প্রকাশিত: ১২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ২৩:২৪
বাউলসম্রাট শাহ আবদুল করিমের মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত বিশেষ আয়োজন ‘খবরনামা’ স্মরণানুষ্ঠান হয়েছে। অনুষ্ঠানে শাহ আবদুল করিমের জীবন, দর্শন, সৃষ্টিকর্ম, রাজনৈতিক ভাবনা এবং সমকালীন প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে আলোচনা করেন কবি ইকবাল কাগজি এবং গণশিল্পী বাউল জুবায়ের বখত সেবুল। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরের সহকারী সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলম। গানে গানে শুরু হয় ‘খবরনামা’। শুরুতেই শাহ আবদুল করিমের ‘মুর্শিদ ধন হে, কেমনে চিনিব তোমারে? দেখা দাও না, কাছে নাও না, আর কত থাকি দূরে...’ গান পরিবেশন করেন বাউল জুবায়ের বখত সেবুল।
দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর: শাহ আবদুল করিমের সৃষ্টি ও তাঁর গানের বৈচিত্র্যকে আপনি কীভাবে দেখেন?
ইকবাল কাগজি: সেবুল ভাই যে গানটি বললেন, তার মধ্যেই তাঁর বৈচিত্র্য আছে। তিনি শুরু করেছেন মরমিয়া দিয়ে, কিন্তু শেষ করেছেন বস্তুবাদে। তন্ত্র—মন্ত্র পড়ে, শাস্ত্রগ্রন্থ পড়ে তিনি কিছু পাচ্ছেন না—বাস্তব জিনিসটা কী, সেই প্রশ্ন তাঁর গানের মধ্যেই আছে। করিমের গান সাধারণত মরমিয়া ভাবনা দিয়ে শুরু হলেও শেষ পর্যন্ত তা সাধারণ মানুষের শ্রেণিসংগ্রাম ও রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। এটাই তাঁর গানের অন্যতম বৈচিত্র্য। তিনি স্বাধীনতার কথাও বলেছেন। কিন্তু সেই স্বাধীনতার মধ্যে যদি শোষণ থাকে, তাহলে সেটি প্রকৃত স্বাধীনতা নয়— এই উপলব্ধি তাঁর গানে স্পষ্ট। তিনি দেখিয়েছেন, ধনীরা উঁচু দালানে থাকে, অর্থ—সম্পদ ভোগ করে; কিন্তু তাদের চাহিদার শেষ নেই। অন্যদিকে কৃষক ও শ্রমিক উৎপাদনে কাজ করেও যথাযথ মজুরি পায় না, তাদের জীবন ভালো থাকে না, চিকিৎসাসেবাও তারা সঠিকভাবে পায় না।
দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর: তাহলে কি বলা যায়, শাহ আবদুল করিমের গান শুধু বিনোদনের গান নয়?
ইকবাল কাগজি: না, বিনোদন নয়। তাঁর গান মানুষের জীবনসংগ্রামের কথা বলে।
দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর: তাঁর গানকে কি দর্শন, প্রতিবাদ এবং মানুষের পক্ষে মানুষের জয়গান বলা যায়?
ইকবাল কাগজি: অবশ্যই। দুঃখ জয়ের মন্ত্র—এটাই তো। আমরা স্বাধীনতা চাই, শোষণ—নির্যাতন চাই না। বিদেশের গোলামি চাই না। আমরা এমন স্বাধীনতা চাই, যেখানে কৃষক—শ্রমিক তাদের উৎপাদনের প্রকৃত মজুরি পাবে এবং মানুষ সুষ্ঠুভাবে জীবন পরিচালনা করতে পারবে।
আলোচনার এই পর্যায়ে বাউল জুবায়ের বখত সেবুল পরিবেশন করেন শাহ আবদুল করিমের আরেকটি গান— ‘এ জীবনে কত দুঃখ খেদিয়াছে বলো তাই, জিজ্ঞাস করি তোমার কাছে, বলো গো সাঁই...’
দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর: সমাজের নিপীড়িত মানুষের জীবনসংগ্রাম কীভাবে তাঁর গানে এসেছে?
ইকবাল কাগজি: সমাজের আর্থ—সামাজিক ব্যবস্থায় মানুষ যেভাবে নিপীড়িত ও শোষিত হয়, এক শ্রেণি যেভাবে আরেক শ্রেণীকে শাসন ও শোষণ করে—এই বাস্তবতা তাঁর গানে পর্যায়ক্রমে এসেছে। মানুষ রাজনৈতিকভাবে স্বাধীন হলেও সামাজিকভাবে স্বাধীন হয় না। তার অর্থনৈতিক নির্যাতন থাকে, সাংস্কৃতিক নির্যাতন থাকে। তাঁর গানের মধ্যে এসব বিষয় এসেছে। তিনি মাটির গান গেয়েছেন— সেখানেও শোষণ—নির্যাতনের কথা রয়েছে। ‘আগে কী সুন্দর দিন কাটাইতাম’ গানেও সমাজ ও মানুষের জীবনের পরিবর্তনের কথা এসেছে। তাঁর ‘ভাটির চিঠি’—তেও সমাজের বিবর্তন ও মানুষের জীবনচিত্র ফুটে উঠেছে। তাঁর গানকে বিভিন্নভাবে ভাগ করা যায়—গণসংগীত, ভাবগীতি, ভক্তিগীতি, বিচ্ছেদ কিংবা ধর্মীয় গান। কিন্তু তাঁর প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে কথা বলতে গেলে গণসংগীতগুলো বিশেষভাবে সামনে আসে।
দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর: শাহ আবদুল করিমের গানে তিন শত্রুর কথা এসেছে। ‘বড় শয়তান সাম্রাজ্যবাদ নতুন নতুন ফন্দি আঁটে, মধ্যম শয়তান পুঁজিবাদ বসে বসে মজা লুটে। সামন্তবাদ জালিম বটে, দয়া নাই তাহার মনে— তিন শয়তানের লীলাভূমি শ্যামল মাটির সোনার বাংলা। গরিবের বুকের রক্তে রঙিন হলো বারবার, সোনার বাংলা করল ছারখার সাম্রাজ্যবাদ শয়তানে।’ এই হচ্ছে উনার লাইনটা।
ইকবাল কাগজি: এই বক্তব্যের প্রাসঙ্গিকতা বর্তমানেও আছে। অর্থনীতিবিদ ও বিভিন্ন চিন্তাবিদ যে নব্য—উপনিবেশিকতার কথা বলেন, তার সঙ্গে এর সম্পর্ক রয়েছে। সাম্রাজ্যবাদ সরাসরি শাসন না করেও লগ্নিপুঁজির মাধ্যমে একটি দেশের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারে। শাহ আবদুল করিম তাঁর সময়ের বাস্তবতা থেকে এই শোষণব্যবস্থার বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন।
দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর: শাহ আবদুল করিমের রাজনৈতিক দর্শন কী ছিল?
ইকবাল কাগজি: রাজনৈতিক দর্শনের দিক থেকে বলা যায়, শেষ পর্যন্ত তিনি সমাজ পরিবর্তনের কথা বলেছেন। তাঁর সমাজভাবনার কেন্দ্রে ছিল সাম্য। দাসপ্রথা থেকে সামন্তপ্রথা, এরপর পুঁজিবাদ—সমাজ বিভিন্ন পর্যায় অতিক্রম করেছে। পুঁজিবাদের পর সমাজতন্ত্র এবং শেষ পর্যন্ত কমিউনিজমে যাওয়ার যে ধারণা, তাঁর সমাজভাবনার সঙ্গে সেটির মিল রয়েছে। তিনি এমন একটি সমাজ চেয়েছেন, যেখানে মানুষে মানুষে কোনো বৈষম্য থাকবে না। শেষ পর্যন্ত সব মানুষ সমান হবে— এটাই করিমের মূল বক্তব্য।
আলোচনার ফাঁকে আবারও গান পরিবেশন করেন বাউল জুবায়ের বখত সেবুল— ‘ওরে কোন মিস্ত্রি নাও বানাইলো, সে মন দেখা যায়...ঝিলমিল ঝিলমিল করে রে ময়ূরপঙ্খী নাও, ঝিলমিল ঝিলমিল করে রে ময়ূরপঙ্খী নাও।’
ইকবাল কাগজি: ভাটি বাংলার লোকজ প্রতীক, জীবন ও দর্শনের অনন্য সমন্বয় এই গানের মধ্য দিয়ে প্রকাশ পায়। শাহ আবদুল করিমকে শুধু বাউল বা লোকশিল্পীর পরিচয়ে সীমাবদ্ধ না রেখে তাঁর সামগ্রিক সৃষ্টিকে গুরুত্ব দিতে হবে। তিনি বলেন, ‘ভাবাদর্শিক দিক থেকে এটা বলা যায় যে, তিনি শেষ পর্যন্ত কবি ছিলেন।’ তাঁর গানে যেমন প্রেম, বিরহ, মরমিয়া ভাবনা ও মানুষের অন্তর্জগত এসেছে, তেমনি এসেছে সমাজ, রাজনীতি, শোষণ, বৈষম্য এবং মানুষের মুক্তির আকাঙ্ক্ষা।
দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর: বর্তমান সময়ে শাহ আবদুল করিম কতটা প্রাসঙ্গিক?
ইকবাল কাগজি: সুকান্ত আমাদের কাছে যতটা প্রাসঙ্গিক—আগামী প্রজন্মের জন্য বাসযোগ্য করে যাওয়ার জন্য যতটা প্রাসঙ্গিক— ততটাই প্রাসঙ্গিক আবদুল করিম। শাহ আবদুল করিমের গান তাই শুধু অতীতের স্মৃতি নয়। মানুষের অধিকার, শোষণমুক্ত সমাজ, সাম্য, স্বাধীনতা ও মানবিক মর্যাদার প্রশ্নে তাঁর গান আজও কথা বলে। সময় বদলালেও মানুষের মুক্তি ও বৈষম্যহীন জীবনের আকাঙ্ক্ষা বদলায়নি। আর সে কারণেই বাউলসম্রাট শাহ আবদুল করিম আজও প্রাসঙ্গিক।
অনুষ্ঠানের শেষ পর্যায়ে কবি ইকবাল কাগজি ও গণশিল্পী বাউল জুবায়ের বখত সেবুলকে দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর পরিবারের পক্ষে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানানো হয়। এছাড়াও গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করা হয় ভাটি বাংলার কিংবদন্তি বাউল শাহ আবদুল করিমকে।
উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন