প্রকাশিত: ১২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ২৩:২৮
তাহিরপুরে ইজারাবিহীন শান্তিপুর নদী থেকে অবৈধভাবে উত্তোলনের অভিযোগ থাকা বালু উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ের সামনেই মজুত করে রাখার ঘটনা ঘটেছে। ইউএনও কার্যালয়ের সামনে বালু মজুতের ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয়। শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) সকালে তিনটি নৌকায় করে কয়েক হাজার ঘনফুট বালু এনে উপজেলা পরিষদ এলাকার ওই স্থানে রাখা হয়। এতে পর্যটকদের বসার দুটি বেঞ্চও বালুর স্তূপের নিচে চাপা পড়ে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত প্রকাশ্যে তিনটি নৌকায় করে বালু এনে ইউএনও কার্যালয়ের সামনে রাখা হয়। পরে বালুর স্তূপের ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। বিষয়টি নিয়ে উপজেলা প্রশাসন ও বিএনপির স্থানীয় নেতাদের সমালোচনা করে বিভিন্ন মন্তব্যও করেন অনেকে।
.jpeg)
মাজহারুল ইসলাম নবাব নামের একজন তার ফেসবুক পোস্টে নৌকা থেকে বালু তোলার একটি ছবি দিয়ে লেখেন, ‘সাধারণ মানুষ বলাবলি করতেছে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার শেল্টারে নাকি এসব হচ্ছে।’
সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান ও বিএনপি নেতা আবুল কাশেম তার ফেসবুক পোস্টে লেখেন, ‘যদি সত্যি ইউএনও জড়িত থাকে, উনার বিরুদ্ধে কর্তৃপক্ষকে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানাচ্ছি। উনার নামে অনেক কিছু শুনছি।’ সৈয়দ সেলিম আহমদ নামের একজন এই ইস্যুতে ‘এমপির হস্তক্ষেপ চাইলেন।’
অভিযোগের বিষয়ে স্থানীয় সংসদ সদস্য কামরুজ্জামান কামরুল বলেন, ‘আমি অসৎ কাজে কাউকে আশ্রয়—প্রশ্রয় দিইনি। সে যদি আমার বাপ—ভাইও হয়। সমালোচনাকারীরা না জেনেই অনেক কিছু বলেন। বালুর ঘটনাটি আমি জেনেছি। বালু রাখার সঙ্গে জড়িতদের খুঁজে বের করে আটক করার জন্য উপজেলা প্রশাসনকে নির্দেশনা দিয়েছি।’
এদিকে সমালোচনার জবাবে উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক মেহেদী হাসান উজ্জ্বল ফেসবুকে প্রতিবাদ ও বিবৃতি দিয়েছেন। বিবৃতিতে তিনি বলেন, উপজেলা ভবনের সামনের বালু রাখার ঘটনার সঙ্গে তার কোনো সম্পৃক্ততা নেই। কোনো যাচাই—বাছাই ছাড়াই তার নাম জড়িয়ে সংবাদ প্রকাশ করা হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি। এ ঘটনায় প্রতিবাদ ও নিন্দা জানান তিনি।
.jpg)
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনার পর শনিবার সকালে ইউএনও মেহেদী হাসান মানিক ঘটনাস্থলে গিয়ে বালুর স্তূপ দেখে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তিনি উপজেলা সহকারী কমিশনারকে (ভূমি) বালু জব্দ এবং এর মালিককে খুঁজে বের করার নির্দেশ দেন।
বালুর স্তূপ পরিদর্শনের সময় ইউএনওকে বলতে শোনা যায়, ‘রাষ্ট্রীয় সম্পদ ধ্বংস করেছে, বেঞ্চ ভেঙেছে, উপজেলা প্রশাসনের সামনের পরিবেশ নষ্ট করেছে। দিনে—দুপুরে এনে বালু রেখেছ।’
বালু কোথা থেকে আনা হয়েছে জানতে চাইলে উপস্থিত ব্যক্তিরা তাকে জানান, এটি শান্তিপুর নদীর বালু। তখন ইউএনও বলেন, ‘কত বড় সাহস, চিন্তা করা যায়?’
এ সময় একজন জানান, আগের দিন সকালে তিনটি নৌকায় করে বালু এনে সেখানে রাখা হয়েছে। এসময় ইউএনও বলেন, ‘কেমন সাহস দেখেন, আমাদের স্থাপনা ভেঙে—চুরে রাখছে। নামটা পাওয়া যাবে, কারা রাখছে।’
ইউএনও’র সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) শাহরুখ আলম শান্তনু, উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মাহফুজুর রহমান, উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার হারুন অর রশিদ, উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক বাদল মিয়া ও উপজেলা যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক জাহাঙ্গীর আলম।
.jpeg)
তাহিরপুর উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক বাদল মিয়া বলেন, শান্তিপুর নদী থেকে বালু নেওয়া ঠেকাতে নদীতে বাঁশের বেড়া দেওয়া রয়েছে। বিএনপির কেউ নদী থেকে বালু নেওয়ার সঙ্গে জড়িত নন। যারা বালু নেয়, তারা মূলত চোর, চুরি করে বালু নেয়।
তিনি আরও বলেন, ইউএনও কার্যালয়ের সামনে রাখা বালুর মালিক কে, তা জানা যায়নি। হয়তো শান্তিপুর নদী থেকে চুরি করে এনে এখানে রাখা হয়েছে। ইউএনও বালু জব্দ করার নির্দেশ দিয়েছেন।
তাহিরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মেহেদী হাসান মানিক বলেন, শান্তিপুর নদী থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন বন্ধে উপজেলা প্রশাসন সব সময় কঠোর অবস্থানে রয়েছে। শুক্রবার প্রশাসনিক কাজে ব্যস্ত থাকায় উপজেলা পরিষদ এলাকায় বালু রাখার বিষয়টি তিনি জানতে পারেননি। পরে বিষয়টি নজরে আসার পর বালুর মালিককে খুঁজে পাওয়া যায়নি।
তিনি বলেন, পর্যটকদের বসার দুটি বেঞ্চের ওপরও বালু রাখা হয়েছে। সেখানে প্রায় দুই হাজার ঘনফুট বালু থাকতে পারে। বালু জব্দ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং এর মালিককে খুঁজে বের করার চেষ্টা চলছে।
ইজারাবিহীন তাহিরপুরের শান্তিপুর নদী থেকে একটি প্রভাবশালী চক্র কোটি কোটি টাকার বালু লুট করার খবর গেল দুই—তিন বছর হয় গণমাধ্যমে প্রচার হচ্ছে। বালু লুট ঠেকাতে উপজেলা প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন ও স্থানীয় বাসিন্দারা বিভিন্ন সময় অভিযান চালালেও কয়েক দিন বন্ধ থাকার পর আবারও শুরু হয়। এ বিষয়ে স্থানীয় সংসদ সদস্য কামরুজ্জামান কামরুল এর আগে এক সমাবেশে বালু লুট বন্ধে হুঁশিয়ারি দেওয়ার পাশাপাশি নদীতে বাঁশের বেড়া দেওয়ার উদ্যোগ নেন। তবে স্থানীয়দের দাবি, এরপরও বালু লুট বন্ধ হয়নি। ছোট ছোট নৌকায় করে নদীর বালু বিভিন্ন স্থানে মজুদ করে পরে বিক্রি করা হয়।
উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন