি হাউজবোটে সেপটিক ট্যাংক ও নির্দিষ্ট ডাস্টবিন রাখার ব্যবস্থা করা হয়েছে। উচ্চশব্দে গান বাজানো বন্ধসহ আচরণবিধি মেনে চলার বিষয়েও নিয়মিত তদারকি করা হচ্ছে। হাওর উন্নয়ন অধিদপ্তরের মাধ্যমে টেকেরঘাট এলাকায় ডাম্পিং স্টেশন তৈরির কাজ চলছে। পাশাপাশি হাওরের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় হিজল—করচসহ উপযোগী গাছ লাগানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
কর্মশালায় উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, টাঙ্গুয়ার হাওর জলাভূমি সম্পদ অবক্ষয়ের প্রধান কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে অতিরিক্ত পর্যটক ও জনসংখ্যার চাপ, ভূমি ব্যবহারের পরিবর্তন, অতিরিক্ত সম্পদ আহরণ, জলবায়ু পরিবর্তন ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ। একই সঙ্গে পলি জমে বিলের পানিধারণ ক্ষমতা কমে যাওয়া এবং পানি ও মাটির গুণগতমান হ্রাসও বড় সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
বিশেষজ্ঞ ও অংশীজনদের আলোচনায় টাঙ্গুয়ার হাওরের বিচক্ষণ ব্যবহারের মৌলিক নীতিতে প্রাকৃতিক সম্পদের দীর্ঘমেয়াদি প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা, প্রকৃত জেলেদের জন্য টেকসই মাছ ধরার পদ্ধতি বাস্তবায়ন, মৎস্য অভয়ারণ্য ও পাখির আবাসস্থল সংরক্ষণ এবং অবৈধ মাছ ধরা রোধে কমিউনিটি গার্ডের মাধ্যমে সংরক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনার কেন্দ্রবিন্দুতে রাখার কথাও বলা হয়েছে। ভূমি, পানি ও অন্যান্য প্রাকৃতিক সম্পদের টেকসই ব্যবহার নিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণে স্থানীয় জনগণের ক্ষমতায়ন এবং বিভিন্ন স্তরে সংরক্ষণ দল গঠনের প্রস্তাবও রয়েছে।
বাংলাদেশ সরকার ১৯৯৯ সালে টাঙ্গুয়ার হাওরকে প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা বা ইসিএ ঘোষণা করে। পরবর্তীতে ২০০০ সালের ১০ জুলাই রামসার সেক্রেটারিয়েট টাঙ্গুয়ার হাওরকে রামসার সাইট হিসেবে ঘোষণা করে। ফলে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক—দুই পর্যায়েই এ জলাভূমির সংরক্ষণ ও বিচক্ষণ ব্যবহার নিশ্চিত করার দায়িত্ব রয়েছে।
কর্মশালায় বক্তারা বলেন, টাঙ্গুয়ার হাওর রক্ষা শুধু পরিবেশ সংরক্ষণের বিষয় নয়, এর সঙ্গে স্থানীয় মানুষের জীবন—জীবিকা, খাদ্য নিরাপত্তা, মৎস্য ও কৃষি উৎপাদন, পর্যটন এবং দেশের জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ সরাসরি যুক্ত। তাই সরকারি সংস্থা, স্থানীয় প্রশাসন, জনগোষ্ঠী, রাজনৈতিক নেতৃত্ব এবং অন্যান্য অংশীজনকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।
উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন